উন্নয়নের নামে শত শত কোটি টাকা ব্যয়, কিন্তু নাগরিক সেবায় দৃশ্যমান সুফল নেই। প্রায় ৫ কোটি টাকার দুই দফা পানি সরবরাহ প্রকল্পেও এক ফোঁটা পানি পায়নি পৌরবাসী। প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বক্সকালভার্ট নির্মাণ করে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
এদিকে বাজার উন্নয়নের নামে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শেড ভেঙে একই স্থানে আবার প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন স্থাপনা নির্মাণ হলেও সেটিও অচল। এমন প্রশ্নবিদ্ধ উন্নয়নের ভার নিয়েই শতবর্ষে পদার্পণ করেছে ময়মনসিংহের ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত ঐতিহ্যবাহী গৌরীপুর পৌরসভা।
পৌরসভার বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত এক যুগে প্রস্তাবিত উন্নয়ন বাজেটের পরিমাণ প্রায় ৬০৩ কোটি টাকা। অথচ বাস্তব চিত্রে নাগরিকরা এখনো জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা সড়ক, অকার্যকর ড্রেনেজ, অপরিকল্পিত বাজার ও মৌলিক সেবার সংকটে জর্জরিত। বিপুল অঙ্কের বাজেটের সাথে দৃশ্যমান উন্নয়নের মিল খুঁজে পাচ্ছেন না পৌরবাসী।
১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রথম শ্রেণির এ পৌরসভায় দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত নগরায়ন, উন্নয়নের নামে অনিয়ম, ড্রেনেজ সংকট, খালের নকশা পরিবর্তন, জলাবদ্ধতা, শিশুপার্ক ও বয়স্কদের হাঁটার স্থান না থাকা, কমিউনিটি সেন্টারের অভাবসহ নানা সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর করের বোঝা বাড়লেও নাগরিক সেবার মান বাড়েনি। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশিত হলেও কার্যকর তদন্তের পরিবর্তে ‘আইওয়াশ’ হয়েছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রথম ধাপে ব্যয় করা হয় ২ কোটি ৭ লাখ ১৩ হাজার ৫৯০ টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে ২ কোটি ৮৬ লাখ ৭ হাজার ৯২০ টাকা। দুই প্রকল্পে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ের পাশাপাশি পাম্পচালকের বেতন বাবদ প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় হলেও আজ পর্যন্ত পৌরবাসী পানি সরবরাহের সুবিধা পাননি। ফলে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প কার্যত কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
এদিকে নতুনবাজার সিনেমা হল সড়ক, স্টেশন রোড ও বালুয়াপাড়া এলাকায় খালের নকশা পরিবর্তন করে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বক্সকালভার্ট নির্মাণ করেছে পৌরসভা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এতে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। সতিষা, নওয়াগাঁও, গুজিখাঁ, নয়াপাড়া, পূর্ব দাপুনিয়া ও সাতুতীসহ অন্তত ১৫-১৬টি গ্রামের পানি নিষ্কাশন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
বাজার উন্নয়নের নামে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শেডও টেকেনি। অল্প সময়ের মধ্যেই তা ভেঙে একই স্থানে প্রাণিসম্পদ বিভাগের উদ্যোগে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন মার্কেট নির্মাণ করা হয়। কিন্তু সেটিও এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল।
২০১৩ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগের সহায়তায় গৌরীপুর পৌরসভার জন্য ৩০ বছরের একটি মাস্টারপ্ল্যান অনুমোদন করা হয়। কিন্তু সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সম্পর্কে কিছুই জানেন না অধিকাংশ নাগরিক। বরং সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। নতুন সড়ক নির্মাণের কিছুদিনের মধ্যেই তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
পৌর শহরের ধানমহাল-পাছেরকান্দা সড়ক, মধ্যবাজার-কোনাপাড়া সড়কের রাইসমিল এলাকা, কালিপুর মধ্যম তরফ-কলাবাগান সড়কসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বড় বড় গর্তে ভরে গেছে। বালুয়া নদীর ওপর নির্মিত বেইলি ব্রিজসহ বেশ কয়েকটি সেতু ও সড়ক দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অথচ অধিকাংশ প্রকল্প এলাকায় প্রকল্পের তথ্যফলকও নেই। ফলে ব্যয়, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নকারী সংস্থা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ অন্ধকারে রয়েছেন।
এ বিষয়ে গৌরীপুর পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুনন্দা সরকার প্রমা বলেন, ‘গত বছরের বাজেটে প্রস্তাবিত ও প্রকৃত বাজেটের মধ্যে ব্যাপক অসামঞ্জস্য ছিল। তাই চলতি অর্থবছরের বাজেট বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রস্তুত করা হয়েছে।’
গত ২৫ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১৭ কোটি ৮৬ লাখ ৯ হাজার ৩৬৫ টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ কোটি ৭২ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং উদ্বৃত্ত ৩ কোটি ১৩ লাখ ৬৯ হাজার ৩৬৫ টাকা।
অন্যদিকে বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় প্রতি অর্থবছরেই প্রস্তাবিত বাজেট ও প্রকৃত বাজেটের মধ্যে বিস্ময়কর ব্যবধান রয়েছে। কোথাও ৫০-৫৬ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট শেষ পর্যন্ত নেমে এসেছে মাত্র ৩ থেকে ১১ কোটিতে। এই অস্বাভাবিক ব্যবধানের কারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে।
পৌরবাসীর দাবি, শতবর্ষের গৌরীপুর পৌরসভায় উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকৃত হিসাব প্রকাশ, বিতর্কিত প্রকল্পগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।



