হাঁটু পানি মাড়িয়ে স্কুলে যেতে হচ্ছে বদলগাছীর ১৩২ শিক্ষার্থীকে

‘প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসছে। কিন্তু নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে যদি প্রতিদিন হাঁটুসমান পানি পেরোতে হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি বিদ্যালয়ের সমস্যা নয়, আমাদের শিক্ষা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতারও প্রতিচ্ছবি।’

Location :

Badalgachhi
হাঁটু পানি মাড়িয়ে স্কুলে যাচ্ছে ছোট্ট শিশুরা
হাঁটু পানি মাড়িয়ে স্কুলে যাচ্ছে ছোট্ট শিশুরা |নয়া দিগন্ত

বদলগাছী (নওগাঁ) সংবাদদাতা

সকালের আলো ফুটতেই কাঁধে স্কুলব্যাগ, হাতে জুতা। বই-খাতা যাতে ভিজে না যায় তাই কেউ ব্যাগ তুলে ধরে মাথার ওপরে, কেউ আবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকে। তারপর হাঁটুসমান পানির মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে স্কুলের পথে।

এটি কোনো দুর্গম হাওরাঞ্চলের দৃশ্য নয়; এটি নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার গাবনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৩২ শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের বাস্তবতা।

বর্ষা এলেই বিদ্যালয়ে পৌঁছানো এসব কোমলমতি শিক্ষার্থীর জন্য হয়ে ওঠে এক কঠিন পরীক্ষা। সামান্য বৃষ্টিতেই বিদ্যালয়ের একমাত্র যাতায়াতের রাস্তা তলিয়ে যায়। ফলে স্কুলে যাওয়া-আসার প্রতিটি পদক্ষেপে থাকে কষ্ট, ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তা।

বিদ্যালয় ছুটির পর দেখা যায়, একদল শিশু হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে বাড়ির পথে ফিরছে। কারো স্কুলড্রেস ভিজে গেছে, কারো হাত-পায়ে কাদামাটি। অনেকের মুখে ক্লান্তির ছাপ, তবু চোখে স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ। কারণ তারা জানে, কষ্ট হলেও পড়াশোনা বন্ধ করা যাবে না।

অথচ বিদ্যালয়টি কোনো দুর্গম এলাকায় নয়, উপজেলা সদর থেকে খুব বেশি দূরেও নয়। কিন্তু কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যা চললেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।

অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রতিদিন পানি পেরিয়ে যাতায়াতের কারণে শিশুদের বই-খাতা ও পোশাক নষ্ট হচ্ছে। পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। ছোট শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় তাদের।

বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, শুধু রাস্তা নয়, বিদ্যালয়ের পুকুর-সংলগ্ন একটি ভবনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দ্রুত সংস্কার না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।

গাবনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসছে। কিন্তু নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে যদি প্রতিদিন হাঁটুসমান পানি পেরোতে হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি বিদ্যালয়ের সমস্যা নয়, আমাদের শিক্ষা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতারও প্রতিচ্ছবি।’

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। উপজেলার ৩৪টি বিদ্যালয়ের যাতায়াত সমস্যা সমাধানে নতুন রাস্তা নির্মাণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। দ্রুত কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।’

বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান ছনি জানান, উপজেলার একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাতায়াত ব্যবস্থায় সমস্যা রয়েছে। গাবনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জলাবদ্ধতা নিরসনেও দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তবে আশ্বাসে ভরসা খুঁজে পাচ্ছেন না স্থানীয়রা। তাদের দাবি, বছরের পর বছর ধরে একই প্রতিশ্রুতি শুনলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি।

তাদের মতে, একটি নিরাপদ রাস্তা ও স্থায়ী পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে শুধু ১৩২ শিক্ষার্থী নয়, পুরো এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কমবে।

শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু গাবনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের কাছে সেই অধিকার অর্জনের প্রথম শর্তই যেন হাঁটুসমান পানি পেরিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছানো। প্রশ্ন একটাই— শিশুদের এই প্রতিদিনের সংগ্রামের শেষ কবে?