পদ্মাসেতুতে টোল আদায় ৩৪২৯ কোটি, ১৬ কিস্তি পরিশোধ

পদ্মাসেতুর নির্মাণ ব্যয়ের ঋণ পরিশোধের জন্য অর্থ বিভাগের সাথে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) একটি সুনির্দিষ্ট চুক্তি রয়েছে।

গোলাম মঞ্জুরে মাওলা অপু, লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ)

Location :

Munshiganj
পদ্মাসেতুর টোল প্লাজা
পদ্মাসেতুর টোল প্লাজা |ফাইল ছবি

পদ্মাসেতু চালুর পর থেকে গত ২৯ জুন পর্যন্ত সেতু দিয়ে দুই কোটি ৬৮ লাখ ৬২ হাজার ৮০৮টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। এ সময়ে টোল বাবদ মোট তিন হাজার ৪২৯ কোটি ৪৫ লাখ ২৫ হাজার ৫৫০ টাকা আদায় হয়েছে।

আদায়কৃত টোল হতে এখন পর্যন্ত মোট ১৬টি কিস্তিতে দুই হাজার ৫১৬ কোটি ৬৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। আর এ সময় পর্যন্ত কোনো কিস্তি বকেয়া নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)। এছাড়া টোলের ১৫% ভ্যাট বাবদ মোট ৪৩৬ কোটি সাত লাখ ৭৪ হাজার ২২১ টাকা সরকারের কোষাগারে চালানের মাধ্যমে জমা প্রদান করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিকেলে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মাসুদ রানা শিকদারের পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে থেকে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুসারে, পদ্মাসেতুর নির্মাণ ব্যয়ের ঋণ পরিশোধের জন্য অর্থ বিভাগের সাথে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) একটি সুনির্দিষ্ট চুক্তি রয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, ৩৫ বছরে প্রতি তিন মাসে একটি করে কিস্তি মোট ১৪০টি কিস্তিতে এই ঋণ পরিশোধ করা হবে। চুক্তি অনুযায়ী ২০২২ থেকে ২৩ অর্থবছর থেকে সেতুটির ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে এবং এ ঋণ পরিশোধের জন্য ২০৫৬ থেকে ৫৭ অর্থবছর পর্যন্ত সময় পাবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।

সেতু কর্তৃপক্ষের পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, পদ্মাসেতু নির্মাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ও সরকারের অর্থ বিভাগের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ১% সুদহারে ৩৫ বছরের মধ্যে সুদসহ মোট ৩৬ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রতি অর্থবছরে চারটি কিস্তির মাধ্যমে সর্বমোট ১৪০টি কিস্তিতে উক্ত টাকা পরিশোধ করা হবে। আদায়কৃত টোল হতে এখন পর্যন্ত মোট ১৬টি কিস্তিতে দুই হাজার ৫১৬ কোটি ৬৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকা সরকারের কোষাগারে চালানের মাধ্যমে জমা প্রদান করা হয়েছে। মঙ্গলবার ৩০ জুন পর্যন্ত কোনো কিস্তি বকেয়া নেই।

এছাড়া, মোট আদায়কৃত টোলের ১৫% ভ্যাট বাবদ মোট ৪৩৬ কোটি সাত লাখ ৭৪ হাজার ২২১ টাকা সরকারের কোষাগারে চালানের মাধ্যমে জমা দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুসারে, সেতু কর্তৃপক্ষ এর আগে ২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল প্রথম দুই কিস্তি বাবদ ৩১৬ কোটি ৯০ লাখ ৯৭ হাজার ৪৯ টাকা পরিশোধের মাধ্যমে পদ্মাসেতু নির্মাণে সরকারের কাছ থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধ শুরু হয়। ২০২৩ সালের ১৯ জুন ঋণের তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তি বাবদ ৩১৬ কোটি দুই লাখ ৬৯ হাজার ৯৩ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ কিস্তিতে ৩১৫ কোটি সাত লাখ ৫৩ হাজার ৪৪২ টাকা পরিশোধ করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৭ জুন মাসে সপ্তম ও অষ্টম কিস্তিতে ৩১৪ কোটি ৬৪ লাখ ৮৬ হাজার ৫৪৮ টাকা পরিশোধের চেক হস্তান্তর করা হয়েছিলো। সেতু বিভাগ সে সময় শুরু থেকে অষ্টম কিস্তি পর্যন্ত মোট এক হাজার ২৬২ কোটি ৬৬ লাখ ছয় হাজার ৫৪৮ টাকা সরকারকে পরিশোধ করে বলে জানা যায়।

পদ্মাসেতুর ঋণ পরিশোধ ও টোল আদায় কার্যক্রম নিয়ে সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ জানান, মরহুমা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে ২০০২ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে পদ্মাসেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) সম্পন্ন করা হয়। সমীক্ষায় নির্ধারিত চার-লেনের হাইওয়ে এবং ভবিষ্যতে রেল সংযোগের প্রাথমিক সংস্থান সম্বলিত কারিগরি প্রস্তাবটি পরবর্তীতে সেতুর চূড়ান্ত নকশা প্রণয়নের মুখ্য ভূমিকা পালন করে। উক্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সুপারিশের ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মাওয়া প্রান্তে সেতুর অ্যালাইনমেন্ট চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করেন। উক্ত অনুমোদনের ফলে মাওয়া-জাজিরা রুটটিই দেশের ইতিহাসে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে যুক্ত করার একমাত্র প্রধান রুট হিসেবে স্থায়ী রূপ পায়।

সেতুর সংযোগ সড়ক এবং মাওয়া ও জাজিরা উভয়প্রান্তে নদী শাসনের জন্য প্রয়োজনীয় জমির সীমানা নির্ধারণ ও প্রাথমিক নকশা তৈরি করা হয়। উক্ত ২০০২ থেকে ২০০৫ মেয়াদের প্রক্রিয়াই পরবর্তীতে নকশা চূড়ান্তকরণ এবং মূল নির্মাণ কাজে যাওয়ার পথকে অনেক সহজ করে দিয়েছিল।

সেতু কর্তৃপক্ষের পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রীর সুদৃঢ় ও দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলে সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন বর্তমানে যথাযথভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। আজ আনন্দের সাথে আমরা দেশবাসীকে জানাতে পারি যে, পদ্মাসেতু শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার ভাগ্যই বদল করেনি, বরং এটি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কোনো কিস্তি বকেয়া না রেখে যথাসময়ে নির্ধারিত কিস্তি পরিশোধ করতে সক্ষম হয়েছি। একই সাথে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে সেতুর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ একটি আধুনিক, স্বয়ংক্রিয় ও ডিজিটাল যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই আর্থিক শৃঙ্খলা ও টোল আদায়ের এই ইতিবাচক ধারা বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আমরা অর্থ বিভাগের সমস্ত ঋণ পরিশোধ করে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে সেতু খাতের অবদান কাজে লাগাতে পারবো।

এছাড়া, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে সেতুর সার্বিক নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন এবং উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে ইউনিফাইড ন্যাশনাল ইটিসি ফ্রেমওয়ার্ক (ইউএনইএফ) ও অন্য জনবান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়নে সেতু বিভাগ ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও নিরলসভাবে কর্মরত বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের আওতাধীন নির্মিত পদ্মাসেতু উদ্বোধনের পর থেকে দেশের অর্থনীতিতে এক ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ২০২২ সালের ২৫ জুন প্রমত্তা পদ্মা নদীর বুকে চালু হয় ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দেশের অন্যতম বৃহৎ পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পটি। পরদিন ২৬ জুন হতে যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। প্রকল্পের সর্বশেষ প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ব্যয় সঙ্কোচননীতি অবলম্বন করে সর্বশেষ চূড়ান্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে প্রায় এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। বাকি ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দিয়েছে অর্থ বিভাগ।