বগুড়ায় ডাক্তার ও নার্সের দায়িত্বে অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার কারণে পৃথক ঘটনায় এক প্রসূতি ও আড়াই মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এর মধ্যে ঈদের দিন বৃহস্পতিবার (২৮ মে) রাতে বাচ্চা প্রসবের পর অন্য গ্রুপের রক্ত শরীরে প্রবেশ করানোর কারণে আফরিন জামান অহনা (১৮) নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। নগরীর খান্দার বাজার এলাকার ‘সুস্বাস্থ্য ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে’ এ ঘটনা ঘটে।
নিহত আফরিন জামান অহনা সদর উপজেলার পালশা এলাকার আব্দুর রশিদ বাবুর মেয়ে। সে বগুড়া সরকারি কলেজের আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল।
জানা যায়, বাচ্চা প্রসবের জন্য বৃহস্পতিবার অহনাকে ‘সুস্বাস্থ্য ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে’ ভর্তি করা হয়। এরপর তার বাচ্চা প্রসব হয়। তখন পর্যন্ত অহনা সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল। ডাক্তারের পরামর্শে তার শরীরে রক্ত দেয়া হয়।
পরিবারের দাবি ডাক্তারকে অহনা জানায়, তার রক্তের গ্রুপ ‘ও পজেটিভ’। কিন্তু সেখানে রক্ত পরীক্ষা শেষে ডা: জাানয়, তার রক্তের গ্রুপ ‘বি পজেটিভ’। এরপর শরীরে ‘বি পজেটিভ’ রক্ত প্রবেশ করানো হয়। পরে শরীরের বিভিন্ন স্থান দিয়ে রক্ত বের হলে নার্স ও ডাক্তারকে জানানো হয়। পরে ডাক্তার অহনাকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন।
এরপর অহনাকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার (৩০ মে) রাত পৌনে ৪টার দিকে অহনার মৃত্যু হয়। এরপর থেকে অভিযুক্ত ক্লিনিক বন্ধ করে কর্তৃপক্ষ উধাও হয়েছে।
এ ব্যাপারে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে মোবাইলফোনে যোগাযোগ করলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর ফোন কেটে দেয়।
এ ব্যাপারে জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা: এস এম নূর ই শাদীদ বলেন, ‘আমরা ঘটনাটি জেনেছি। এখনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে সোমবার (১ জুন) অফিস খুললে পদক্ষেপ নেয়া হবে।’
অপরদিকে নগরীর কানছগাড়ী এলাকায় অবস্থিত ‘সৃষ্টি জেনারেল হাসপাতালে’ কর্তব্যরত নার্সের অবহেলার কারণে আয়ান নামে আড়াই বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। রোববার (৩১ মে) সকালে সাড়ে ৮টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
নিহত শিশু আয়ান সোনাতলা উপজেলার পূর্ব ভেলুরপাড়া এলাকার সিঙ্গাপুরপ্রবাসী আব্দুল আহাদের ছেলে।
স্বজনদের অভিযোগ, সময়মতো চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ না দেয়ার কারণেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ঈদের পরদিন শুক্রবার (২৯ মে) ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে শিশুটিকে ‘সৃষ্টি জেনারেল হাসপাতালে’ ভর্তি করা হয়। চিকিৎসায় তার অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল। শনিবার রাত পর্যন্ত আয়ান অনেকটাই সুস্থ ছিল।
আয়ানের খালা পুতুল বলেন, ‘রাতে ডাক্তার স্যালাইন আর ইনজেকশন লিখে দেন। আমরা নার্সদের বারবার বলেছি, কিন্তু তারা বলে সকালে দেয়া হবে। পরে আর সেগুলো দেয়া হয়নি। সকালে দেখি আমার ভাগ্নে আর নেই।’
এদিকে হাসপাতালের করিডোরে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েন শিশুটির মা নিশাত। সন্তানের নিথর দেহ বুকে জড়িয়ে তিনি বারবার বলতে থাকেন, ‘আমার বাচ্চারে মেরে ফেলে দিছে। আমার বাচ্চা তো ভালো হয়ে গেছিল।’ সন্তান হারানোর সেই আর্তনাদ উপস্থিত সবার হৃদয় ভারী করে তোলে।
পরিবারের সদস্যরা আরো অভিযোগ করেন, শিশুটির মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে। এমনকি সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য সাংবাদিকদের প্রভাবিত করারও চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সৃষ্টি জেনারেল হাসপাতালের সহকারী ম্যানেজার আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শিশুটি ভর্তি ছিল। পরে শুনি মারা গেছে।’
তবে ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। ঘটনার পর পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে সুরতহাল সম্পন্ন করে।
বগুড়া সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইব্রাহীম আলী বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে জানা গেছে নার্সের অবহেলার কারণেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
বগুড়ার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা: এস এম নূর ই শাদীদ বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’



