রংপুরের চাঞ্চল্যকর চার খুনের ঘটনায় যেন জজ মিয়া নাটক মঞ্চস্থ না হয়, সেজন্য সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতির সুপারভিশনে পুলিশের তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা চায় বাংলাদেশ আইনজীবী ঐক্য পরিষদ। এ সময় ঘরের ভেতরে যেতে পুলিশের বাধা দেয়ার অভিযোগও করা হয়।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টায় রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়ায় হত্যাকাণ্ডের শিকার গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি পরিদর্শন শেষে ব্রিফিংয়ে একথা বলেন সংগঠনের নেতারা। এর আগে ১৬ সদস্যের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের একটি দল সেখানে যায়। কিন্তু পুলিশের পারমিশন না থাকায় ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি তারা। ভবনটির নিচতলাসহ আশপাশ পরিদর্শন করেন তারা। পরে পুলিশ কমিশনার মাহবুবুর রশিদের সাথে তার অফিসে সাক্ষাৎ করে আইনজীবী দল। তারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন।
পরে গণপতির বাসার সামনে ব্রিফিং করেন তারা। সেখানে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের আইন বিষয়ক সম্পাদক অপূর্ব ভট্টাচার্য বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডটি নিয়ে জনমনে একটা সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। সারা বিশ্বব্যাপী বিষয়টা চলে গেছে। বাংলাদেশের পুলিশের তদন্ত নিয়ে একটা বিশ্বাস উনারা নিজেরাই হারিয়েছেন।’
অপূর্ব ভট্টাচার্য বলেন, ‘এই বিষয়টায় নিয়ে আমরা হাইকোর্টে গিয়েছি এজন্য যে, একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অথবা হাইকোর্টের বিচারপতির অধীনে তদন্তটা যাতে হয়। কারণ এই তদন্তের ওপর যাতে পুলিশের একটা মনগড়া "জজ মিয়া" নাটক বাংলাদেশে না ঘটে আর।’
অপূর্ব ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা বিচার বিভাগীয় তদন্তটা চাচ্ছি, বিচার বিভাগের সুপারভিশনে তদন্তটা চাচ্ছি এবং সেটা নারায়ণগঞ্জে কিন্তু এই ঘটনাগুলো—নারায়ণগঞ্জে যে সাত খুন হয়েছে, এটাও কিন্তু জুডিশিয়াল সুপারভিশনে এই তদন্তটা হয়েছে। আপনারা জানেন, অনেক দিন পরে কিন্তু এখানে অনেকের বিচার হয়েছে।’
এ সময় চিঠি এবং কথা বলার পরও ঘরের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশ আইনজীবী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অনুপ সাহা বলেন, ‘আমরা এই বাড়িতে একটু দেখতে চাচ্ছিলাম সার্বিক অবস্থাটা কী। পুলিশ কমিশনার মহোদয় যা করলেন সেটা হলো—প্রথমে রিকোয়েস্ট করা হলো আমরা ভেতরে যাব। উনি নাকি বললেন যে, শুধু রুফটপ আর গ্রাউন্ড ফ্লোর দেখতে পারবেন, মাঝখানে যেটা ওনাদের বেডরুম, এটা দেখতে পারবেন না। তখন আমি বললাম যদি অনুমতি দেন, আমাদের চারজন লোকই তো ওনার অফিসার। সেখানে কোনো আলামত বা কোনো কিছু না, আমরা জাস্ট একটু দেখব। কারণ আমরা বাংলাদেশ আইনজীবী ঐক্য পরিষদের, এই আইন অনুসারী লোক আমরা। আমরা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।’
অনুপ সাহা বলেন, ‘এই যে চারটে খুন হয়েছে, এটার ধারাবাহিকতায় আমরা সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে, মাননীয় হাইকোর্ট ডিভিশনে আমরা রিট ফাইল করেছি সুষ্ঠু তদন্ত এবং যারা তদন্ত করবেন, তাদের এই তদন্তটাকে সুপারভিশন করার জন্য জুডিশিয়াল অফিসার যাতে থাকেন। ঘটনাস্থল আমরা দেখতে পারি। রিট মামলাটার শুনানি হয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্ডার যেটা সেটা উনি দেবেন এবং আরো কিছু স্ট্যান্ড ওভার আছে। কোর্টের পর কিছু ইন্টারনাল পর্যবেক্ষণ আছে—ওনারা কীভাবে কী করবেন, ফার্দার শুনানির স্বার্থে ওনারা কিছু দেখবেন।’
অনুপ সাহা বলেন, ‘আমরা যেহেতু এই মোকদ্দমাটাতে কনডাক্ট করেছি, আমরা সেখানে শুনানি করেছি, এই যে আমাদের অনারেবল জাস্টিস মহোদয়েরা যে কথা বলেছেন যে আমরা অবজার্ভ করব, অবজার্ভ করি। আপাতত স্ট্যান্ড ওভার থাক, আমরা সেটা পরবর্তীতে দেখব এবং আমরা পূর্ণাঙ্গ শুনানি অন্তে আমরা অর্ডার দেব। এটার ধারাবাহিকতা হোক অথবা আমাদের ওন অর্গানাইজেশন থেকে আমাদের এটা দেখা খুব আবশ্যক ছিল।’
অনুপ সাহা বলেন, ‘কিন্তু পুলিশ কমিশনার কী করলেন? তিনি আসলে এ বিষয়টা তার অফিসারকে বলেছেন যে না, ওপরে যাওয়া যাবে না। আমি তার সাথে কথা বললাম যে নম্বরটিতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম, সেই নম্বর থেকে টেলিফোন করলাম দুইবার, ধরলেন না। আমার মোবাইলে আরেকটা নম্বর ছিল, সেই নম্বর থেকেও যোগাযোগ করলাম। আমি যেটা দেখতে পেলাম, আমি আসলে এই যে মোবাইল ভার্চুয়াল যে সিস্টেমগুলো—এত বুঝি না। তবে আমি এইটুক দেখলাম নম্বর ব্লকড। আমি একটা মেসেজ দিলাম, "প্লিজ ব্রাদার, আমাদের এইটা একটু দেখার জন্য পারমিশন দেন। আওয়ার ফোর পারসনস উইথ ইউর অফিসারস।"’
পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে নম্বর ব্লক করার অভিযোগ করে অনুপ সাহা বলেন, ‘সেটা হলো উনি (পুলিশ কমিশনার) আমার নম্বরটা ব্লক করেছেন। এইটা আমাদের জন্য খুব দুঃখজনক। উনি আমাদের এই যে পুলিশ কমিশনার মহোদয়, উনি কিন্তু জনগণের রক্ষক। এবং এই যে জনগণের রক্ষক, নিরাপত্তার স্বার্থে এবং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে... পাবলিক সার্ভেন্ট সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ওনার এই জিনিসটা করতে দিলে আমাদের বা আমার মনে হয় না যে কোনো প্রকার ব্যাঘাত ঘটত। বরং একটা সত্য বিষয় আমরা মাননীয় হাইকোর্টের সামনে হয়তো উপস্থাপন করতে পারতাম যে আমরা সেখানে তদন্তে গিয়েছি—আমরা তদন্ত তো আমরা করতে পারব না, আমরা দেখতে গিয়েছিলাম। আমরা এইটুক দেখে এসেছি, মাই লর্ড আপনি যেভাবে আপনার পর্যবেক্ষণ—সেইভাবে আপনি করে পরবর্তীতে আপনার স্যাটিসফ্যাকশন মোতাবেক আপনি অর্ডার দেবেন। কিন্তু এটা না দেওয়ার কারণে আমরা ক্ষোভ এবং দুঃখ প্রকাশ করছি।’
বাংলাদেশ আইনজীবী ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জয়া ভট্টাচার্য বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট থেকেই একদল আইনজীবী আসছি। আমাদের ১৫ জনের ১৬ জনের একটা টিম আসছি এই গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে। আমরা কোনো রাজনৈতিক দল, সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো কিছু থেকে আসি নাই। কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নাই। আমরা আমাদের নিজেদের উদ্যোগে আমাদের আইনজীবী ঐক্য পরিষদের সংগঠনের পক্ষ থেকে আসছি।’
জয়া ভট্টাচার্য বলেন, ‘যেহেতু আমাদের একটা রিট পিটিশন শুনানি হয়ে গেছে এবং সেটা পেন্ডিং রয়ে গেছে, স্ট্যান্ড ওভার হয়ে গেছে বন্ধের পর পরবর্তী শুনানির জন্য। আমরা আসছি শুধুমাত্র এখানে কিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার জন্য যাতে আমরা রিট পিটিশন শুনানির সময় কোর্টকে সাহায্য করতে পারি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে। কিন্তু এসে যেটা দেখলাম যে আমরা ভেতরে যেতে পারলাম না। আমরা ওপরে ঘটনাস্থল যে জায়গাটা সেটা যেতে পারলাম না, যদিও আমরা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে পেরেছি। এটা দুঃখজনক। আমরা এখান থেকে কিছুই নিতে পারলাম না।’
জয়া বলেন, ‘আপনারা সাংবাদিকরা, আপনারা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করবেন। এই মামলাটার, এই গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের যাতে সুষ্ঠু বিচার হয়। তারা, তাদের পরিবারের প্রত্যেকটা লোক অ্যাট এ টাইম হারালো এবং তাদের পুরো বংশটা নির্বংশ হয়ে গেল। তাদের বংশে আর পরবর্তীতে কেউ থাকলো না। এটা খুবই দুঃখজনক। খুবই দুঃখজনক ঘটনা। এমন একটা জনবসতিপূর্ণ পাড়ার ভেতরে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল, আমরা আজকে দেখে নিশ্চয়ই হতবাক হয়ে গেছি, কী করে ঘটনাটা ঘটলো! আপনারা এই মামলাটা সুষ্ঠু তদন্ত করেন, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন। যতটুক পারেন তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সাহায্য করেন, আমাদেরকেও সাহায্য করবেন।’
রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মাহবুবুর রশিদ বলেন, ‘ঘটনাস্থলের আলামতের ক্রাইম সিন সিকিউরিটির কারণেই সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান। পেশাদারিত্বের সাথে সকল প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। সব উত্তরের মাধ্যমেই বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সাপেক্ষেই চার্জশিট দেওয়া হচ্ছে।’
গেল ২১ আগস্ট ভোরে রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়ার তালাবদ্ধ নিজ বাড়িতে খুন হন রংপুর জিলা স্কুলের গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বোলা, কন্যা কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে সদ্য মাস্টার্স করা আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী, পুত্র জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম। ২২ আগস্ট রাত ১১ টা থেকে ২৩ আগস্ট ভোররাত ৫ টা পর্যন্ত তাদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় সিদ্ধার্থ দাস এবং মুগ্ধ দাস নামে দুইজনকে ২৩ আগস্ট ভোরেই গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা সেদিন রাতেই রংপুর মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এর বিচারক রফিকুল ইসলামের কাছে খুনের কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। এ ছাড়া ২৫ আগস্ট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এ সাক্ষী হিসেবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের বন্ধু সীমান্ত। সেই রাতে প্রথমে সীমান্তের ঘরে ইয়াবা সেবন করেছিল তারা। ২৬ আগস্ট একই আদালতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেয় দখিগঞ্জ শ্মশানের পাহারাদার (ডোম) বিদ্যুৎ দাস। মুগ্ধ গ্রেফতারের আগে ওই শ্মশানে গিয়ে বিদ্যুতের কাছে আশ্রয় চেয়ে বলেছিল হত্যাকাণ্ডের কথা। অন্যদিকে যার কাছ থেকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস ইয়াবা কিনেছিল সেই শান্ত দাসও ৬ সেপ্টেম্বর মেট্রোপলিটন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
গত ১০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে মামলাটির তদন্ত কাজ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির সুপারভিশনে করার জন্য রিট পিটিশনের শুনানি হয়। সেটি পেন্ডিং করে পূর্ণাঙ্গ শুনানির জন্য আদেশ দেয় হাইকোর্ট।
এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করছেন রংপুরের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং শিক্ষার্থীরা।



