দুই বছর বন্ধ থাকার পর আবারো খুলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত হাট। গত ২৪ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সাথে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর মধ্যে বৈঠকে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারে স্থলবন্দর ও সীমান্ত হাট চালু, স্থলবন্দর সচল ও স্থলপথে সুতা আমদানির বাধা দূরীকরণে আলোচনা করা হয়। এই বৈঠকের পর ফের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের সীমান্ত হাট চালু নিয়ে আশার আলো দেখছেন হাট সংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা। সপ্তাহে একদিন শূন্য রেখায় দুই দেশের ব্যবসায়ীরা পণ্য বেচাকেনা করে থাকেন।
ভারতের গুয়াহাটিতে বাংলাদেশের সহকারী হাই কমিশন ও সিলেটে ভারতের সহকারী হাই কমিশন এ লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
এই সূত্র জানিয়েছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া ১৪টি সীমান্ত হাট শিগগিরই চালু করতে দুদেশের তৎপরতা চলছে। প্রস্তাবিত আরো ৬টি সীমান্ত হাট অদূর ভবিষ্যতে চালু করতেও কাজ শুরু হয়েছে।
তথ্য মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে ভারত-বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্তসহ নানা বিষয়ে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে ব্যাপক ভাটা পড়ে। এতে করে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত হাটের ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন ও সীমান্ত এলাকায় বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য নিশ্চিতে যাত্রা শুরু করেছিল সীমান্ত হাট কার্যক্রম। দুই দেশের মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে বর্ডার হাট স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। সীমান্তে চোরাচালান ব্যবসা রোধসহ দুই দেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখতে ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত হাট চালু করা হয়েছিল।
তথ্য বলছে, দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় ২২টি সীমান্ত হাট চালু করার কথা ছিল। ২০১১ সালের ২৩ জুলাই কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার বালিয়ামারি সীমান্ত এলাকায় কার্যক্রম শুরু করে প্রথম সীমান্ত হাট।
২০২৩ সালের ২৪ মে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার লাউড়ের গড় ও ভারতের পশ্চিম খাসি হিল সীমান্তে সায়দাবাদ বর্ডার হাট নামে চালু হয় দেশের ১৪তম সীমান্ত হাট।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদলের ফলে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক উন্নয়ন এগিয়ে নিতে উভয় দেশ আগ্রহী হয়ে উঠে। ২৪ আগস্ট সোমবার ঢাকায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সাথে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।
তথ্যানুযায়ী, ২০১০ সালের ১০-১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরকালে সীমান্ত হাট চালু করা নিয়ে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে আলোচনার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এতে দুই দেশই প্রথমে আগ্রহ প্রকাশ করে। সীমান্ত এলাকায় মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটাতে বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে ২০১০ সালের ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ এবং ভারত সরকার সীমান্ত বর্ডার হাট স্থাপন সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের ২৩ জুলাই কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার বালিয়ামারি সীমান্ত এলাকায় কার্যক্রম শুরু করে প্রথম সীমান্ত হাট।
২০১২ সালের ২৪ এপ্রিল সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী ডলুরায় চালু হয় দ্বিতীয় সীমান্ত হাট। ২০১৫ সালের ২০ জানুয়ারি ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার পূর্ব মধুগ্রাম ও ছয়ঘরিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে চালু হয় তৃতীয় সীমান্ত হাট এবং একই বছরের ৬ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার তারাপুর সীমান্তে স্থাপিত হয় চতুর্থ সীমান্ত হাট।
২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল সংশোধনীর মাধ্যমে পণ্যের তালিকা ও গ্রাহক খরচের মাত্রা বাড়ানোসহ নতুন করে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
এরপর ২০১৮ সালে শেরপুর জেলার নাকুগাঁও এবং ভারতের ডালু সীমান্তে আরো একটি সীমান্ত হাট চালু করা হয়। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কালীচরণ ও বালাটে দুটি হাট এবং ত্রিপুরা রাজ্যের শ্রীনগর ও কমলাসাগরে দুটি হাট রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে আরো ৬টি সীমান্ত হাট চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার কুরমাঘাট এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ধলাই জেলার কমলাপুর মোড়াছড়া সীমান্ত হাট, মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার পশ্চিম বাটুলি আর ভারতের উত্তর ত্রিপুরা জেলার পালবস্তি সীমান্ত হাট, সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ আর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ইস্ট খাসিয়া হিলসের ভোলাগঞ্জ সীমান্ত হাট, সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার সায়দাবাদ সীমান্ত হাট, ময়মনসিংহ জেলার ধোবাউড়া উপজেলার ভূঁইয়াপাড়া অপরদিকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের দক্ষিণ গারো হিলসের শিববাড়ি সীমান্ত হাট, সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের বাগানবাড়ি অপরদিকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ইস্ট খাসি হিলসের রিংকু সীমান্ত হাট চালু করা হয়।
তবে মৌলভীবাজারের দুটি সীমান্ত হাট নির্মাণে জমি জটিলতা থাকায় চালু করা সম্ভব হয়নি।
বাগানবাড়ি-রিংকু সীমান্ত হাট হচ্ছে পঞ্চম বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সীমান্ত হাট, যা ২০২২ সালের ১২ মে সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বোগলাবাজার ইউনিয়নের বাগানবাড়ি সীমান্তে এবং ভারতের মেঘালয়ের পূর্ব খাসি পাহাড় জেলার রিংকু সীমান্তে চালু করা হয়। ২০২৩ সালের ৬ মে সিলেট জেলার ভোলাগঞ্জ সীমান্ত হাট উদ্বোধন করা হয়।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সীমান্ত এলাকায় ৫টি প্রস্তাবিত সীমান্ত হাট চালু করার কথা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার মধ্যে জিরো পয়েন্টে প্রথম বর্ডার হাট স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। মালদা-রাজশাহী ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাটের সঙ্গে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, উত্তরবঙ্গের হিলি, বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তবর্তী এলাকা, নদীয়া জেলার গেদে-দর্শনা সীমান্তে হাটের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
হাটে সীমান্ত এলাকায় উৎপাদিত কৃষকের কাঁচা সবজি ছাড়াও খাদ্যশস্য, মিষ্টি, মাছ, মাংস, ডিম যেমন বিক্রি হবে, তেমনি প্লাস্টিকজাত সামগ্রী বিক্রি করা ছাড়াও জামা- কাপড়, শাড়িসহ একাধিক সামগ্রী বিক্রির সুপারিশ রয়েছে।
উভয় দেশের ৫০ জন বিক্রেতা এই হাটে ব্যবসা পরিচালনা করেন।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে হাট ব্যবস্থাপনা কমিটি অনুমোদিত বিক্রেতাদের তালিকা সংরক্ষণ করে।
হাটে উভয় দেশের দুপাশে দুটি প্রবেশ পথ থাকে। এছাড়া হাটের সীমানা কাঁটাতারের প্রাচীর দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়। হাটের ক্রেতা-বিক্রেতাদের ছবি সম্বলিত পরিচয়পত্র বহন করতে হয়। সীমান্ত হাটে স্থানীয় মুদ্রায় অথবা বার্টার (পণ্য বিনিময়) পদ্ধতিতে পণ্য বিনিময় করা হয়। সীমান্ত হাটে প্রত্যেক ক্রেতা প্রতি হাটে ২০০ ডলার সমমূল্যের পণ্য স্থানীয় মুদ্রায় ক্রয় করতে পারেন। সীমান্ত হাট পর্যায়ক্রমে ২২টিতে উন্নীত করা হবে বলে দুদেশের বর্ডার হাট স্মারক কমিটিতে অতীতে সিদ্ধান্ত হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সীমান্ত হাটের বিষয়ে উভয় দেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। সীমান্ত হাটগুলোতে উভয় দেশের অভ্যন্তরে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী অধিবাসীরা পণ্য বিক্রি করতে পারেন। প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন এই হাট বসে। তবে হাট ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমতি সাপেক্ষে সপ্তাহে একাধিক দিনেও হাট বসতে পারে।
বাংলাদেশের সাথে ভারতের ৫টি রাজ্যের মধ্যে আসাম ২৬২ কিমি, ত্রিপুরা ৮৫৬ কিমি, মিজোরাম ১৮০ কিমি, মেঘালয় ৪৪৩ কিমি এবং পশ্চিমবঙ্গ ২,২১৭ কিমি সীমান্ত এলাকা রয়েছে।
দুই দেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন স্বাভাবিক করতে ঢাকা-দিল্লি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক আয়োজন করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সাথে প্রশাসনিক পর্যায়ে (ডিসি-ডিএম) বা সীমান্ত সম্মেলন আয়োজন করে শীতল সম্পর্ক কাটিয়ে উঠতে তা অনেকটা সহায়কের ভূমিকা রাখতে পারে।
সীমান্ত হাট যদিও জেলা প্রশাসন দেখাশোনা করে থাকে, তবে সীমান্ত এলাকা হওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ বিজিবি অনেক দায়িত্ব পালন করে।
ভারতের আসামের শিলচর থেকে প্রকাশিত দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গ পত্রিকার সহকারী বার্তা সম্পাদক মিলন উদ্দিন লস্করের সাথে এ নিয়ে আলাপকালে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মধ্যে একটি শক্তিশালী সভ্যতাগত এবং সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে, যা এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সাধারণত প্রতিফলিত হয়। এই সাংস্কৃতিক যোগসূত্র ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ককে দৃঢ় করেছে। ইন্দো-বাংলা 'বর্ডার হাট' উভয় পক্ষের স্থানীয়দের বাণিজ্য ও মতবিনিময়ের জন্য মিলিত স্থান হিসেবে কাজ করে। এই বর্ডার হাটগুলি ভারত ও বাংলাদেশ দ্বারা ভাগ করা সীমান্তের জিরো লাইনে অবস্থিত এবং স্থানীয় পণ্যের সরাসরি বাণিজ্যের সুবিধা দেয়।’
তিনি বলেন, ‘স্থানীয় জনগণের সাথে সংযোগ স্থাপন এবং স্থানীয়দের অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টিতে উভয় পক্ষের সরকারেরই প্রবল আগ্রহ রয়েছে। প্রান্তিক জনগণের জীবন-জীবিকার অর্থনৈতিক প্রয়োজনে সীমান্ত হাট চালু করা প্রয়োজন।’
সিলেট কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি শ্রী চন্দন শাহ নয়া দিগন্তকে জানান, এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে, সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ করে সীমান্ত হাটগুলোকে প্রাণবন্ত অঞ্চলে রূপান্তর করতে হবে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত হাটগুলি সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার করতে এবং দুই দেশের মধ্যে মানুষে মানুষে সংযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তিনি বলেন, সীমান্তে একটি বৃহত্তর সংখ্যক বর্ডার হাট স্থাপনের মাধ্যমে আরও জীবিকার সুযোগ তৈরি করা এবং সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গভীর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একত্রীকরণ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ে অবদান রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।



