সিলেটে ব্যবসায়ী হত্যা, নেপথ্যে প্রেমিকার সাথে সম্পর্কের সন্দেহ

২৩ আগস্ট রাতে দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরছিলেন শাহাব উদ্দিন। এ সময় জালাল তার পিছু নেন। বাসার কাছাকাছি একটি নির্জন স্থানে পৌঁছালে প্রায় ২৪ ইঞ্চি লম্বা একটি দা বের করে শাহাব উদ্দিনের মাথায় আঘাত করেন তিনি।

এমজেএইচ জামিল, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
নিহত ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন, (ডানে) অভিযুক্ত জালাল উদ্দিন
নিহত ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন, (ডানে) অভিযুক্ত জালাল উদ্দিন |নয়া দিগন্ত

প্রেমিকার সাথে সম্পর্কের সন্দেহ থেকেই সিলেটে ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন জালাল উদ্দিন (৩৫)। শাহাব উদ্দিনের সাথে রেহানা পারভীন নামে এক নারীর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সন্দেহ ও ক্ষোভ থেকেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয় বলে জানিয়েছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদ শামীম।

গ্রেফতারের পর আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে শাহাব উদ্দিনকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন জালাল উদ্দিন।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন এসএমপি কমিশনার।

তিনি জানান, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামত এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের ভিত্তিতে জালালকে শনাক্ত করা হয়। পরে স্থানীয় জনতার সহযোগিতায় কৌশলে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

এসএমপি কমিশনার জানান, জালাল যে রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন, সেখানে রেহানা পারভীন নামে এক নারীও কর্মরত ছিলেন। প্রায় সাত বছর আগে রেহানার স্বামী মারা যাওয়ার পর জালালের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের বিয়ে করার কথাও ছিল। তবে গত তিন-চার মাস ধরে বিয়ে নিয়ে দু’জনের মধ্যে মনোমালিন্য চলছিল এবং রেহানা বিয়েতে অনীহা প্রকাশ করছিলেন।

এদিকে রেহানা মাঝেমধ্যে রেস্টুরেন্টের পাশের শাহাব উদ্দিনের দোকানে যেতেন এবং তার সাথে কথা বলতেন। বিষয়টি ভালোভাবে নেননি জালাল। এতে শাহাব উদ্দিনের সাথে রেহানার কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে কি-না— এমন সন্দেহ তার মধ্যে তৈরি হয়। এ নিয়ে শাহাব উদ্দিনের সাথে কয়েকবার তার কথা-কাটাকাটিও হয়। একপর্যায়ে শাহাব উদ্দিনের গালমন্দে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ‘দেখে নেয়ার’ পরিকল্পনা করেন জালাল।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৩ আগস্ট রাতে দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরছিলেন শাহাব উদ্দিন। এ সময় জালাল তার পিছু নেন। বাসার কাছাকাছি একটি নির্জন স্থানে পৌঁছালে প্রায় ২৪ ইঞ্চি লম্বা একটি দা বের করে শাহাব উদ্দিনের মাথায় আঘাত করেন তিনি। আঘাতে শাহাব উদ্দিন মাটিতে পড়ে গেলে তার গলায় কোপ দেন। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে ফেলে পালিয়ে যান জালাল।

পালানোর সময় ঘটনাস্থল থেকে কিছুদূর গিয়ে জালাল নিজের পরনের রেইনকোট ফেলে দেন। আরো কিছুদূর যাওয়ার পর ফেলে দেন পায়ের স্যান্ডেল ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দা। সিসি ক্যামেরার ফুটেজের সাথে এসব আলামত মিলিয়ে পুলিশ জালালকে শনাক্ত করে।

এর আগে, রোববার (২৩ আগস্ট) মধ্যরাতে শাহপরান ইসলামাবাদ এলাকায় নিজ বাসার কাছ থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় শাহাব উদ্দিনকে উদ্ধার করেন স্বজনরা। পরে হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

নিহত শাহাব উদ্দিন বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই এলাকার বাসিন্দা। পরিবার নিয়ে তিনি শাহপরাণ এলাকায় বসবাস করতেন। চারখাই বাজারে তার ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা ছিল। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের বাবা শাহাব উদ্দিনের এক ছেলে ফ্রান্সে থাকেন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, কারো সাথে তার বিরোধ ছিল বলে তারা জানতেন না।

নিহতের ছোট ছেলে রেদোয়ান আহমদ জানান, স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি বাবাকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেন। তার ঘাড়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল।

ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে শাহাব উদ্দিনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একইদিন বাদ আসর জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।

এর আগে, মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে শাহপরান মাজার এলাকা থেকে জালাল উদ্দিনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

এসএমপি কমিশনার বলেন, হত্যাকাণ্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে প্রেমঘটিত সন্দেহের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এর বাইরে হত্যাকাণ্ডের অন্য কোনো কারণ বা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি-না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।