চৌদ্দগ্রামে প্রবাসীর বিরুদ্ধে বৃদ্ধা মায়ের ভরণপোষণ না দেয়ার অভিযোগ

চৌদ্দগ্রামের শ্রীপুর গ্রামে প্রবাসী ছেলের বিরুদ্ধে বৃদ্ধা মাকে ভরণপোষণ না দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও বৃদ্ধা মাকে বাড়ি থেকে বের করে ঘরে তালা ঝুলিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) সংবাদদাতা

Location :

Chauddagram
বৃদ্ধা মা আছিয়া বেগম ও প্রবাসী ছেলে ইমাম হোসেন (বাঁ দিক থেকে)
বৃদ্ধা মা আছিয়া বেগম ও প্রবাসী ছেলে ইমাম হোসেন (বাঁ দিক থেকে) |নয়া দিগন্ত

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের শ্রীপুর গ্রামে প্রবাসী ব্যবসায়ী ছেলে ইমাম হোসেনের বিরুদ্ধে তার বৃদ্ধা মাকে ভরণপোষণ না দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও ওই ছেলে কর্তৃক বৃদ্ধা মাকে বাড়ি থেকে বের করে ঘরে তালা ঝুলিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তার প্রতিবেশী ও সচেতন মহল। কোনো উপায় না পেয়ে ভুক্তভোগী বৃদ্ধা আছিয়া বেগম ছেলের বিরুদ্ধে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও লিগ্যাল এইড অফিসে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৭ বছর আগে উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের আছিয়া বেগমের (৭২) স্বামী আবদুল করিম আমিন মারা যান। এরপর থেকে তিনি জীবন-জীবিকা নির্বাহ ও ভরণপোষণে ছেলেদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ইতিমধ্যে মারা গেছেন বৃদ্ধা আছিয়া বেগমের বড় ছেলে জাকির হোসেনও। ছোট ছেলে ইমাম হোসেন দুবাই প্রবাসী ব্যবসায়ী। দীর্ঘদিন ধরে পরিবার নিয়ে প্রবাসে থাকা ইমাম হোসেন পুরোনো বসতঘর ভেঙে নতুন পাকা ভবন নির্মাণ করে। সে নিজের বোনদের পৈতৃক সম্পত্তির অংশ দিতে রাজি নয় এবং তাদের সাথে সম্পর্ক রাখলে মা আছিয়া বেগমকে বের করে দেয়ার হুমকি দেয়।

পরে আছিয়া বেগম এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিষয়টি অবহিত করলে সালিশ বৈঠকে ছেলে ইমাম হোসেন প্রতি মাসে মাকে ৭ হাজার টাকা ভরণপোষণ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয় এবং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ৪ মাস টাকা প্রদান করে। কিন্তু অপর ছেলে বউ ঝর্ণা বেগমসহ আমির হামজা, সুমন ও সৌরভের কুপরামর্শে একপর্যায়ে টাকা দেয়া বন্ধ করে দেয় ছেলে ইমাম হোসেন।

গত ১ জুলাই প্রবাসী ছেলে বাড়িতে আসছে—এমন খবর পেয়ে মা আছিয়া বেগম বাড়িতে যান। ওই দিন রাত ৮টার সময় ইমাম হোসেন মাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে ঘরে তালা লাগিয়ে দেয়। পরবর্তীতে আছিয়া বেগম মেয়ে আমেনা বেগমকে মুঠোফোনে বিষয়টি জানালে সে মাকে উদ্ধার করে নিজ স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যায়।

অপরদিকে মেয়ের জামাইয়ের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হওয়ায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত বয়োবৃদ্ধ আছিয়া বেগমের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে পারছেন না। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে কোনো সমাধান না পেয়ে এবং নানাভাবে নির্যাতিত হয়ে আছিয়া বেগম ভরণপোষণের জন্য ইউএনও এবং লিগ্যাল এইড অফিসে ব্যবসায়ী ছেলে ইমাম হোসেনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন।

এদিকে দেশে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর ৩ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে তারা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে এ দায়িত্ব পালন করবে। পিতা-মাতার একই স্থানে বসবাসের ব্যবস্থা করতে হবে এবং তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোথাও থাকতে বাধ্য করা যাবে না। এছাড়া সন্তানকে নিয়মিত পিতা-মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে হবে। পিতা-মাতা আলাদাভাবে বসবাস করলে সন্তানের দৈনিক বা মাসিক আয় থেকে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ নিয়মিত দিতে হবে।

ভুক্তভোগী আছিয়া বেগমের মেয়ে আমেনা বেগম বলেন, ‘আমার এক ছেলে মৃত ও এক ছেলে প্রতিবন্ধী। রাজমিস্ত্রি স্বামীর সামান্য উপার্জনে কোনো রকমে আমার সংসার চলে। ভাই মাকে বের করে দেয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে মা আমার বাড়িতে থাকেন। মায়ের ভরণপোষণ দিতে বিত্তশালী ভাইকে বাধ্য করতে সরকারের নিকট অনুরোধ করছি।’

ইউপি সদস্য বজলুর রহমান বলেন, ‘আমি বেশ কয়েকবার সালিশ বৈঠকে ছিলাম। মা ও ছেলের দ্বন্দ্ব নিরসনে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। কারণ, ছেলে এক থেকে দুই লাখ টাকা খরচ করে কোরবানি দেয়, আর তার মা অন্যদের কাছ থেকে চেয়ে গোসত খান। ছেলে ও ছেলের বউ নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়, তারপর তিনি মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে যান। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান জরুরি।’

শ্রীপুর ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান শাহ আলম বলেন, ‘মা চাইলেই বিষয়টি সহজে সমাধান হবে। ছেলের, মায়ের ভরণপোষণে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তার মা মেয়ে ও নাতি নিয়ে থাকতে চান, এটা কোনো ছেলে মেনে নেবে না।’

ছেলে প্রবাসী ব্যবসায়ী ইমাম হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এগুলো পুরোনো খবর। এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘কেউ যদি পিতা-মাতাকে ভরণপোষণ না দেয় সেটা সামাজিক বিষয়। কিন্তু ছেলে খাওয়াচ্ছে না—বিষয়টি স্থানীয় যারা আছেন তারা মীমাংসা করতে পারেন। ছেলে যদি মাকে ঘরে জায়গা না দেয় তাহলে আমরা স্থানীয় চেয়ারম্যানকে ব্যবস্থা নিতে বলব।’