পরিবারের অভাব দূর করার স্বপ্ন নিয়ে পাঁচ বছর আগে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন পরিবারের বড় ছেলে রবিউল ইসলাম। তবে, ঋণের সেই টাকা পরিশোধ হওয়ার আগেই লাশ হয়ে ফিরলেন তিনি।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ভাটোপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে রবিউলের দাফন সম্পন্ন করা হয়।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন নলডাঙ্গার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো: শামীম হোসেনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ।
এর আগে, বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাত ৮টার দিকে রবিউলের লাশ তার নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। তাকে একনজর দেখতে রাত থেকেই বাড়িতে ভিড় করেন আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
জানা যায়, ভিসা ও পাসপোর্ট থাকলেও আকামা বা বৈধ কাগজপত্র না থাকায় প্রায় সাড়ে তিন বছর তেমন কোনো কাজই পাননি রবিউল। ফলে অনেকটা লুকিয়ে সৌদি আরবে অবস্থান এবং কাজ করতে হতো তাকে। আবার কাজ না পেয়ে খুব কষ্টে দিন কেটেছে তার।
অবশেষে কাগজপত্রের জটিলতা কাটিয়ে গত দেড় বছর আগে কাজ শুরু করেন তিনি। আয়-রোজগার শুরু হওয়ায় নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে পরিবার। ধীরে ধীরে পরিশোধ করছিলেন বিদেশ যাওয়ার জন্য নেয়া ঋণও।
তবে, ঋণের টাকা পরিশোধ হওয়ার আগেই ভয়াবহ আগুন কেড়ে নিল তার প্রাণ। পাঁচ বছর আগে যে জরাজীর্ণ বাড়ি রেখে গিয়েছিলেন, সেই বাড়িতেই আজকে লাশ হয়ে ফিরলেন তিনি। পরিবারে রয়ে গেল ঋণের বোঝা, অসমাপ্ত বাড়ি ও স্বজনদের আহাজারি।
নিহতের মা আঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ছেলে অনেক কষ্ট করেছে। কাজ পাওয়ার পর ঋণের টাকা মাসে মাসে পরিশোধ করছিল। ওর স্বপ্ন ছিল আমাদের জন্য একটা বাড়ি করবে। মৃত্যুর আগেও আমার সাথে কথা হয়েছে। বলল মা, এখন ঘুমাবো, পরে কথা বলব। সেই ঘুম যে শেষ ঘুম হবে, ভাবতেও পারিনি।
তিনি আরো বলেন, শুধু নিজের কথা ভাবেননি রবিউল। পরিবারের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ছয় মাস আগে ছোট ভাইকেও নিয়ে যান সৌদি আরবে। দুই ভাই মিলে সংসারের অভাব ঘুচাবেন এমন স্বপ্নই ছিল তাদের। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ থেমে যায় গত ৯ আগস্ট।
স্বজনরা জানান, রবিউল থাকলে ধীরে ধীরে সব ঋণ পরিশোধ করতে পারত। বাবা কৃষক মানুষ। এখন এই ঋণ কিভাবে শোধ হবে, সেটাই আমাদের চিন্তা। পরিবারের বসতবাড়ির অবস্থাও জরাজীর্ণ। রবিউলের স্বপ্ন ছিল সেই বাড়ি বদলে দেবেন। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আগেই থেমে গেছে তার জীবন। এখন একদিকে সন্তান হারানোর শোক, অন্যদিকে ঋণের বোঝা— দুইয়ের ভারে দিশেহারা পরিবারটি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পক্ষ থেকে নিহত রবিউলের পরিবারকে লাশ পরিবহন ও দাফন খরচ বাবদ ৩৫ হাজার টাকা এবং এককালীন আর্থিক অনুদান বাবদ তিন লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। এছাড়াও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশী কর্মীর মৃত্যু হয়। নিহতের মধ্যে নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের তিনজন ছিলেন। তিনজনের মধ্যে একজনের লাশ দেশে এসেছে।
দেশে আসা নিহত রবিউল ইসলাম নাটোর জেলার নলডাঙ্গা উপজেলার মহিষডাঙ্গা গ্রামের মো: আশরাফুল ইসলামের ছেলে। বাকি দু’জনের লাশ দেশে আসার অপেক্ষায় রয়েছে তাদের পরিবার।



