চিলমারী-রৌমারী নৌপথে ফেরি বন্ধ ১ মাস, বাড়ছে জনদুর্ভোগ

রৌমারী ঘাট ও দুইশ বিঘা এলাকায় ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন রয়েছে। অতিরিক্ত ড্রেজিং মেশিন পাঠানোর কথা থাকলেও সেগুলো এখনো পৌঁছায়নি। রৌমারী ঘাট এলাকায় ড্রেজিং কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

মোস্তাফিজুর রহমান তারা, রৌমারী (কুড়িগ্রাম)

Location :

Kurigram
ফেরিতে যাত্রীর পাশাপাশি পারাপার হচ্ছে ভারী যানবাহন
ফেরিতে যাত্রীর পাশাপাশি পারাপার হচ্ছে ভারী যানবাহন |নয়া দিগন্ত

কুড়িগ্রামের চিলমারী-রৌমারী নৌপথে নাব্যতা সঙ্কটের কারণে টানা প্রায় এক মাস ধরে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌরুটে ফেরি বন্ধ থাকায় পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালক ও যাত্রীদের পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। দীর্ঘদিন ধরে নৌপথটির নাব্যতা সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রৌমারী ফলুয়ার চর ঘাট ও দুইশ বিঘা এলাকায় পানির গভীরতা কমে যাওয়ায় ১২ আগস্ট থেকে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। নৌপথ সচল রাখতে কয়েকটি এলাকায় ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেয়া হলেও কাজের অগ্রগতি নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) উদ্যোগে ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চিলমারী-রৌমারী নৌপথে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়। শুরুতে তিনটি ফেরি থাকলেও বর্তমানে একটি ফেরি দিয়ে খুরিয়ে খুরিয়ে ফেরিসার্ভিস পরিচালিত হচ্ছিল। এরই মধ্যে নাব্যতা সঙ্কটসহ নানা কারণে বারবার ফেরি চলাচল বন্ধ হয়েছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চিলমারী কার্যালয়ের সহকারী ব্যবস্থাপক আকিব সোহেল আকাশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত মোট এক হাজার ৬৫ দিনের মধ্যে নাব্যতা সঙ্কটের কারণে ৫৪২ দিন ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। অর্থাৎ নৌপথটি চালুর পর সময়ের প্রায় অর্ধেকই ফেরি সার্ভিস বন্ধ থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এদিকে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় চিলমারী ও রৌমারী নৌবন্দর এলাকায় পণ্যবাহী ট্রাকের দীর্ঘ অপেক্ষা তৈরি হয়েছে। অনেক চালককে বাধ্য হয়ে বিকল্প ও দীর্ঘ সড়কপথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সময় বাড়ছে, অন্যদিকে পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।

কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী ও লালমনিরহাট থেকে পণ্য নিয়ে আসা কয়েকজন ট্রাকচালক জানান, ঘাটে এসে ফেরি বন্ধ থাকার খবর পেয়ে কয়েকটি ট্রাক ফিরে গেছে। একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন রংপুর থেকে আসা চালকরাও।

অপরদিকে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা থেকে আসা বেশ কয়েকজন ট্রাকচালক জানান, ফেরি চালু না থাকায় তাদের রুট পরিবর্তন করে অন্য রুটে যেতে হচ্ছে। এতে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছাতে অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হবে।

স্থানীয়দের দাবি, নৌপথের সঙ্কট নিরসনে নিয়মিত ও কার্যকর ড্রেজিং প্রয়োজন। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় জায়গায় শক্তিশালী ড্রেজার দিয়ে খনন করা হলে নাব্যতা ফিরিয়ে এনে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক করা সম্ভব।

তবে ড্রেজিং কার্যক্রম নিয়েও দেখা দিয়েছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। বিআইডব্লিউটিসি-এর কর্মকর্তা আকিব সোহেল আকাশ জানান, রৌমারী ঘাট ও দুইশ বিঘা এলাকায় ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন রয়েছে। অতিরিক্ত ড্রেজিং মেশিন পাঠানোর কথা থাকলেও সেগুলো এখনো পৌঁছায়নি। তিনি রৌমারী ঘাট এলাকায় ড্রেজিং কার্যক্রম বন্ধ থাকার কথাও জানান।

অন্যদিকে ড্রেজিংয়ের দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএ-এর নির্বাহী প্রকৌশলী (চিলমারী) সমীর চন্দ্র পাল বলেন, রৌমারী ঘাট এলাকায় স্থানীয়দের বাধার কারণে খননকাজ বন্ধ রয়েছে। তবে দুইশ বিঘা এলাকায় ড্রেজিং চলছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আসাদুল ইসলাম, আনিছুর রহমান ও জাহিদসহ স্থানীয়দের দাবি, ড্রেজিং কাজে তারা কোনো বাধা দেননি।

তাদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই রৌমারী ঘাট এলাকায় নিয়মিত খননকাজ হচ্ছে না। দ্রুত নৌপথের নাব্যতা ফিরিয়ে এনে ফেরি সার্ভিস সচল করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয়দের মতে, চিলমারী-রৌমারী নৌপথ শুধু যাত্রী পারাপারের মাধ্যম নয়; এই রুটটি কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের যোগাযোগ এবং পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বারবার ফেরি বন্ধ হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান জানান, নৌপথে ফেরি সার্ভিস ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা এবং মানুষের দুর্ভোগ কমানোর জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কাছে আবেদন করা হয়েছে। দ্রুত বিষয়টির সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

স্থানীয়দের দাবি, সাময়িকভাবে ড্রেজিং করে ফেরি চালু করার পাশাপাশি নৌপথটির নাব্যতা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় গুরুত্বপূর্ণ এই রুটে বারবার ফেরি বন্ধের ঘটনা অব্যাহত থাকবে এবং জনদুর্ভোগও কমবে না।