ইতালিতে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ছয় তরুণ। সেই স্বপ্ন পূরণের আশায় স্থানীয় দালালের মাধ্যমে অবৈধ পথে দেশ ছাড়েন তারা। প্রায় আট-নয় মাস আগে লিবিয়ায় যাওয়ার পর সম্প্রতি মানব পাচারকারী চক্রের হাতে জিম্মি হয়েছেন তারা। তাদের ওপর চালানো হচ্ছে অমানবিক নির্যাতন।
নির্যাতনের ভিডিও ও ছবি ধারণ করে পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠিয়ে জনপ্রতি ২৭ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করছে চক্রটি। টাকা না দিলে হত্যার হুমকিও দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পরিবারের।
ভুক্তভোগী তরুণেরা হলেন—মনোহরগঞ্জ উপজেলার খিলা ইউনিয়নের দিশাবন্দ গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে শাহাদাত হোসেন (২০), মাহবুবুর রহমানের ছেলে মানিকুল ইসলাম (২০), হারুনুর রশিদের ছেলে মো: সোহেল (২৭), ছবু মিয়ার ছেলে তাজ মোহাম্মদ (২৫), সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে ফয়সাল (২০) এবং লক্ষ্মণপুর ইউনিয়নের বেতিয়াপাড়া গ্রামের শাহ আলমের ছেলে মেহেদী হাসান (২১)।
ভুক্তভোগী শাহাদাত হোসেন খিলা ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হারুনুর রশিদের ভাগনে। আর মেহেদী হাসান তার শ্যালক।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ইউপি সদস্য হারুনুর রশিদ বলেন, ‘প্রতিদিনই ওদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। সেই নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। জনপ্রতি ২৭ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ চাওয়া হচ্ছে। টাকা দিলে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলছে তারা। আর টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে।’
তিনি জানান, প্রায় এক সপ্তাহ আগে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগের খবর তাঁরা পাননি।
হারুনুর রশিদ বলেন, ‘আমার শ্যালক, ভাগনেসহ ছয় তরুণের কেউ আট মাস আগে, কেউ নয় মাস আগে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে লিবিয়ায় যান। দালালের সাথে চুক্তি ছিল, লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে তাদের ইতালিতে পাঠানো হবে। এ জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা করে নেয়া হয়। কিন্তু প্রায় ২০ দিন আগে তারা একটি মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি হন। পরিবারের সদস্যদের ধারণা, দালালদের সহযোগিতায় তাদের জিম্মি করা হয়েছে।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, মুক্তিপণের টাকা আদায়ের জন্য ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপে তাদের কাছে নির্যাতনের ভিডিও ও ছবি পাঠানো হচ্ছে। কখনো ভিডিও কল চালু রেখেও নির্যাতনের দৃশ্য দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
হারুনুর রশিদ আরো বলেন, ‘মাফিয়া চক্রটি জানিয়েছে, প্রত্যেকের জন্য ২৭ লাখ টাকা করে দিলে তাদের দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। টাকা না দিলে হত্যা করে লাশ সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের কারো পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। ঋণ করে, জমিজমা বিক্রি করে কিংবা ধারদেনা করে তারা দালালদের টাকা দিয়েছেন। এখন তারা সম্পূর্ণ দিশাহারা।’
এদিকে দিশাবন্দ গ্রামের বাসিন্দা মানিকুল ইসলামের বাবা মাহবুবুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের গ্রামের বেলাল হোসেনের ছেলে মানিক বিদেশে লোক পাঠায়। ইতালি নিয়ে গিয়ে ভালো চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়ার কথা বলে সে সবাইকে ফাঁদে ফেলেছে। মানিক তার ভাই সামছুল আলমের মাধ্যমে প্রায় নয় মাস আগে আমার কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা নিয়েছে। গ্রামের মানুষ হওয়ায় আমরা তাকে বিশ্বাস করেছিলাম। সে আমার ছেলেকে লিবিয়ায় নিয়ে মাফিয়া চক্রের কাছে তুলে দিয়েছে। আমার ছেলেকে প্রতিদিন মারধর করা হচ্ছে। এই দৃশ্য আর সহ্য করতে পারছি না।’
ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দিশাবন্দ গ্রামের বেলাল হোসেনের ছেলে মানিক দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে লোক পাঠানোর কাজ করেন এবং বর্তমানে লিবিয়ায় অবস্থান করছেন। দেশে তার হয়ে কাজ করেন তার ভাই সামছুল আলম।
পরিবারগুলোর অভিযোগ, দালাল মানিক ও তার ভাই সামছুল আলমের মাধ্যমেই ওই ছয় তরুণ লিবিয়ায় যান। তাদের ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তারা মানব পাচারকারী চক্রের হাতে জিম্মি হয়েছেন।
এদিকে ভুক্তভোগীদের নির্যাতনের ভিডিও ও ছবি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযুক্ত দালাল মানিকের ভাই সামছুল আলমসহ তার পরিবারের সদস্যরা এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দ্রুত সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করে তাদের স্বজনদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।



