সোনারগাঁওয়ে বড় সরদার বাড়ি রক্ষা ও অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন

সোনারগাঁও বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো বড় সরদার বাড়ি জাতীয় প্রত্নসম্পদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। অথচ কোক স্টুডিও বাংলা সিজন-৪-এর শুটিংয়ের জন্য স্থাপনাটি মাত্র ছয় লাখ টাকায় ভাড়া দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা

Location :

Sonargaon
সোনারগাঁওয়ে বড় সরদার বাড়ি রক্ষা ও অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন
সোনারগাঁওয়ে বড় সরদার বাড়ি রক্ষা ও অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন |নয়া দিগন্ত

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়ি রক্ষা এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে ফাউন্ডেশনের প্রধান গেটের সামনে সুবর্ণগ্রাম সংস্কৃতি অঙ্গন ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর উদ্যোগে এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধনে সাংস্কৃতিক কর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

মানববন্ধনে সুবর্ণগ্রাম সংস্কৃতি অঙ্গনের সভাপতি কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েসের সভাপতিত্বে ও সুজন সোনারগাঁও শাখার সধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মামুনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি, সংগঠনের সহ-সভাপতি কবি রহমান মুজিব, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল, সোনারগাঁও সাহিত্য নিকেতনের সভাপতি আসমা আকতারী, সদস্য রোকেয়া আক্তার, সাংবাদিক গাজী মোবারক, এরশাদ হোসাইন অন্য প্রমুখ। এ সময় স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সোনারগাঁওয়ের বড় সরদার বাড়ি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। তাই এর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি। একইসাথে সম্প্রতি ঐতিহাসিক স্থাপনাটিতে কোক স্টুডিও বাংলার শুটিংয়ের অনুমতি দেয়ার বিষয়টিও তদন্তের দাবি জানান তারা।

মানববন্ধনে সুবর্ণগ্রাম সংস্কৃতি অঙ্গনের সভাপতি কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েস বলেন, সোনারগাঁও বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো বড় সরদার বাড়ি জাতীয় প্রত্নসম্পদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। অথচ কোক স্টুডিও বাংলা সিজন-৪-এর শুটিংয়ের জন্য স্থাপনাটি মাত্র ছয় লাখ টাকায় ভাড়া দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে— এমন তথ্য ও অভিযোগ তাদের কাছে এসেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, চার দিন ধরে চলা শুটিংয়ে ভারী লাইটিং, জেনারেটর ও বিভিন্ন শুটিং সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে। স্থাপনার দেয়ালে পেরেক ও রড ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

শুটিং শেষে বাড়িটির বিভিন্ন স্থানে দেয়াল ও স্থাপনার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দৃশ্যমান ক্ষতির পাশাপাশি স্থাপনাটির কাঠামোগত কোনো ক্ষতি হয়েছে কি-না, তা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

কবি শাহেদ কায়েস আরো বলেন, শুটিংয়ের আগে স্থাপত্য বিশেষজ্ঞরা ফাউন্ডেশনের সংশ্লিষ্টদের স্থাপনাটির ভেতরে শুটিং না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এরপরও শুটিং হয়ে থাকলে অনুমতি দেয়ার প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও নির্ধারিত শর্তগুলো তদন্তের আওতায় আনা উচিত।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালকের বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগও স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।

মানববন্ধনে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, বড় সরদার বাড়ি শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি সোনারগাঁয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এমন স্থাপনায় বাণিজ্যিক শুটিংয়ের অনুমতি দেয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, মাত্র ছয় লাখ টাকার বিনিময়ে ঐতিহাসিক স্থাপনা ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়ে থাকলে এর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, পরিচালকের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে কোনো ধরনের প্রভাব বা হস্তক্ষেপ থাকা উচিত নয়। এজন্য স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানান তিনি। একইসাথে অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু অপসারণ নয়, আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।

বক্তারা বড় সরদার বাড়ির ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্যায়ন, কোক স্টুডিও বাংলার শুটিংয়ের অনুমতি দেয়ার প্রক্রিয়া তদন্ত এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।

এদিকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলম জানান, শুটিং করার নীতিমালা আগেই ছিল। সেই আলোকেই আমরা শুটিংয়ের অনুমতি দিয়েছি। শুটিংয়ের আগেই কিছু অংশ ভাঙা ছিল। ফাউন্ডেশনের গর্ভনিং বডির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোক স্টুডিওর পরিচালককে এটি ভাড়া দেয়া হয়েছিল। রেজুলেশনে বলা হয়নি এতে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে। অতীতেও পরিচালককে ভাড়া দেয়া হয়েছিল। সেই আলোকে আমরা দিয়েছি। এখন আপাতত বড় ধরনের শুটিংয়ের অনুমোদন বন্ধ রাখা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, যারা ভাড়া নিয়েছে তাদেরই তো দায়িত্ব এটা সুরক্ষা রাখার। আমরা এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করব।