কাজে আসছে না ১৬ কোটি টাকায় নির্মিত মাছের পোনা বিক্রয় কেন্দ্র

পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য চাঁচড়ার মাগুরপট্টিতে বাংলাদেশ মৎস্য অধিদফতর আট কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮০ শতক জমি অধিগ্রহণ করে। এরপর আট কোটি চার লাখ টাকা ব্যয়ে পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। ৫১টি হাউস এবং দুইতলায় হাড়ি বসিয়ে পোনা বিক্রয়ের জায়গা রেখে ২০১৯ সালে নির্মাণ করা হয় কেন্দ্রটি।

এম আইউব, যশোর অফিস

Location :

Jashore
মাছের পোনা বিক্রয় কেন্দ্র
মাছের পোনা বিক্রয় কেন্দ্র |নয়া দিগন্ত

যশোরের চাঁচড়া মাগুরপট্টিতে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মাছের পোনা বিক্রয় কেন্দ্র বিক্রেতাদের তেমন কোনো কাজে আসছে না। এ কারণে সরকার প্রতি বছর রাজস্ব হারাচ্ছে। ভুল পরিকল্পনা ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা বলছেন। যদিও ব্যবসায়ী, বাবলাতলা রাস্তার পাশের বিক্রেতা, হ্যাচারি মালিক সমিতি, উপজেলা ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন ভিন্ন ভিন্ন কথা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটিতে নির্মিত ৫১টি হাউসের মধ্যে মাত্র সাতটি হাউস ব্যবহার হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ পোনা সরবরাহ হয় যশোরের চাঁচড়া মৎস্যপল্লী থেকে। ৪০০-৫০০ মৎস্যজীবী সরাসরি এই ব্যবসার সাথে জড়িত। পরোক্ষভাবে প্রায় দুই হাজার মানুষ এই এলাকায় পোনা বেচাকেনা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বর্তমানে বর্ষা মৌসুমে পোনা ব্যবসার বাজার রমরমা। দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ এখানে আসছেন পোনা কিনতে।

ভরা মৌসুমে বাবলাতলা হাটে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ মণ মাছের পোনা কেনাবেচা হয়, যার দৈনিক বাজারমূল্য দেড় থেকে দুই কোটি টাকা। প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত চলা এই বাজার থেকে ৫০-৬০টি ট্রাকে করে রুই, কাতলা, শিং, পাবদাসহ নানা জাতের পোনা ঢাকা, সিলেট, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। অথচ সরকারি অর্থায়নে তৈরি বিশেষায়িত ডিজিটাল বা আধুনিক বিপণন ভবনটি মৎস্য বিভাগের অব্যবস্থাপনা ও ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার কারণে একদমই কাজে লাগছে না। তবে, চাঁচড়ার উন্মুক্ত মাছের পোনা বিক্রির ঐতিহ্যবাহী বাজারটি দেশের মৎস্য চাষের বিপ্লবে এখনো প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।

ফাল্গুন মাস থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত মাছ চাষের মৌসুম। এই সময় বৃষ্টি বেশি হওয়ায় ক্রেতা-বিক্রেতায় মুখর থাকে যশোরের চাঁচড়া বাবলাতলা বাজার।

পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য চাঁচড়ার মাগুরপট্টিতে বাংলাদেশ মৎস্য অধিদফতর আট কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮০ শতক জমি অধিগ্রহণ করে। এরপর আট কোটি চার লাখ টাকা ব্যয়ে পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। ৫১টি হাউস এবং দুইতলায় হাড়ি বসিয়ে পোনা বিক্রয়ের জায়গা রেখে ২০১৯ সালে নির্মাণ করা হয় কেন্দ্রটি।

বর্তমানে সাতজন ব্যবসায়ী হাউস বরাদ্দ নিয়ে পোনা বিক্রি করছেন বলে জানান কেন্দ্রে ব্যবসারত সামিউল্লাহ হোসেন। পানির লাইন সংকুচিত এবং আয়রণযুক্ত হওয়ায় তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এই সমস্যা সমাধানের দাবি তার। একটি হাউস একজন ব্যবসায়ী নীতিতে এই বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে, এই সংখ্যা আরো কম বলে দাবী স্থানীয়দের।

যদিও সদর উপজেলা মৎস্য অধিদফতরের সিনিয়র কর্মকর্তা রিপন কুমার ঘোষ দাবি করেন আট-১০ জন মৎস্য ব্যবসায়ীকে বরাদ্দ দেয়া আছে। এখনো পর্যন্ত ৪০টি হাউস খালি রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সরকার পোনা বিক্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। কিন্তু এটা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ব্যবসায়ীরা। সভাপতি হিসেবে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এবং উপজেলা সমবায় অফিসার ও বরাদ্দ পাওয়া তিনজন মৎস্য ব্যবসায়ীর সমন্বয়ে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট ব্যবস্থাপনা কমিটি রয়েছে। কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ লিপন। বছরে ছয় হাজার টাকায় ব্যবসায়ীরা একটি হাউস বরাদ্দ পেয়ে থাকেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে এখানে অনেক অমৎস্যজীবী বরাদ্দ হাতিয়ে নেন। এরকম ৩০টি বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বরাদ্দ দিতে কয়েকবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু নতুন করে কেউ আবেদন করেননি। বর্তমান সরকারের আমলে বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি এখনো প্রকাশ করা হয়নি, প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এক মাসের মধ্যে নতুন করে বরাদ্দ দেয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘এখানে বেশ কিছুদিন বিদ্যুতের সার্ভিস তার ও মিটার চুরি হয়েছিল। ব্যবসায়ীদের মাছের নিরাপত্তায় কোনো প্রহরী ছিল না। বর্তমানে এই সমস্যা নেই। ব্যবসায়ীরা নিজেরাই তাদের অর্থায়নে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দিয়েছেন এবং বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করেছেন। বিদ্যুৎ বিলও ব্যবসায়ীরাই প্রদান করেন। মাঝে মাঝে আমরা পরিদর্শনে যাই।’

তিনি বলেন, ‘বাইরে প্রতিদিন ২০০ টাকা করে পুকুর লিজ নিয়ে ১০-১২ গুণ বেশি অর্থ খরচ করে রাস্তার পাশে পোনা বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। সরকার নির্মিত পোনা বিক্রয় কেন্দ্র থেকে ক্রেতারা পোনা কিনলে সেই পোনা পথিমধ্যে মারা গেলে আমরা মধ্যস্থতা করে আবার পোনা দেয়ার ব্যবস্থা করে থাকি। কিন্তু বাইরে থেকে পোনা কিনে ওজনে ঠকলে আমাদের কিছু করার থাকে না। আমাদের কাছে অসংখ্য অভিযোগ আসে পোনা কিনতে বিকাশে টাকা পাঠালে বিক্রেতারা পোনা সরবরাহ করে না। ১০ কেজি পোনা কিনলে বাড়িতে গিয়ে পান ছয় কেজি মাছ। পোনার জন্য চাঁচড়া বিখ্যাত। অনেক মানুষ এখানে পোনা কিনতে আসেন। এই সুযোগে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী ক্রেতা ঠকাচ্ছেন। এতে চাঁচড়ার প্রকৃত মৎস্য ব্যবসায়ীদের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। পোনা বিক্রয় কেন্দ্রে গেলে ক্রেতা ফাঁকি দিতে পারবে না তারা।’

কেন্দ্রটি পুরোপুরি ব্যবহৃত না হওয়ায় সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

রিপন কুমার জানান, কেন্দ্রের নিচতলায় ৫১টি সিস্টার্ন আছে। এগুলো হ্যাচারির চারকোণা হাউসগুলোর মতো। একেকটি সিস্টার্ন লম্বায় আট ফুট ও চওড়ায় তিন ফুট। উচ্চতা চার ফুট। আর ওপর তলায় হাড়ি পেতে ৬০ জনের মাছ বিক্রির জায়গা রয়েছে। প্রতি তলায় একটি করে পানির ট্যাংকি আছে। এখানে পানির রিসাইক্লিং সুবিধাও রয়েছে। আছে রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহৃত পানি রিফাইন (পরিশোধন) করে পুনরায় ব্যবহারের বন্দোবস্তও।

তিনি জানান, হাউস ভাড়ার ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের একটি নীতিমালা আছে। সেই মোতাবেক বরাদ্দপ্রাপ্তদের বার্ষিক ভাড়া দিতে হবে। একেকটি সিস্টার্নের (হাউস) ভাড়া বছরে ছয় হাজার টাকা। হাড়ি পেতে মাছ বিক্রির জন্য যারা বরাদ্দ পেয়েছেন তাদের বার্ষিক ভাড়া ২৪০০ টাকা ধার্য রয়েছে।

বেনাপোল-খুলনা মহাসড়কের পাশে চাঁচড়া বাবলাতলার ব্যবসায়ী ফুরকান হোসেন ও মুরাদ হোসেন জানান, ইলিশ মাছ বাদে সব রকম মাছের পোনা বিক্রি হচ্ছে বাবলাতলায়। বর্তমানে মাছের দাম বেশি। চাহিদাও বেশি। মাগুর মাছ হাউসে রেখে বিক্রি করা যায়। কিন্তু ওই হাউসে আর কোনো মাছ রাখা যায় না। আর পোনা বিক্রয় কেন্দ্রের হাউসগুলোর ধারণ ক্ষমতা কম। পাঁচ-১০ হাজার মাছের পোনা ধরে একেকটি হাউসে। পাঙ্গাস মাছ হাউসে রাখা যায় না। কাতল, রুই, মৃগেল মাছ এগুলো হাউসে রেখে বিক্রি করা যায় না। এই মাছের জায়গা লাগে বেশি। পুকুরে রেখে বিক্রি করা সুবিধা। মাগুরপট্টিতে এক সময় মাগুর মাছের রমরমা ব্যবসা ছিল। ওই সময় প্রভাবশালী মাগুর মাছ ব্যবসায়ীরা তাদের সুবিধা চিন্তা করে ওই স্থানে বিক্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করিয়েছেন। হাউস ভাড়া প্রতিদিন ২০০ টাকা করে নেয়া হয়, যা স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করেন। সরকার নিয়ন্ত্রণ করে না। তারা ইচ্ছামতো ভাড়া দেয়। বিক্রয় কেন্দ্রে নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। বাজারটা নষ্ট হয়ে গেছে দালালচক্রের কারণে। ১০ কেজি পোনা বিক্রি করার কথা বলে দেয়া হয় পাঁচ কেজি। বাটখারায় হেরফের রেখে মাপে কম দেয়। যা ক্রেতাদের ধরার উপায় নেই। এই বাজারে যে পরিমাণ মানুষকে ফাঁকি দেয়া হচ্ছে, তাতে এখানে ব্যবসা টিকবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।

যশোর জেলা মৎস্য হ্যাচারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক চাঁচড়া ডালমিল এলাকার চৌধুরী মৎস্য হ্যাচারির স্বত্বাধিকারী শামসুদ্দিন চৌধুরী সুমন দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ত্রুটিপূর্ণ স্থাপত্যশৈলীতে পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে ওভার ট্যাংকির ধারণ ক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়। হাউসের ক্যাপাসিটির সাথে পানির ট্যাংকি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ৫১ টি হাউস সবগুলো একসাথে ব্যবহার শুরু হলে পানি সরবরাহ করতে পারবে না। পানি ইন-আউটে সমস্যা রয়েছে। যে পাইপগুলো দেয়া হয়েছে সেগুলো খুবই ন্যারো এবং ত্রুটিপূর্ণ। সাবমারসেবল পাম্পের পানিতে আয়রণ আছে। এখন ওখানে যারা আছে তারা পুকুরের পানি ব্যবহার করে কাজ করছেন। ট্যাংকির পানি পুকুরে দিচ্ছে, পুকুর থেকে তুলে নিয়ে হাউসে দিচ্ছে। এখন জরুরি পানি পাসিং ও ফিল্টারিং ব্যবস্থা চালু করা দরকার। এই দুইটা সমস্যা সমাধান করতে পারলে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবে। এই বিষয়ে মৎস্য কর্মকর্তারা আন্তরিক। কিন্তু ফান্ডের অভাবে এই সমস্যা সহজে সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না।’

জেলা মৎস্য অফিসার মনিরুল মামুন বলেন, ‘যে উদ্দেশ্য নিয়ে বিক্রয় কেন্দ্রটি করা হয়েছিল তা আসলে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ২০২৪ এর ৫ আগস্টের আগে পোনা বিক্রয় কেন্দ্র প্রকৃত মৎস্য ব্যবসায়ী না এমন লোকদের নামে বরাদ্দ চলে গিয়েছিল। এমন ৩০টি বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। তারা বছরের ইজারা নবায়ন না করে অসাধু উপায়ে দখলে রেখে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন। তাদের জামানতের অর্থ থেকে বকেয়া ইজারার পাওনা সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন করে প্রকৃত মৎস্য ব্যবসায়ীদের হাতে বরাদ্দ দেয়ার জন্য এক মাসের মধ্যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। যা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’