মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় অসম্পন্ন মনু নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ নিয়ে আতঙ্কিত স্থানীয়রা। প্রকল্পটির কাজ আংশিক শেষ হয়েছে। তার মধ্যে বিভিন্ন স্থান ক্ষতিগ্রস্ত। অরক্ষিত এই প্রতিরক্ষা বাধ মনু পারের কয়েক লাখ মানুষের দুঃখের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।
বিশেষকরে সীমান্তবর্তী এলাকায় বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত চারটি অংশে সংস্কারকাজ করা সম্ভব হয়নি বিএসএফের বাধায়। এবারো বর্ষায় অরক্ষিত এই প্রতিরক্ষা বাঁধের কারণে নিজেদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন মনু পাড়ের মানুষ।
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ভাঙন ও আকস্মিক বন্যা তাদের নিত্যসঙ্গী। তবে কুলাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী চারটি এলাকায় ভারতীয় বিএসএফের বাধায় বেড়িবাঁধের কাজ বন্ধ থাকায় আতঙ্কে মনু পাড়ের মানুষ। ২০২১ সালে শুরু হওয়া প্রকল্প নির্ধারিত তিন বছর সময়ের মধ্যে সুফল মেলেনি। কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি নানা সমস্যায়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, নির্ধারিত সময়ে বাঁধের কাজ তিন ভাগের দুই ভাগ করা হয়েছে। প্রকল্প পরিকল্পনা নির্ধারণ ও জমি অধিগ্রহণ, সীমান্তবর্তী এলাকাতে বিএসএফের বাধাসহ জটিল নানা প্রক্রিয়া সম্পাদনে কালক্ষেপণ হওয়ায় দেরি হচ্ছে বাঁধের কাজ। এছাড়া ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপন্ন হয়ে বয়ে আসা মনু নদীর অবস্থান ও প্রবেশপথ সীমান্তবর্তী এলাকাতে হওয়ায় দুই দেশের নদী ও নদী সুরক্ষাবিষয়ক নানা ইস্যুতে জটিলতাও গতি মন্থর করেছে বাঁধের কাজে।
২০২১ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে শেষ না হওয়ায় এবারো বর্ষায় কুলাউড়া, রাজনগর, সদর উপজেলা বন্যার কবলে পড়তে হয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা এলে মনুপাড়ে বন্যার আশঙ্কা দেখা দেয়। এবারো কুলাউড়া উপজেলার নদী-তীরবর্তী চারটি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ রয়েছেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
গত ৮ জুলাই গভীর রাত থেকে মনু নদীতে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে নেমে আসা ঢলে পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া এলাকার বেরিবাঁধের একটি সড়কে ২০২৪ সালে ভেঙে যাওয়া পুরাতন বাঁধ দিয়ে ফের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। এতে পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া, আলীনগরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। সীমান্তবর্তী এরাকার রাস্তা, বসতবাড়ি, কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েক গ্রামের শতাধিক পরিবার।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ দ্রুত শেষ করার দাবিতে তারা নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। মানববন্ধন করে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তারপরও বিএসএফের বাধাসহ নানা কারণে ২০২১ সালে শুরু হওয়া মনু প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি।
বিশেষ করে শিকরিয়া, নিশিন্তপুর, তেলিবিল, দত্তগ্রাম এরাকার ক্ষতিগ্রস্ত অংশের সংস্কার কাজ আটকে থাকায় এবার বর্ষায়ও বাড়ছে বন্যার শঙ্কা।
এরপরও বাঁধের কাজ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানা যাচ্ছে না।
এদিকে, মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম গত ১৩ জুলাই চলতি সংসদ অধিবেশনে বিষয়টি উপস্থাপন করেন পয়েন্ট অব অর্ডারে।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, বন্যা আর ভাঙন থেকে কুলাউড়া উপজেলাকে রক্ষা করতেই ২০২০-২১ অর্থ বছর থেকে ২৮টি প্যাকেজে ৩০৭ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এসব কাজের মধ্যে, প্রতিরক্ষামূলক কাজের ২০টি, চর অপসারণ কাজের ৪টি এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ কাজের ৪টি প্যাকেজের কাজ রয়েছে। প্রকল্পের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কুলাউড়া উপজেলায় কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৮০ শতাংশ।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, কুলাউড়ার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের, মনু নদীর শিকড়িয়ার বেড়িবাঁধটি ২০২৪ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে বছর বাঁধের যে ১০০ ফুট অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা এখন পর্যন্ত সংস্কার করা হয়নি। কয়েকদিন অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে মনু নদীর বৃদ্ধি পাওয়া পানিতে সীমান্তবর্তী শিকড়িয়ার পুরাতন ভাঙন দিয়ে পানি প্রবেশ করায় স্থানীয় এলাকার মানুষের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৪ সালে থেকে বিএসএফের বাধায় মনু নদীর শিকড়িয়া বেড়িবাঁধের কাজ বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ দিয়ে চলাচলের জন্য স্থানীয়রা বাঁশের সাকো তৈরি করেছেন।
রাজাপুর, বেলরতল, ছৈদল এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো ঠিকাদারদের গড়িমসি, জমি অধিগ্রহণ ও সময়মতো অর্থের ছাড় না থাকায় কাজ বাস্তবায়নে বারবার বাধার সৃষ্টি হয়েছে বলেও জানিয়েছেন এসব এলাকার বাসিন্দা।
তারা আরো বলেন, ২০২৪ সালের ২১ আগস্টের বন্যায় উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া, টিলাগাঁও ইউনিয়নহ আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রামের পাঁচ শতাধিক মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর আগে ২০১৮ এবং ২০২২ সালে দুই দফা বন্যায়ও উপজেলার টিলাগাঁও, হাজীপুর, শরীফপুর ও পৃথিমপাশা ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বাড়লে প্রতিরক্ষা বাঁধ, নদী আর গ্রাম কোনোটির অস্তিত্ব থাকে না। সেইসাথে এ ইউনিয়নগুলোর বানভাসি লোকজন প্রতিটি মুহূর্তে বন্যার আতঙ্কে দিন কাটায়।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলিদ বলেন, ‘মনু নদী প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ এখন পর্যন্ত ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। নানা জটিলতার কারণে কাজ কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে। বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারকাজ করতে গেলে সীমান্তবর্তী কিছু স্থানে বিএসএফের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ-ভারত শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এতে শরীফপুর ইউনিয়নের চারটি স্থানে মোট ১ হাজার ৪০০ মিটার অংশের কাজ বন্ধ রয়েছে। এই স্থানে কাজ করার অনুমতি চেয়ে ২০২৩ সালে যৌথ নদী কমিশন ঢাকার পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিতে চিঠিও দিয়েছিল। দুই দেশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচনা চলমান রয়েছে। শিকড়িয়াসহ ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতে আমাদের কর্মীরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন।’
কুলাউড়ার ইউএনও সানজিদা আক্তার বলেন, ‘মনু নদীর বৃহৎ প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে জেলা উন্নয়ন সভায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। বিএসএফের বাধা নিরসনের জন্য সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে জানানো হয়েছে।’



