ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার খেরুয়াজানী ইউনিয়নের হরিপুর দেউলী গ্রামে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক ভূঁইয়া বাড়ি জামে মসজিদ। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এটি ‘ভূঁইয়া বাড়ি জামে মসজিদ’ নামে পরিচিত।
১৮টি স্তম্ভঘেরা দুই গম্বুজবিশিষ্ট প্রাচীন এই মসজিদ সর্বশেষ সংস্কার হয়েছিল ২৯৭ বছর আগে। শুধু একটি মসজিদ নয়, এটি ধর্মীয় ঐতিহ্য, ইসলামী সংস্কৃতি, লোককথা এবং বাংলার ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষ্য। প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো বলে পরিচিত এই দুই গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ আজ দীর্ঘদিনের অবহেলা, অযত্ন ও সংস্কারের অভাবে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ইট-সুড়কির গাঁথুনিতে নির্মিত এই প্রাচীন মসজিদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, দেয়ালে দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল। দ্রুত সংরক্ষণ না হলে যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে ইতিহাসের এই অমূল্য নিদর্শন।
ঐতিহাসিকদের মতে, আঠারো শতকের শেষ দিকে ব্রিটিশবিরোধী ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনের সময় আত্মগোপনে থাকা ফকিররা গহীন অরণ্যের মধ্যে ইবাদতের উদ্দেশ্যে এই মসজিদ ব্যবহার করতেন। পরে ১১৩৫ বঙ্গাব্দে এর সর্বশেষ সংস্কার করা হয়। এরপর প্রায় তিন শতক পেরিয়ে গেলেও আর কোনো বড় ধরনের সংস্কার হয়নি।
মসজিদটিকে ঘিরে রয়েছে নানা জনশ্রুতি। স্থানীয়দের দাবি, মাঝেমধ্যে মসজিদের দেয়াল থেকে ঘামের মতো পানি ঝরে পড়ে, এমনকি জায়নামাজও ভিজে যায়। কিছু সময় পর আবার দেয়াল স্বাভাবিকভাবে শুকিয়ে যায়। যদিও এ ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি, তবু বহু বছর ধরে এটি এলাকাবাসীর বিস্ময় ও বিশ্বাসের অংশ হয়ে আছে।
মসজিদের খতিব মো: বাদী বিল্লাহ বলেন, ‘বাইরে প্রচণ্ড গরম থাকলেও মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলে এক ধরনের শীতলতা ও মানসিক প্রশান্তি অনুভূত হয়। অনেক মানুষ শুধু কিছুক্ষণ বসে আত্মিক প্রশান্তি লাভের জন্য এখানে আসেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘এখানে নামাজ আদায় করলে হৃদয়ে এক ভিন্ন প্রশান্তি অনুভব হয়।’
বাদী বিল্লাহ জানান, অতীতে অনেক আলেম-ওলামা ও প্রবীণরা এই মসজিদে রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করতেন। তাদের কাছ থেকেই বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনার কথা শোনা যায়। তবে প্রকৃত নির্মাতাদের পরিচয় ইতিহাসের অতলে হারিয়ে গেছে।
প্রবীণ মুসল্লিরাও জানান, তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকেও তারা শুনে এসেছেন- এটি অত্যন্ত প্রাচীন একটি মসজিদ।
স্থানীয় মুসল্লি আবুল হোসেন বলেন, ‘এই মসজিদে নামাজ আদায় করলে অন্যরকম প্রশান্তি পাওয়া যায়।’
অপর মুসল্লি কাদির মিয়ার মতে, মসজিদের নির্মাণশৈলী, ব্যবহৃত ইট ও গাঁথুনির ধরন দেখে এটি মুঘল যুগ কিংবা মধ্যযুগীয় স্থাপত্যধারার নিদর্শন বলেই মনে হয়। এ বিষয়ে গবেষণা হলে প্রকৃত ইতিহাস আরো স্পষ্ট হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ফরহাদ আলী জানান, মসজিদের পাশে থাকা দু‘টি পুরোনো কবরের একটি ইতোমধ্যে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। পুরো স্থাপনাটিই ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এখনই সংরক্ষণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো এই ঐতিহাসিক নিদর্শন আর দেখতে পাবে না।
২০১৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর মসজিদটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত করলেও বাস্তবে এখনো দৃশ্যমান কোনো সংস্কারকাজ শুরু হয়নি। এমনকি সংরক্ষিত পুরাকীর্তির পরিচয় বহনকারী একটি সাইনবোর্ডও নেই।
প্রত্নতত্ত্ব গবেষক স্বপন ধর বলেন, ‘এটি প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বছরের পুরোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মসজিদ। বারো ভূঁইয়ার ইতিহাস, বিশেষ করে ইশা খাঁর শাসনামলের সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। মধ্যযুগীয় ছোট আকারের এক বা দুই গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদগুলোর স্থাপত্যের সাথে এটির সুস্পষ্ট মিল রয়েছে। ’
তিনি আরো বলেন, ‘বহু প্রচেষ্টার মাধ্যমে মসজিদটি গেজেটভুক্ত করা হলেও এখনো সংস্কারকাজ শুরু না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।’
ইসলামের ইতিহাসে মসজিদ কেবল নামাজ আদায়ের স্থান নয়; এটি ঈমান, শিক্ষা, সমাজগঠন ও সভ্যতার কেন্দ্র। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ভূঁইয়া বাড়ি জামে মসজিদ শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, বরং আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও জাতীয় ইতিহাসের অমূল্য আমানত।
অবহেলা আর সময়ের নির্মম আঘাতে এই ঐতিহাসিক ইবাদতখানা হারিয়ে যাওয়ার আগেই প্রয়োজন জরুরি সংরক্ষণ ও সংস্কার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগই পারে প্রাচীন শতাব্দীর এই ইসলামী ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অক্ষুণ্ণ রাখতে।



