দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর সময়সূচি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ইউনিট-১-এর রিঅ্যাক্টরের প্রেসারাইজারে থাকা পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি)-এর ত্রুটি বারবার পরীক্ষায় ধরা পড়ায় নির্ধারিত সময়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউনিট-২ থেকে একটি পিওআরভি খুলে ইউনিট-১-এ স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়ার পরমাণু প্রকৌশল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএসসি এএসই।
সূত্র বলছে, গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আইসিটি টাওয়ারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, সেফটি ভালভের ত্রুটির কারণে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে কবে নাগাদ ত্রুটি দূর হবে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিকল্প ব্যবস্থা কার্যকর না হলে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পটির বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার সময় আরও পিছিয়ে যেতে পারে। কারণ রিঅ্যাক্টরের নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই পিওআরভি । প্রাইমারি কুলিং সিস্টেমে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভালভটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সরকারি পর্যায়ের বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, ইউনিট-১-এর প্রেসারাইজার পিওআরভি -এর পরীক্ষা প্রায় পাঁচ সপ্তাহ ধরে কয়েক দফায় ব্যর্থ হয়েছে। ত্রুটি নিরসনে ভালভটির প্রধান নকশাবিদ বর্তমানে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় কাজ করছেন।
গত ১৭ আগস্ট ঢাকার সচিবালয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়।
রুশ পক্ষের বক্তব্য, রূপপুরের রিঅ্যাক্টর ডিজাইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ভালভটি বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে। ফলে বাজার থেকে একই ধরনের কোনো সাধারণ ভালভ কিনে এনে এটি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। এমনকি অতিরিক্ত নকশাবিদ আনা হলেও দ্রুত সমাধানের নিশ্চয়তা নেই।
বর্তমানে বিদ্যমান সরঞ্জামকে পুনরায় সমন্বয় করাকেই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ অবস্থায় ইউনিট-২ থেকে একটি পিওআরভি ইউনিট-১-এ স্থানান্তরের প্রস্তাব সামনে এসেছে।
দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক করে রুশ রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিন বৈঠকে জানান, রূপপুরের সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম ৫০ থেকে ৬০ বছর ব্যবহারের কথা মাথায় রেখে নকশা করা হয়েছে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে চালু করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত শক্তি, স্থায়িত্ব ও সক্ষমতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চলমান বিলম্বে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন সমস্যা সমাধানে বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণের ওপর জোর দেন। রুশ পক্ষ কারিগরি সমন্বয় ও মূল্যায়নের জন্য আরও কয়েক দিন সময় চেয়েছিল এবং বিষয়টির দ্রুত সমাধানে মস্কোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহিত করার আশ্বাস দেয়।
শুধু ভালভ নয়, বাকি আরও কাজ
ইউনিট-১-এর জটিলতা শুধু পিওআরভি -তে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকল্প কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ইউনিট-১-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫৮টি স্থাপনার মধ্যে ৪৭টি ইতোমধ্যে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি স্থাপনাগুলোর কাজও এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, ইউনিট-১-এর অস্থায়ী হস্তান্তর ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পিওআরভি সমস্যার পাশাপাশি অসম্পন্ন কাজগুলোও দ্রুত শেষ করতে হবে।
রুশ পক্ষ এ জন্য একটি বাস্তবসম্মত সময়সূচি তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজনে আরও একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর কথা জানিয়েছে।
ইউনিট-২ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ
ইউনিট-১-এর সমস্যার প্রভাব পড়তে পারে দ্বিতীয় ইউনিটের কাজেও। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের এপ্রিলে ইউনিট-২-এ পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরুর কথা। এর আগে কমিশনিংয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা ও পরিদর্শন শেষ করার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এসব কার্যক্রমও নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক জানান, ইউনিট-১-এর জন্য বরাদ্দ কিছু সরঞ্জাম ও স্পেয়ার যন্ত্রাংশ ইউনিট-২-এর কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব সরঞ্জাম এখনো পুনরায় সরবরাহ করা হয়নি। ফলে নতুন করে সরঞ্জাম সরবরাহ, স্থাপন এবং কমিশনিংয়ের প্রয়োজন হবে।
চুক্তি অনুযায়ী, ইউনিট-২ ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের কাছে অস্থায়ীভাবে হস্তান্তরের কথা রয়েছে। রুশ পক্ষ সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন, অসম্পন্ন কাজ শেষ করা এবং হস্তান্তরের বিষয়গুলো নিয়ে একটি সমন্বিত সময়সূচি তৈরিতে সম্মত হয়েছে।
এদিকে বিলম্বের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং হারানো সময় পুষিয়ে নেয়ার উপায় বের করতে বাংলাদেশ অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞ নিয়োগ ও স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছে।
রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে প্রকল্প এলাকায় কাজ করছেন। প্রয়োজনে আরও বিশেষজ্ঞকে চার্টার ফ্লাইটে বাংলাদেশে আনার ব্যবস্থাও করা হতে পারে। বিশেষ করে ইউনিট-১-এর ভেন্টিলেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং এবং ইউনিট-২-এর প্রস্তুতিমূলক কাজ দ্রুত এগিয়ে নেয়াকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
দুই পক্ষ জ্যেষ্ঠ কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে সমন্বয় অব্যাহত রাখার পাশাপাশি রুশ পক্ষের কারিগরি মূল্যায়ন শেষে ফের ভার্চুয়াল বৈঠক করার বিষয়েও একমত হয়েছে।
ব্যয়ও বেড়েছে
এসব কারণে ব্যয়ের কারণ হিসেবে জানা গেছে, সরকার-টু-সরকার ব্যবস্থায় রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রাক্কলনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ এবং কম-কার্বন বিদ্যুতের বড় উৎস হিসেবে রূপপুর প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সরঞ্জামের ত্রুটি এবং প্রকল্পের বিভিন্ন কাজের বিলম্বে এখন প্রশ্ন উঠেছে—কবে নাগাদ বাস্তবে জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুক্ত হবে?
দেশি-বিদেশী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেফটি ভালভের ত্রুটি দ্রুত সমাধান করা না গেলে সেই অপেক্ষার সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে।



