সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, বিভিন্ন স্থানে আতঙ্ক

ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে আকস্মিক বন্যা এবং টিলা ধসের আশঙ্কায় সিলেট জেলা প্রশাসন ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। একই সাথে জেলার ১৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ টিলা চিহ্নিত করে সেসব এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে।

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet

টানা তিন দিনের বৃষ্টি ও ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগের চার জেলায় বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। মৌলভীবাজারের মনু ও হবিগঞ্জের খোয়াই নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। এতে বিভাগজুড়ে বন্যার আশঙ্কা ও উদ্বেগ বাড়ছে।

ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে আকস্মিক বন্যা এবং টিলা ধসের আশঙ্কায় সিলেট জেলা প্রশাসন ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। একই সাথে জেলার ১৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ টিলা চিহ্নিত করে সেসব এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে। প্রয়োজনে তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় সব উপজেলায় পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রাখা হয়েছে। মাঠ প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা বলেন, জেলার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ টিলা এলাকায় মাইকিং করে বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হবে। তিনি জানান, বর্তমানে ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা আরো বাড়ানো হবে।

সিলেট আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বুধবার সকাল ৬টা থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ১২৪ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গত তিন দিন ধরে সূর্যের দেখা না মিলায় নগরজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী সোমবার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানি বিপদসীমার মাত্র ০ দশমিক ৩২ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় সেখানে পানির উচ্চতা ছিল ১২ দশমিক ৪৩ মিটার, যেখানে বিপদসীমা ১২ দশমিক ৭৫ মিটার। একই নদীর সিলেট পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ৯ দশমিক ৫৩ মিটার, বিপদসীমা ১০ দশমিক ৮০ মিটার। অন্যদিকে কুশিয়ারা নদীর অমলশিদ ও শেরপুর পয়েন্টেও পানি দ্রুত বাড়ছে এবং উভয় পয়েন্টেই তা বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, খোয়াই নদীর পানি বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় শহর ও আশপাশের এলাকায় বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় বাল্লা স্টেশনে খোয়াই নদীর পানি বিপদসীমার ২২০ সেন্টিমিটার, শায়েস্তাগঞ্জে ৯৯ সেন্টিমিটার এবং মাধবপুরের হরিপুর পয়েন্টে ১৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এছাড়া আজমিরীগঞ্জে কালনী-কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ৬১ সেন্টিমিটার এবং সুতাং নদীর পানি ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৬১ দশমিক ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

তিনি বলেন, হাওরগুলো প্রায় সর্বোচ্চ পানি ধারণক্ষমতায় পৌঁছে গেছে। ফলে নতুন করে আসা পানি ধীরগতিতে নিষ্কাশিত হচ্ছে এবং খোয়াই নদীর ওপর চাপ বাড়ছে। এতে নদীর দুই তীরের জনবসতি বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।

হবিগঞ্জ শহরের মাছুলিয়া এলাকার বাসিন্দা সাদেক হোসেন বলেন, খোয়াই নদীর বাঁধের বিভিন্ন অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ কারণে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এদিকে মৌলভীবাজারের অধিকাংশ নদ-নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে। জেলার পাঁচটি পর্যবেক্ষণ পয়েন্টের মধ্যে তিনটিতে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে এবং দুটিতে নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও সেখানেও পানি বাড়ছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, মনু নদীর রেলওয়ে ব্রিজ ও চাঁদনীঘাট পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং ধলাই নদীর রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, মনু ও ধলাই নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। কুশিয়ারা ও জুড়ী নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে। এতে জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।

শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগের দিন বৃষ্টিপাত হয়েছিল ৯১ মিলিমিটার।

কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদাল হোসেন বলেন, আকস্মিক বন্যায় ইউনিয়নের অন্তত ১২০ থেকে ১৫০টি পরিবারের বাড়ির উঠান ও আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কৃষিজমিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে সুনামগঞ্জেও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। জেলার হাওরগুলো পানিতে টইটম্বুর হয়ে পড়েছে। পানি বৃদ্ধির কারণে হাওরাঞ্চলের বাসিন্দারা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।