৬ দিনেও রংপুরে চাঞ্চল্যকর ফোর মার্ডারের জব্দকৃত আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠাতে এখনো আদালতের অনুমতি চায়নি তদন্ত সংস্থা। তবে গ্রেফতার দুজনই এই নির্মম কিলিং মিশনে অংশ নিয়েছিলেন—সেটা নিশ্চিত করে বলছে তদন্ত সংস্থাগুলো।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও ধর্ষণ বা কেমিক্যাল ব্যবহারের বিষয়টি না আসায় ঘটনার মোটিভ উদঘাটন মোটামুটি শেষের পথে বলেও বলছে পুলিশ। তবে এই ঘটনায় তদন্ত নিয়ে ওঠা সবকিছুই স্পষ্ট হবে আলামতের ফরেনসিক প্রতিবেদনে, বলছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে গ্রেফতারকৃতরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও বেশ কিছু বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হওয়ায় আদালতে রিমান্ডের আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। অপরদিকে আবারো ব্রিফিং করে দাবি করা হয়েছে, আদালতের অনুমতি নিয়ে গ্রেফতারকৃতদের ডিএনএ এবং ডোপ টেস্ট করানো হবে।
রংপুরে চাঞ্চল্যকর ৪ খুনের ঘটনায় ৩৫টি আলামত জব্দ করেছে সিআইডি এবং তদন্ত সংস্থাগুলো। এর মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে জব্দকৃত খেজুর, শসা, সিগারেট, পলক হোটেল থেকে নিয়ে যাওয়া নানরুটি, ইয়াবা সেবনের ফয়েল, প্রিয়মের হাতের লেখা ২২ আগস্টের হোমওয়ার্ক, প্রিয়মের লাশের চতুর্পাশে থাকা তরল, কিছু কাপড়চোপড়সহ বেশ কিছু আলামত এসেছে নয়া দিগন্তের হাতে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসবের ফরেনসিক পরীক্ষা হলেই স্পষ্ট হবে এই ঘটনায় আরো কেউ জড়িত কিনা।
কিন্তু চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের লাশ উদ্ধারের ৬ দিন পরেও বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জব্দকৃত আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য আদালতের অনুমতি চায়নি তদন্ত সংস্থাগুলো। সবকিছু গুছিয়ে আদালতের অনুমতি নিয়েই তা সিআইডির ল্যাবে পাঠানোর কথা বলছে সিআইডি ও ডিবি।
এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের ওসি জিন্নাত আলী এ প্রতিবেদককে জানান, ‘জব্দকৃত আলামতগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য আদালতের যে অনুমতি লাগে বা সার্বিক প্রসিডিউরে সিআইডি ল্যাবে পাঠানো হবে। তবে তার আগে আসামির রিমান্ড আসুক, ইন্টারোগেশন (জিজ্ঞাসাবাদ) করি। তারপরে আরো কিছু কনফার্ম হয়ে আমরা আদালতে আবেদন করতে চাই ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য।’
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির পরও কেন আবারো রিমান্ড—এমন প্রশ্নে তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী জানান, ‘আমরা আরো জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা বোধ করতেছি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে রিমান্ড চাওয়া হবে। কারণ অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন আছে।’
‘যেহেতু আমরা অনুভব করছি অনেক বিষয়ে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন, সে কারণে তাদের রিমান্ডে নেয়া হতে পারে। সে কারণে আমরা রিমান্ডে এনে শুনানির পর জব্দকৃত আলামতের ফরেনসিক টেস্টের জন্য আদালতে আবেদন ও অনুমতির মাধ্যমে সিআইডির ল্যাবে পাঠাবো।’
এ ব্যাপারে সিআইডি রংপুর অফিসের এসপি (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী এ প্রতিবেদককে জানান, এই ঘটনায় যদি গ্রেফতারকৃত দুজনের থেকে বেশি কেউ জড়িত থাকে সেক্ষেত্রে সেটা ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমেই উঠে আসবে। কারণ তারা যেহেতু বলছে তারা খেজুর খেয়েছে, সিগারেট খেয়েছে, এই দুইটাতে আমরা ডিএনএ পাবো। শসা থেকে পাবো। যদি তাদেরই (সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ) থাকে তাহলে তারা, আর যদি আদার্স কেউ অন্য কারো হয় তাহলে ম্যাচ করবে না এই দুইজনের সাথে।
সিআইডি কর্মকর্তা সুমিত চৌধুরী বলেন, ‘সিআইডির প্রতিবেদন আসা একটু সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হয় কারণ সিআইডিতে যে বিষয়গুলো যায়, ফরেনসিক ল্যাবে যেগুলো যায় বা ফটোগ্রাফি সেকশন বলেন, হ্যান্ডরাইটিং সেকশন, প্রচুর কেস এই সংক্রান্তে। এটা কিন্তু যায় সিরিয়াল হয়ে। একটা নাম্বার দিয়ে দেয়া হলো, যিনি নাম্বারটা দিলেন উনি শুধু জানেন। ওখানকার যিনি বিশেষ পুলিশ সুপার আছেন উনি জানবেন। এখন আমি যদি বলি যে আমারটা আমাকে একটু আগে করে দেন, সে স্যারেও জানবেও না কোনটা কোন মার্ডারের বা কোন ঘটনার কোনটা।’
তিনি জানান, ‘তারপরেও যেহেতু চাঞ্চল্যের বিষয়, সিআইডিসহ বাংলাদেশ পুলিশের সব ইউনিট এতে... ইভেন আইজিপি স্যার, আমাকে ওই রাতে আমার চিফ স্যারও ফোন করেছিলেন। তো সবাই কনসার্ন। হয়তো এটা পাঠানো হলে আমরা স্যারকে বলবো যে এটা যেন দ্রুত করানো হয়। তবে এখনও পাঠানো হয় নাই।’
রংপুর মহানগর উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী এ প্রতিবেদককে জানান, ‘জব্দকৃত আলামতগুলোর ফরেনসিক টেস্টের পর আসলে জানা যাবে আর কেউ আছে কিনা। আলামত ফরেনসিকে এখনো পাঠানো হয় নি। পোস্টমর্টেমটা হয়েছে। তার প্রতিবেদনও আমরা পেয়েছি। কিন্তু যে আলামতগুলো ওখান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, এটা আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে এবং আদালতের নির্দেশনা অনুসারে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’
এদিকে গ্রেফতার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির সাথে যুক্ত তদন্ত সংস্থার সূত্র জানিয়েছে, জব্দকৃত আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো না হলেও গ্রেফতারকৃত সিদ্ধার্থ এবং মুগ্ধ দাসই সরাসরি ঘটনার সাথে জড়িত—এটা তারা নিশ্চিত হয়েছেন। এক্ষেত্রে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের সাথে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ছাড়াও সব তথ্য নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাইয়ের কথা বলছেন তারা।
তদন্ত সংস্থাগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শুক্রবার (২১ আগস্ট) ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই পরপর এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটায় প্রিয়ম ও মুগ্ধ। প্রথমে ভোর ৬টায় গণপতি, তারপর স্ত্রী প্রীতিলতা, এরপর কন্যা আগামী ও পুত্র প্রিয়মকে শ্বাসরোধে হত্যার প্রমাণ তদন্ত সংস্থাগুলোর হাতে বলেও দাবি তাদের। ময়নাতদন্তের রিপোর্টেও ধর্ষণ বা কেমিক্যাল ব্যবহারের বিষয়টি না আসায় পুলিশ তাদের তদন্তকে আরো শক্তিশালী রূপ দিয়েছে বলেও দাবি করেছে তদন্ত সংস্থাগুলো।
এ ব্যাপারে সিআইডি রংপুর অফিসের এসপি (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী এ প্রতিবেদককে জানান, ‘মামলা কিন্তু... মোটামুটি... যা মনে হয়েছে ডিটেকশনের পথেই। পথেই, ঠিক আছে? এখন অন্য কাউকে সন্দেহ করার মত আর কাউকে পাওয়া যায়নি। আমি যতদূর জেনেছি মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছ থেকে, সব কিছু যাচাই-বাছাই করে তারা এই দুজনের মধ্যেই মোটামুটি একটা স্ট্যান্ড করে আছে।’
এ বিষয়ে মহানগর উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী এ প্রতিবেদককে জানান, ‘এটা অনেক বড় একটা ঘটনা। অবশ্যই, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা যে তথ্যটা পেয়েছি, তাতে এই দুজনের বাইরে কেউ যুক্ত আছে এমন কোনো প্রমাণ আমরা পাইনি। আর যদিও চারজন খুন হয়েছে, এটা এমন একটা বাস্তবতা কিন্তু চারজন একসাথে খুন হয়নি। চারজনের খুনের ঘটনাস্থল ভিন্ন এবং খুনের টাইমিংটাও ভিন্ন।’
সনাতন চক্রবর্তীর দাবি, ‘তা এই—এইজন্যেও আবার বিষয়টা কিন্তু খুবই ফিজিবল, দুজনের পক্ষে খুবই ফিজিবল এবং তারা দুজনেই ইয়াবায় আসক্ত ছিল এবং ইয়াবা সেবন করেই তারা এই ঘটনাটা ঘটিয়েছে। এবং আপনারা জানেন, যারা এগুলো নিয়ে খোঁজখবর রাখেন, যে ইয়াবা সেবনের পরে সে একটা মানুষ—মানুষ থাকে না, সে পশুতে পরিণত হয়ে যায়।’
ফের ব্রিফিংয়ে কী বললেন পুলিশ কমিশনার
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরে যাওয়া শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ তার স্ত্রী, কন্যা ও পুত্র হত্যাকাণ্ডের তদন্তের বিষয়ে বৃহস্পতিবার সকালে ব্রিফিং করেন মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। ব্রিফিংয়ে তুলে ধরেন তদন্তের অগ্রগতি।
এ সময় তিনি বলেন, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও ময়নাতদন্তে স্পষ্ট হয়েছে গ্রেফতার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাসই পরপর শ্বাসরোধে হত্যা করে তাদের। ছাদে গণপতি, প্রীতিলতা ও আগামী চক্রবর্তীকে এবং ঘরের ভেতরে প্রিয়মকে পেটিকোট ও বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে তারা।
কমিশনার বলেন, ‘তারা প্রাথমিক পুলিশের কাছে বক্তব্য আর বিজ্ঞ আদালতে যে বক্তব্য দিয়েছে, এটাতে আরো অনেক কিছু ক্লিয়ার হয়ে গিয়েছে। আমাদের কাছে ময়নাতদন্তের যে রিপোর্ট এসেছে, সেই রিপোর্টে চারজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যার বিষয়টা ময়নাতদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।’
পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘যে দুইজন নারী ভিকটিম আছেন, আগামী চক্রবর্তী এবং প্রীতিলতা চক্রবর্তী, আমি উনাদের প্রতি সম্মান রেখে, মৃতদের প্রতি সম্মান রেখে বলছি যে, উনাদের ভ্যাজাইনাল সোয়াব নেয়া হয়েছিল, কোনো ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায় নাই। গলায় শ্বাসরোধ করলে... এটা আপনারা জানেন, যাদের অভিজ্ঞতা আছে, বীর্য বের হয়ে যায়, মলমূত্র বের হয়ে যায়। এই বীর্য হলো ওই ডেড বডির বীর্য, এটা অন্য কোনো বাইরের বীর্য না। একজন ডোমের কথা একটু প্রচলিত হয়েছে, সেখানে তিনিও কিন্তু বলছে যে তার বীর্য বের হইছে, অর্থাৎ ভিকটিমের। এটা হলো গলায় ফাঁস লাগলে এবং চোখগুলো একটু বের হয়ে আসে। এটা হলো গলায় ফাঁস লাগলে এই জিনিসগুলো হয়। আর পোস্টমর্টেমের রিপোর্টে এগুলো ক্লিয়ার হয়ে গিয়েছে।’
ব্রিফিংয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধই তাদের হত্যা করেছে—এটা নিশ্চিত। আদালতের অনুমতি নিয়ে তাদের ডিএনএ এবং ডোপ টেস্ট করা হবে। এরপর জানা যাবে অন্য কেউ জড়িত কিনা। আমাদের যে দুইজন অভিযুক্ত অ্যারেস্ট আছে—সিদ্ধার্থ দাস, মুগ্ধ দাস, তাদের ডোপ টেস্টের প্রক্রিয়া, ডিএনএ স্যাম্পলের প্রক্রিয়া, এগুলো আমাদের আন্ডার প্রসেস। এগুলো বিজ্ঞ আদালতের অনুমতি নিয়ে... যেহেতু একটু টেকনিক্যাল কাজ, যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এগুলো করতে হয়, সে প্রসেসগুলো আমাদের চলতেছে।’
ব্রিফিংয়ে কমিশনার দাবি করেন, সিদ্ধার্থের কোর্টের জবানবন্দিতে একটা কথা উঠে এসেছে যে তার পূর্বপুরুষদের জমি গণপতি চক্রবর্তী কিনেছিলেন। আমরা ওইটাও দেখতেছি যে পূর্বপুরুষদের জমি সম্ভবত যেটা একটা শোনা গিয়েছে একটু বেশি মূল্যে কেনা হয়েছিল। ওই জমি কেনাটা হয়তো তারা বা তাদের বংশের শরিকরা ভালোভাবে নেয় নাই। এবং তারা শরিকরা যারা আছে, তারা সবাই টাকা যেটা পাওয়ার কথা, তাদের অংশীদাররা ওই টাকাটা পায় নাই। আনুপাতিক হারে তাদের যে টাকাটা আছে শরিকরা, তারা টাকাটা পায় নাই। তাদের এটা নিয়ে একটা মনের মধ্যে একটা ক্ষোভ থাকতে পারে, সে দিকটা আমরা দেখতেছি। এছাড়াও আমরা ব্যাংক স্টেটমেন্টের জন্য লিখেছি, তার ব্যাংক স্টেটমেন্ট পেলে বোঝা যাবে। আমরা জানি এখন সাধারণত কেউ টাকা-পয়সা ওইভাবে বাসায় রাখে না।
কমিশনার বলেন, ‘ওই ঘটনার আগে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ বন্ধু সীমান্তের বাসায় তিনটা ইয়াবা সেবন করেছিল। সীমান্ত দাস কোর্টে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন সাক্ষী হিসেবে। মুগ্ধ দাসকে অ্যারেস্ট করার সময় সে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। পালিয়ে গিয়ে ৩ কিলোমিটার দূরে গিয়ে সে একটা শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের কাছে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেছিল। বিদ্যুৎ দাস শ্মশানের গার্ড, সে একাই থাকে শ্মশানে। বিদ্যুৎ দাসের সাথে আমরা কথা বলেছি, তিনিও কোর্টে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। বিদ্যুৎ দাসের সামনে গিয়ে সে খুব টায়ার্ড হয়ে পড়ে এবং বলে যে, ‘দাদা আমাকে একটু পানি দাও, আমাকে একটু আশ্রয় দাও, আমি তো গণপতি স্যারসহ চারজনকে খুন করে চলে আসছি, আমি আর সিদ্ধার্থ দাস।’ তো এরপরে সে পানি দিতে এবং আশ্রয় দিতে অস্বীকার করে যে, ‘যেহেতু খুন করছে, খুনের কথা স্বীকার করছে, খুনিকে আশ্রয় দিলে সে বিপদে পড়তে পারে’, এজন্য সে আশ্রয় দেয় নাই। এর পরপরই পুলিশ সেখানে পৌঁছে যায়, পুলিশ তাকে টেকওভার করে, হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে নিয়ে আসে। তো সেই বিদ্যুৎ দাসের বক্তব্য আমরা নিয়েছি।’
পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘আমরা আগামী চক্রবর্তীর, যার সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, অদিত কর, পেশায় ছাত্র, উনার সাথেও আমরা কথা বলেছি। উনি ফোন বন্ধ পেয়ে শুক্রবার এবং শনিবার ওই বাড়ির সামনে দিয়ে উনি অনেকবার যাতায়াত করেছেন। উনার বান্ধবীর ফোন বন্ধ পেয়ে এবং বাসার সামনে বসে থাকা কয়েকজন নারীর সাথেও কথা বলেছেন, প্রতিবেশীদের সাথে। সেই প্রতিবেশীরাও উনাকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন। অর্থাৎ উনাকে সহযোগিতা করেন নাই। বলছে যে কোথায় না কোথায় চলে গেছে, শুক্রবার থেকে দেখি না। অর্থাৎ তাদের অ্যাটিটিউডটা... এটা অদিতকরের বক্তব্য। অদিত কর বারবার এখানে ঘোরাফেরা করছিলেন, বাসা বন্ধ ছিল, ফোন বন্ধ ছিল।’
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে কী আছে
ময়নাতদন্তের কপি এসেছে প্রতিবেদকের হাতে। তাতে মৃত্যুর আগের এবং পরের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া আছে। এতে মৃত্যুর আগে: অ্যান্টিমর্টেম ফাইন্ডিংস-এ বলা হয়েছে শারীরিক আক্রমণ ও ভোঁতা অস্ত্রের আঘাত। আয়ুষ চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)-এর ব্যাপারে ময়নাতদন্তে বলা হয়, ‘মাথায় (ডান ফ্রন্টো-টেম্পোরাল অঞ্চলে ৪x৩ ইঞ্চি) ও বুকে (৩x৩ ইঞ্চি) ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে রক্ত জমার চিহ্ন (একিমোসিস) ছিল। তার নাকের তরুণাস্থি ভাঙা ও নাক চ্যাপ্টা পাওয়া গেছে, যা কোনো শক্ত ভোঁতা বস্তু বা ঘুষির আঘাত নির্দেশ করে।’
গণপতি চক্রবর্তী (৬০)-এর ব্যাপারে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মাথার দুই পাশে একাধিক রক্তজমা আঘাত (একিমোসেস) এবং বুকের বাম পাশে (৫x৩ ইঞ্চি) গভীর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।’
আগামী চক্রবর্তী (২৪)-এর ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মুখের ডান পাশে (চোখ, গালের হাড় ও থুতনির অংশে) প্রায় ৩x২ ইঞ্চি মাপের ফোলা জখম বা ছিলে যাওয়ার কালচে দাগ (ব্রুজেস) পাওয়া গেছে।’
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘শ্বাসরোধে হত্যা (স্ট্র্যাঙ্গুলেশন)। প্রতিটি লাশের গলায় আনুভূমিকভাবে (হরিজন্টাল) পুরো গলা পেঁচানো লিগেচার মার্ক পাওয়া গেছে। ত্বকের ভেতরের টিস্যুতে (সাবকিউটেনিয়াস টিস্যু) রক্তক্ষরণ ঘটেছিল যা সাধারণ পানি দিয়ে ধুয়ে যায়নি এবং শ্বাসনালী ও খাদ্যনালী প্রচণ্ড রক্তবর্ণ/ফুলে ছিল (হাইলি কনজেস্টেড)। এটি নিশ্চিত করে যে কোনো নরম ও নমনীয় ভোঁতা অস্ত্র (যেমন- দড়ি বা কাপড়) দিয়ে গলায় ফাঁসবদ্ধ করে শ্বাসরোধে তাদের হত্যা করা হয়েছে।’
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘যৌন নির্যাতনের আলামত পরীক্ষা: প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও আগামী চক্রবর্তীর বাহ্যিক যৌনাঙ্গে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি এবং সংগৃহীত ভেজাইনাল সোয়াব পরীক্ষায় কোনো শুক্রাণু মেলেনি। অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্বে জোরপূর্বক যৌন নির্যাতনের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।’
মৃত্যুর পরের অবস্থান নিয়ে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মৃত্যুর পর শরীরের বাহ্যিক পচন: প্রতিটা লাশই আংশিক পচে গিয়েছিল। পচনজনিত গ্যাসের কারণে চোখ বাইরের দিকে বের হয়ে এসেছিল, মুখ খোলা ছিল এবং জিহ্বা ফুলে মুখ থেকে বের হয়ে এসেছিল।’
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘ত্বক ও টিস্যুর রূপান্তর: শরীরের অনাবৃত অংশ কালচে বর্ণ ধারণ করেছিল, চামড়ায় পচনজনিত ফোসকা এবং রক্তের শিরা ভেসে ওঠার দাগ দেখা গেছে। শরীর থেকে পচা দুর্গন্ধযুক্ত তরল নির্গত হচ্ছিল এবং অনাবৃত অংশে পোকা বা মাছি জন্মেছিল।’
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘অভ্যন্তরীণ অঙ্গসংস্থানের অবস্থা: পচনের কারণে মস্তিষ্কের টিস্যু গলে তরল হয়ে গিয়েছিল। যকৃৎ, প্লীহা ও বৃক্ক পচে নরম ও ফুলে গিয়েছিল এবং পাকস্থলী ও অন্ত্র পচনজনিত গ্যাসে স্ফীত অবস্থায় ছিল।’
এ ব্যাপারে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা: বাবুল কিশোর কুমার জানান, ‘ধর্ষণের বিষয়ে আমরা যতটুকু চেষ্টা করেছি, তাতে আমাদের লোকাল কোনো সাইন নাই যে এটা ধর্ষণের কোনো চেষ্টা হয়েছে। এবং ওখান থেকে যে সোয়াবগুলি আমরা পাঠিয়েছিলাম... মানে মাইক্রোবায়োলজির ল্যাব এবং মাইক্রোস্কোপিক এক্সামিনেশনের জন্য, সেগুলিও ওরকম কোনো সাইন কিছু বলে নাই। সুতরাং আমরা সে অর্থে বলতে পারি যে, ধর্ষণের মতো কোনো কিছু আমরা বাদ দিতে পারি আর কি। তাদের নাই।’
ডা: বাবুল বলেন, ‘সে অবস্থায় আমরা পরীক্ষা করেছি। তার ভেতরে এক্সটার্নাল কিছু বোঝা গেছে। কিছু ডিসেকশনের পরে আমাদের কাছে বোঝা গেছে আঘাতের দাগগুলি। মাথাতেও আছে অনেকেরই, বুকে আছে। এবং প্রত্যেকেরই গলাতেই দাগ আছে। তো সে কারণে আমরা ধরে নিচ্ছি যে অধিকাংশ... মানে এইসবগুলো মৃত্যুই আসলে শ্বাসরুদ্ধ করেই হত্যা করা হয়েছে।’
ডা: বাবুল বলেন, ‘আঘাতের পরিমাণ মনে করেন যে আপনি আমাকে হত্যা করবেন, আমি তো আপনাকে গলা বাড়িয়ে দেবো না। আমি তো আপনার সাথে ফাইট করব। সে ফাইট করতে গিয়ে আমি দেয়ালে গুঁতো খেতে পারি, ফ্লোরে গুঁতো খেতে পারি। আপনি একটা কিল মারতে পারেন, ঘুষি মারতে পারেন। আমিও হয়তো আপনাকে সেরকম চেষ্টা করব, তাই না? অত সহজে তো আমি আপনার কাছে হার মানব না। সুতরাং তারাও তো সে চেষ্টাটা করেছে।’
ডা: বাবুল বলেন, ‘আমরা ঠিক ওইভাবে বলতে চাই না যে, এটা ঠিক অস্ত্রের মতো অস্ত্র হবে। আমরা হাতকেও একটা অস্ত্র মনে করি। এটা দিয়েও খামচে দিলেও একটা ইনজুরি হবে, একটা ঘুষি দিলেও একটা ইনজুরি হবে। ফলে আমরা ওরকম ওয়েপনের নামটা বলতে পারব না যে, এটা ভারী অস্ত্র বা অমুক-তমুক। এসব আমরা বলতে চাই না। আমরা বলতে চাই এটা শার্প ওয়েপন না ব্লান্ট ওয়েপন। আমরা এভাবে বলি যে, সেটা একটা ঘুষি মারলে ওটা ব্লান্ট ওয়েপন। আপনার হাতও একটা ওয়েপন। এমনকি আপনি যদি ফ্লোরে পড়ে যান, এই ফ্লোরও একটা ওয়েপন—আপনার মাথায় ইনজুরি হয়েছে। ঠিক আছে? সে অর্থে আমরা ওয়েপন।’
ডা: বাবুল বলেন, ‘আমরা যখন ওয়েপন বলি, তখন সবাই অস্ত্রের বাইরে আর অন্যকিছু চিন্তা করে না। কিন্তু যেকোনো কিছুই অস্ত্র হতে পারে। আপনি যেটার সাথে আঘাত পেয়েছেন, ওটাই অস্ত্র। আপনাকে ইনজিউরড করার জন্য সেটাই অস্ত্র। না, ডেপথ আসলে এটার কি... যেটা তো কাটা দাগ না, যার কারণে আমরা ডেপথ বলতে পারি না। কোথাও কোনো কাটা-ছেঁড়া নাই। যতগুলো ইনজুরি সবই ব্লান্ট ইনজুরি আর কি। ব্লান্ট ইনজুরির মধ্যে মানে মনে করেন যে আমরা যদি বাংলায় বলতে চাই, তাহলে আমরা বলতে পারি যে, ওই ফোলা দাগ—এরকম। ঠিক আছে? কোনো ছিলে গেছে—এরকম কিছু নাই।’
শুক্রবার (২১ আগস্ট) ভোরে রংপুর মহানগরীর মাছখোয়া পাড়ার তালাবদ্ধ নিজ বাড়িতে খুন হন রংপুর জিলা স্কুলের গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বোলা, কন্যা কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে সদ্য মাস্টার্স করা আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী, পুত্র রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আয়ুষ চক্রবর্তী প্রিয়ম। শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টার পরে তাদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় সিদ্ধার্থ দাস এবং মুগ্ধ দাস নামে দুইজনকে সোমবার (২৩ আগস্ট) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা সেদিন রাতেই রংপুর মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এর বিচারক রফিকুল ইসলামের কাছে খুনের কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। এছাড়াও মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) একই আদালতে সাক্ষী হিসেবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের বন্ধু সীমান্ত। সেই রাতে সীমান্তের ঘরে ইয়াবা সেবন করেছিল তারা।
এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করছেন রংপুরের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং শিক্ষার্থীরা।



