টাকার বিনিময়ে মাদকসহ গাড়ি ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ

হাতীবান্ধায় পুলিশের চার কর্মকর্তা ক্লোজড, তদন্ত কমিটি গঠন

ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী যখন মাদকমুক্ত আলোকিত লালমনিরহাট প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন, ঠিক তখনই জেলাটির হাতীবান্ধা থানার দুইজন এসআই ও দুইজন এএসআইয়ের বিরুদ্ধে উঠল গাড়ি, বাইকসহ মাদক ও মাদক কারবারিকে আটক করে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়ার গুরুতর অভিযোগ।

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর ব্যুরো

Location :

Lalmonirhat
হাতীবান্ধায় পুলিশের চার কর্মকর্তা ক্লোজড, তদন্ত কমিটি গঠন
হাতীবান্ধায় পুলিশের চার কর্মকর্তা ক্লোজড, তদন্ত কমিটি গঠন |নয়া দিগন্ত

ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী যখন মাদকমুক্ত আলোকিত লালমনিরহাট প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন, ঠিক তখনই জেলাটির হাতীবান্ধা থানার দুইজন এসআই ও দুইজন এএসআইয়ের বিরুদ্ধে উঠল গাড়ি, বাইকসহ মাদক ও মাদক কারবারিকে আটক করে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়ার গুরুতর অভিযোগ।

এরই মধ্যে অভিযুক্ত চার পুলিশ সদস্যকে পুলিশ লাইনে ক্লোজড করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পুলিশ। ক্লোজড হওয়া কর্মকর্তারা হলেন ওই থানার এসআই তুহিন ও রিমন মিয়া এবং এএসআই আব্দুল হাকিম ও লুৎফর রহমান।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যমতে, শুক্রবার (১৭ জুলাই) দুপুরে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার বোর্ডের হাট বাজারের পূর্বপাশে মাদক ব্যবসায়ী শাহিনুরের বাড়ির সামনে অভিযান চালান অভিযুক্ত হাতীবান্ধা থানার এসআই তুহিন ও রিমন মিয়া এবং এএসআই আব্দুল হাকিম ও লুৎফর রহমান।

অভিযানের সময় একটি সাদা রঙের প্রাইভেটকার, একটি মোটরসাইকেল এবং বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দসহ আটক করা হয় একাধিক মাদককারবারিকে। কিন্তু সেগুলো থানায় না নিয়ে ভেলাগুড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে নেয় পুলিশ। এ সময় মোটরসাইকেলটি সেখানে চালিয়ে আনেন ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মহল্লাদার শামীম মিয়া।

রাত ১০টা পর্যন্ত সেখানে প্রকাশ্যে লেনদেনের মহড়া বসিয়ে সাদা কাগজে মুচলেকা নিয়ে সাড়ে ৯ লাখ টাকা লেনদেন করে গাড়ি, বাইক, মাদক ও আটকদের ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ ওঠে ওই চার পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন গ্রুপে।

ঘটনাটি জানাজানি হলে টনক নড়ে পুলিশের। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুরে রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি আমিনুল ইসলাম লালমনিরহাট পুলিশ সুপারকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেন। তাঁর নির্দেশনার প্রেক্ষিতে বিকেলে অভিযুক্ত পুলিশের চার কর্মকর্তা এসআই তুহিন ও রিমন মিয়া এবং এএসআই আব্দুল হাকিম ও লুৎফর রহমানকে পুলিশ লাইনে ক্লোজড করা হয়েছে।

এছাড়াও ঘটনাটি নিবিড়ভাবে তদন্ত করতে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে আহ্বায়ক এবং ২ জন ইন্সপেক্টরকে সদস্য করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো: আসাদুজ্জামান জানান, ‘অভিযোগটি বৃহস্পতিবার দুপুরে নজরে আসে। এরপরপরই তাদের ক্লোজড করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

ঘটনার সময়কার ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন স্থানে। স্বাধীনভাবে যাচাই-বাছাই করার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে আবেদনের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেন এই প্রতিবেদক। তাতে দেখা যায়, ওই দিন বেলা সোয়া ৩টার সময় সাদাপোশাকে পুলিশের ওই কর্মকর্তারা গাড়িসহ সেখানে আসেন। কিছুক্ষণ পর ইউনিয়ন পরিষদ ক্যাম্পাসে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান, ৫ নং ইউপি সদস্য শরিফুল ইসলাম এবং ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মহল্লাদার রবিউল ইসলাম আসেন এবং তাঁরা পরে চলে যান।

ফুটেজে সাদা পোশাকে চার পুলিশ কর্মকর্তাকে কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তির সাথে দীর্ঘ সময় কথা বলতে দেখা যায়। এক পর্যায়ে সাদা কাগজে কিছু লিখে রাত ১০টার পর গাড়ি, বাইকসহ সবাই সেখান থেকে চলে যান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সাড়ে ৯ লাখ টাকার মধ্যস্থতায় গাড়ি, বাইক, মাদক ও আসামিদের ছেড়ে দেয় পুলিশ। এ সময় মহল্লাদার রবিউল ইসলামের মোবাইল থেকে ইউনিয়ন পরিষদের সিসিটিভি ক্যামেরার অ্যাপস মুছে ফেলতে বাধ্য করেন এসআই তুহিন। এছাড়াও পরবর্তীতে ওই ফুটেজ মুছে ফেলতে ইউনিয়ন সদস্য সচিব কল্লোল চন্দ্র রায়ের ওপর চাপ সৃষ্টিও করেন এসআই তুহিনসহ অন্যরা।

ঘটনার বিষয়ে বুধবার (২২ জুলাই) দুপুর থেকে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সন্ধ্যা পর্যন্ত সরেজমিনে পরিদর্শন করেন প্রতিবেদক। এ সময় ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান জানান, ‘ওই দিন আমার ওয়ার্ডে একজন মহিলার সাথে কিছু ছেলে গ্যাঞ্জাম করেছিল। তারা আমার বাজারের দোকানে এসে বিষয়গুলো জানায়। তখন আমি চৌকিদারকে ফোন দিলাম। তখন চৌকিদার আমাকে বলে ইউনিয়ন পরিষদে পুলিশ এসেছে। এশার নামাজ পড়ে আমি সেখানে গিয়ে দেখি পুলিশ পাঠিয়ে দিই ঘটনাস্থলে। আমি এসে দেখি দুইজন এসআই ও দুইজন এএসআই। তখন আমি বিট অফিসার এএসআই হাকিম ভাইকে ঘটনা বলে চলে আসি। পরে শুনি যে ওখানে টাকার বিনিময়ে গাড়ি ও মাদকের চালান ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।’

৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শরিফুল ইসলাম জানান, ‘আমি তামাকের ব্যবসা করি। একজনের কাছে ৪০ হাজার টাকা পাই। শুক্রবার বিকেলে টাকা নেয়ার জন্য চাপার হাটে যাই। কিন্তু তিনি আমাকে ১৬ হাজার টাকা দেন। আমি এটা নিয়ে খুব টেনশনে পড়ি। বাড়িতে ফিরে আসার পথে ইউনিয়ন অফিসে যাই। সেখানে প্রস্রাব করার পর ফিরে আসার সময় দেখি একজন পুলিশ বেঞ্চের ওপর উঠে বসে আছে। আরো পুলিশ এবং অপরিচিত লোকজন। সাথে চৌকিদার। ওই পুলিশ এমন ভাব করল যেন আমাকে তিনি চেনেন না। তখন আমি অপমানবোধ করে সেখান থেকে চলে আসি। পরের দিন শুনি সেখানে মাদকের চালানের লেনদেন ও ভাগবাটোয়ারা হয়েছে। পরে আরও শুনি সচিবকে সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করার জন্য পুলিশ চাপ দিয়েছে। তখন আমি সচিব কল্লোল দাকে বলি, কোনোভাবেই সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করা যাবে না।’

৭ নম্বর ওয়ার্ডের মহল্লাদার শামীম মিয়াকে বাড়ি এবং ইউনিয়ন অফিসে পাওয়া যায়নি। মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঘটনার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। সিসিটিভি ফুটেজে তাকে দেখা যাচ্ছে—এমন প্রশ্ন করলে তিনি ফোন কেটে দেন।

বিষয়টি সম্পর্কে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মহল্লাদার রবিউল ইসলাম জানান, ‘পুলিশ ইউনিয়ন পরিষদে এসেছে শুনে আমি ঘটনাস্থলে যাই। যেহেতু এই ওয়ার্ডেই পরিষদ। আমি যাওয়ার পর রংপুর থেকে ২ জন ব্যক্তি আসেন। একজন পাঞ্জাবি এবং আরেকজন টি-শার্ট পরিহিত। পুলিশদের সাথে তাদের অনেকক্ষণ কথা হয়। এ সময় এসআই রিমন আমাকে একটি সাদা কাগজ আনতে বলেন। আমি সাদা কাগজ আনি। তিনি আমাকে একটু দূরে যেতে বলেন। আমি একটু দূরে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনাটি দেখি। দেখি লেখালেখি চলছে।

এরপরপরই এএসআই আব্দুল হাকিম এসে বলেন, এখানে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে, এটা তো জানতাম না। এই কথা বলে তিনি আমার মোবাইলে থাকা সিসিটিভি অ্যাপটি মুছে ফেলার নির্দেশ দেন। এক পর্যায়ে তার চাপে আমি মোবাইল থেকে অ্যাপসটি ডিলিট করি। তারা আমার কাছে চাপ প্রয়োগ করে পাসওয়ার্ডের জন্য। আমি বলি ওটা সচিব সাহেবের কাছে আছে। তখন তারা সচিব সাহেবের সাথে যোগাযোগ করে। তবে সাদা কাগজে কি লেখা হয়েছিল এবং কত টাকা দেনদরবার হয়েছে সেটি আমি বলতে পারব না। কারণ আমাকে কাছে যেতে দেয়নি।”

এ ব্যাপারে ভেলাগুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সচিব কল্লোল চন্দ্র রায় জানান, ‘ঘটনার পর আমি বিষয়টি জানতে পারি। তখন সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করি। পরে শুনতে পাই ওই গাড়ি ও মোটরসাইকেল মাদকসহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখানে এসে লেনদেন করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এর বেশি কিছু আমি জানি না। এখনও অফিসিয়ালি আমাকে কেউ এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেনি। বিষয়টি আমি ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসকের মাধ্যমে ইউএনও স্যারকে জানিয়ে রেখেছি। আমাকে এসআই তুহিন ফোন করে ফুটেজ ডিলিট করার জন্য বলেছিল। আমি সাফ জানিয়ে দিয়েছি সেটা সম্ভব নয়। বরং অনধিকার চর্চা করে আমার ইউনিয়ন পরিষদ ক্যাম্পাসকে কেন ব্যবহার করা হলো সে বিষয়ে আমি তার কাছে জানতে চেয়েছি। তিনি কোনো উত্তর দেননি।’

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, এই ঘটনার পরদিন ১৮ জুলাই টংভাঙ্গা ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামে ওই চার পুলিশ কর্মকর্তা এক ব্যক্তিকে মাদক মামলার আসামি দাবি করে আটক করেন। কিন্তু স্থানীয়দের তীব্র প্রতিবাদের মুখে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এলাকাবাসীর দাবি, আটক ব্যক্তির কাছে কোনো মাদক ছিল না, এমনকি তার বিরুদ্ধে কোনো পরোয়ানাও দেখাতে পারেনি পুলিশ। তবে পুলিশের দাবি, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক মামলা রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে বুধবার রাতে হাতীবান্ধা থানায় গেলে অভিযুক্ত এসআই রিমন, এএসআই আব্দুল হাকিম ও এএসআই লুৎফর পালিয়ে যান।

তবে এসআই তুহিন জানান, ‘মাদক কারবারি শাহীনের বাড়ি থেকে কাগজপত্রবিহীন একটি মোটরসাইকেল ও মাদক পরিবহনের জন্য একটি ব্যাগ আটক করা হয়েছিল। পরে সেগুলো ইউনিয়ন পরিষদ ক্যাম্পাসে এনে মানবিক কারণে জিম্মানামা দিয়ে বাইক ও আটককৃতদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিই। তবে সাদা প্রাইভেটকার সম্পর্কে তার কিছু জানা নাই।’

এ সময় তিনি বলেন, ‘এগুলো ছোট ঘটনা। এগুলো নিয়ে লেখালেখি করলে আমাদের ক্ষতি হবে। আসেন, আমরা সবাই বসে একটা সুরাহা করি।’

বাকি তিন কর্মকর্তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তারা রিসিভ করেননি।

এ ব্যাপারে রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি আমিনুল ইসলাম জানান, ‘বিষয়টি অবহিত হওয়ার সাথে সাথেই লালমনিরহাট পুলিশ সুপারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তদন্ত শেষ হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। মাদকের সাথে যেই জড়িত থাকুক, সেটা যদি পুলিশও হয় তাকে একচুলও ছাড় দেয়া হবে না।’

এদিকে হাতীবান্ধা উপজেলার সীমান্ত এলাকায় অন্তত ৬৫ জন ব্যক্তির সাথে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক।

তারা বলেন, ‘ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু যখন লালমনিরহাটকে মাদকমুক্ত আলোকিত লালমনিরহাট গড়ার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন, তখন পুলিশের ভেতরে একটি পক্ষ তার এই উদ্যোগকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করছে। তারা সরাসরি মাদক বিস্তারে পৃষ্ঠপোষকতা করছে। মাদককারবারিদের প্রকাশ্যে ধরে ছেড়ে দিচ্ছে, সখ্য গড়ে তুলছে। এ ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আলোকিত লালমনিরহাট গড়ার সাহসী উদ্যোগ থমকে যেতে পারে।’