তিতাস নদীর ওপর সেতুতে হঠাৎ দেখা গেল এক তরুণী নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন। চারপাশে থাকা মানুষজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন পুলিশ সদস্য দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপ দিলেন নদীতে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাঁতরে তিনি পৌঁছে গেলেন ওই তরুণীর কাছে। এরপর তাকে ধরে টেনে নিয়ে এলেন তীরে। নৌকার সহায়তায় শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করা হলো তরুণীকে। এভাবেই এক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত ও সাহসিকতায় তিতাস নদীর পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে ২৪ বছর বয়সী এক তরুণীর জীবন রক্ষা করলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সের কনস্টেবল অমিত হাসান।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাত ১০টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের শিমরাইলকান্দি এলাকার শেখ হাসিনা সড়কের প্রথম ব্রিজে এ ঘটনা ঘটে। পরে ওই তরুণীকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রাতে কনস্টেবল অমিত হাসান তার ব্যাচমেট কনস্টেবল মো: ফয়সাল ও ইফরান মাহমুদকে সাথে নিয়ে সেতু এলাকায় ঘুরতে ও নাশতা করতে গিয়েছিলেন। এ সময় তারা দেখতে পান, এক তরুণী সেতু থেকে তিতাস নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন।
পরিস্থিতি বুঝে এক মুহূর্তও দেরি করেননি অমিত হাসান। সাথে সাথে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে ওই তরুণীর কাছে পৌঁছান তিনি। পরে তাকে উদ্ধার করে একটি নৌকার সহায়তায় নদীর পাড়ে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হয় তরুণীকে।
ঘটনার পর বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়। খবর পেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১ নম্বর শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক নাছির উদ্দিন হাসপাতালে ছুটে যান। তিনি তরুণীর পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তার চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের পুলিশ বক্সে দায়িত্বে থাকা কনস্টেবল মঞ্জুর আলম ফারাবী বলেন, ‘এক তরুণী ব্রিজ থেকে নদীতে ঝাঁপ দেয়ার পর কনস্টেবল অমিত হাসান সাথে সাথে পানিতে লাফিয়ে পড়েন। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।’
পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ছয় মাস আগে সদর উপজেলার রাধিকা-জগৎসার গ্রামের এক যুবকের সাথে ওই তরুণীর বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর সাথে তিনি নারায়ণগঞ্জে বসবাস করতেন। তবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় প্রায় তিন মাস আগে তিনি বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন।
পুলিশের ধারণা, পারিবারিক কলহ কিংবা স্বামীর সাথে অভিমানের জেরে ওই তরুণী আত্মহত্যার চেষ্টা করে থাকতে পারেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১ নম্বর শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক নাছির উদ্দিন বলেন, ‘মেয়েটি আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে ব্রিজ থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আমাদের এক পুলিশ সদস্য পানিতে ঝাঁপ দিয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসেন।’
তিনি বলেন, ‘রাত ১২টার দিকে তাকে তার মা ও বোনের জিম্মায় দেয়া হয়েছে। পারিবারিক কলহ কিংবা স্বামীর সাথে অভিমান থেকে তিনি এমনটি করে থাকতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
তিতাস নদীর স্রোতে তখন হয়তো আর কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষাই ছিল বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ানোর জন্য। কিন্তু সেই মুহূর্তে দায়িত্বের বাইরে গিয়েও একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নেন কনস্টেবল অমিত হাসান। তার এমন সাহসিকতা ও মানবিক উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন স্থানীয়রা।
পরিবারের সদস্যরাও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ওই পুলিশ সদস্যের প্রতি। তাদের ভাষায়, অমিত হাসান সেদিন শুধু একজন পুলিশ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি, একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনও ঝুঁকিতে ফেলেছেন।



