কালীগঞ্জে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও মাদক কারবারের মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে সেবনকারী-খুচরা বিক্রেতা গ্রেফতার হলেও মাদকের বড় চালান সরবরাহকারী, মাদকের ভয়ংকর সিন্ডিকেট ও নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মাদকের ছোবলে বিপর্যস্ত এলাকাবাসী। এ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, চোলাই মদ, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক কেনাবেচা চলছে। অলিগলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাজার ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাদক সহজলভ্য হয়ে পড়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কিশোর ও তরুণদের ওপর। মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধের কারণে চুরি, ছিনতাই, মারামারি ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধও বাড়ছে। অনেক পরিবার মাদকাসক্ত স্বজনের কারণে আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায় মাদক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচিত হলেও বাস্তবে মাদকের মূল উৎস বন্ধে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মাদকবিরোধী বিভিন্ন সভা ও কর্মসূচিতে মাদক কারবারের সাথে সম্পৃক্ত বলে পরিচিত ব্যক্তিদেরও কখনো কখনো বক্তব্য দিতে দেখা যায়। এতে মাদকবিরোধী কার্যক্রমের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
থানা সূত্রে জানা যায়, গত আট মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে গাঁজা, ৫৪৫০ পিস ইয়াবা, ১৮২৪ ক্যান বিয়ার, ৫১০ লিটার চোলাই মদ ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যসহ প্রায় ১১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারায় ৯৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় সাজা দেয়া হচ্ছে।
উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার শতাধিক স্পটে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার লোক এই মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। তাদেরকে ইউনিয়ন পর্যায়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তদারকি করছে ৪০-৫০ জন মাদক কারবারি। তারা সকলেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য। তবে পুলিশ ও স্থানীয়রা জামালপুর ও মোক্তারপুর এলাকাকে মাদকের হটস্পট হিসেবে মনে করেন। কারণ শীতলক্ষ্যার অপর পাড়ে পলাশ প্রান্ত থেকে এসকল এলাকা দিয়েই মাদকের বড় চালান কালীগঞ্জে প্রবেশ করে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ছোটখাটো বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান হলেও মূল হোতা বা সরবরাহকারী, অর্থের জোগানদাতা, পরিবহনকারী ও নেপথ্যের নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না থাকায় স্থায়ীভাবে এর সমাধান হচ্ছে না। ইউনিয়ন পর্যায়ের রাজনৈতিক দলের সদস্যদের তদারকিতেই চলছে রমরমা মাদক ব্যবসা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানায়, পৌরসভার দক্ষিণ ভাদার্তীর শাজাহানের ছেলে সালাউদ্দিন, উত্তর ভাদার্তীর মরহুম কামাল দেওয়ানের স্ত্রী বীনা ও তার ছেলে, দুর্বাটী শাখাওয়াতসহ শতাধিক লোক পৌর এলাকায় মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত।
নাগরী ইউনিয়নের দক্ষিণ বিরতুল গ্রামের ফজুর ছেলে ফারুক হোসেন, বিরতুল মধ্য পাড়ার খায়রুল ইসলামের ছেলে আবদুল খালেক, গলান এলাকার আফছুরুদ্দী, বেলুন এলাকার নবু, রাথুরা এলাকার মামুন, সোহেল ও শফিকুল দীর্ঘদিন যাবত এলাকায় মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
তুমলিয়া ইউনিয়নের উত্তর সোমের মিরাপাড়া এলাকার সেলু দেওয়ানের পুত্র রাকিব, টিউরী এলাকার খোকন, সানাইয়া এলাকার রুহুল আমিনের ছেলে আশরাফ, ফিরিন্দা এলাকার চুনু মিয়ার ছেলে নুরুল হক, ফাইজউদ্দিনের ছেলে হিরণ মিয়া ও আফাজউদ্দিনের ছেলে বিপ্লব, ইছাপুরা এলাকার সোহেলের ছেলে হাসান, সোলেমানের ছেলে আফসার, দক্ষিণ সোমের মানিকের ছেলে রাকিব মাদকের বড় ডিলার।
উপজেলা বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক ফজলুর রহমান আকন্দের ভাতিজা জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের কাউলিতা এলাকার আলমগীর, সাবেক ছাত্রদল নেতা জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের ইয়াসিন মোল্লার বড় ভাই জাঙ্গালিয়া মোল্লা বাড়ির আল-আমিন, জাঙ্গালিয়া গাজী বাড়ির রাকেশ, নরুন এলাকার জব্বারের ছেলে নাজমুল ও আজমতপুরের বাছিরের ছেলে নাজমুলের তদারকিতে চলে রমরমা মাদক ব্যবসা।
জামালপুর ইউনিয়নের কাপাইশ এলাকার মজিবুর দেওয়ান, বাগদী এলাকার সোহেল, কলাপাটুয়ার জয়নাল শেখের পুত্র সোহরাব ও কাদির ব্যাপারীর ছেলে রফিকুল; জামালপুর এলাকার মাহবুবের ছেলে বুলবুল, আফসার মোড়লের ছেলে গাফফার মোড়ল, মৃত মিন্নত আলীর ছেলে আলমগীর মোড়ল ও দুলাল বাগমার জহির মোড়লের শেল্টারে থেকে এলাকায় রমরমা মাদক ব্যবসা চালাচ্ছে।
বাহাদুরশাদী ইউনিয়নের খলাপাড়া এলাকার নুরুল হক নূরী ও সৌরভ এবং জামালপুর এলাকার বাবুর তদারকিতে সামসুল, মনির ও হান্নান মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
মোক্তারপুর ইউনিয়নের বড়গাঁও এলাকার মৃত ফাইজুদ্দিনের ছেলে জিয়ারুল, পোটান এলাকার এরশাদসহ শতাধিক মাদক কারবারি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা চালাচ্ছে।
উল্লেখ যে, গত জুলাই মাসে মোক্তারপুর ইউনিয়নের নোয়াপাড়া চৌরাস্তা মোড়ে মাদকবিরোধী কর্মসূচিকে নস্যাৎ করতে মিছিল লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তরা কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ একজনকে আটক করে। অতিসম্প্রতি ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে ৩০০০ পিস ইয়াবাসহ কালীগঞ্জ উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের কলাপাটুয়া গ্রামের ছিদ্দিক মোল্লার পুত্র মো. জয়নাল আবেদীন ওরফে মিন্টুকে (৪৭) ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। স্থানীয়রা জানায়, আটককৃত মিন্টু একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার আত্মীয় বলে এলাকায় পরিচিতি রয়েছে।
সচেতন মহলের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু সভা, মানববন্ধন কিংবা লোকদেখানো অভিযান নয়; মাদকের উৎস, সরবরাহ নেটওয়ার্ক ও অর্থের লেনদেন চিহ্নিত করে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
মাদকের এমন ভয়াবহতায় উদ্বেগ জানিয়ে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশরাফি হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘মাদক একটি সমাজ ও পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। যুবসমাজকে রক্ষা করতে নিয়মিত পুলিশি অভিযানের পাশাপাশি সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতামূলক সভা-সমাবেশের আয়োজন করা জরুরি। যুব সংগঠন ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে একটি 'মাদকমুক্ত সমাজ' গড়া সম্ভব।’
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মো: জাকির হোসেন বলেন, ‘মাদক নির্মূলে ও যুবসমাজকে রক্ষা করতে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। অভিযানের পাশাপাশি প্রশাসন সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করছে। স্থানীয় স্কুল-কলেজে আলোচনা সভা, মসজিদে প্রচারণা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মাদকবিরোধী মানববন্ধন এবং যুবসমাজকে খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’
গাজীপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো: এমদাদুল হক মিঠুন মুঠোফোনে বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে।’
সেবনকারী ও খুচরা বিক্রেতারা গ্রেফতার হলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে—এ বিষয়ে একমত প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘জোগানদাতা ও নেপথ্যের নিয়ন্ত্রকদের সম্পদের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং উপজেলাভিত্তিক তালিকা প্রস্তুত করার কাজ চলছে। শিগগিরই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কালীগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযান আরো জোরদার হবে এবং প্রকৃত কারবারি ও নেপথ্যের হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সাথে মাদকাসক্তদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
কালীগঞ্জবাসীর প্রশ্ন: মাদকবিরোধী সভা-সমাবেশ আর বক্তব্য কতদিন? এবার কি ধরা পড়বে মাদকের মূল হোতারা?



