০৫ ডিসেম্বর ২০২০

রেলের প্রকল্প যেন ঠেলায় ঠেলছে

রেলের প্রকল্প যেন ঠেলায় ঠেলছে - ছবি : সংগৃহীত

দেশের উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে রয়েছে নানান ধরনের সমালোচনা। তারপরও প্রকল্পের কাজে কোনো ধরনের উন্নতি আসছে না। উল্টো বছরের পর বছর চলছে প্রকল্প, যেন শেষ হওয়ার নাম নেই। ‘৯টার ট্রেন কয়টায় ছাড়ে’ যেমন প্রবাদ আছে, তেমনি রেলওয়ের প্রকল্পকে এখন ঠেলাগাড়ি ঠেলছে। দেড় বছরের প্রকল্পে ৯ বছর শেষে কাজ হয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ। ১১৮ কোটি টাকার প্রকল্পব্যয় এখন ৬৭৯ কোটি টাকায় উন্নীত। প্রকল্পটি হলো কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশনের পুনর্বাসন। প্রকল্পের ধীরগতির রহস্য উদঘাটনে আট সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। ২০১৫ সালের ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরের সময় প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। জানতে চাইলে নতুন প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সুলতান আলী বলেন, তিনি মাত্র দায়িত্ব পেয়েছেন এখনো ১৫ দিন হয়নি।

প্রকল্প পর্যালোচনায় জানা গেছে, কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশনের পুনর্বাসনে ১১৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা খরচে দেড় বছরে প্রকল্পটি সমাপ্ত করার জন্য ২০১১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর একনেকে অনুমোদন দেয়া হয়। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি সমাপ্ত হওয়ার কথা। প্রকল্পটির অগ্রগতি না থাকলেও তিন বছর পর ২০১৫ সালের ২৬ মে একনেক থেকে পাঁচ গুণ ব্যয় বাড়িয়ে ৬৭৮ কোটি ৫১ লাখ টাকায় নতুন ব্যয় অনুমোদন করা হয়। আর এখানে ভারত সরকারের ঋণ ৫৫৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা যুক্ত করা হয়। মেয়াদ বাড়িয়ে এক লাফে ছয় বছর করা হয়। ২০১৭ সালের জুনে প্রকল্পটি সমাপ্ত করার কথা ছিল। তাতেও কোনো উন্নতি নেই। এরপর আবার মেয়াদ বাড়ানো হয় তিন বছর, অর্থাৎ ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু কথায় আছে, যে চলে না, তাকে টেনেও আগানো যায় না। প্রকল্পটির হয়েছে এই দুর্দশা।

এ দিকে প্রকল্পে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত সার্বিক কাজ হয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ। হিসাব করলে বছরে গড়ে ২ শতাংশও কাজ হয়নি। আর খরচ হয়েছে ১৭ শতাংশ বা ১১২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। বর্তমান ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রকল্পের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ ছিল মোট ৬১ কোটি টাকা। যেখানে জিওবি ১০ কোটি এবং ভারতীয় ঋণের ৫১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের দুই মাসে আগস্ট পর্যন্ত খরচ হয়েছে সাড়ে ৯ কোটি টাকা। ১৬ শতাংশ অর্থ ব্যয়ে অগ্রগতি মাত্র ১ শতাংশ। মূল প্রকল্পের ৮৩ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে। অথচ ৯ বছর সময় ইতোমধ্যে পার করা হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৯৬ সালের ৪ ডিসেম্বর চালু হয় সেকশনটি। এটি ভারতের আসাম রাজ্যের সাথে যুক্ত। ১০৬ বছর চালু থাকার পর বাজেট স্বল্পতায় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করায় এক সময় ট্রেন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে সেকশনটি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৫২ দশমিক ৫৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশনটি ২০০২ সালের ৭ জুলাই বন্ধ করে দেয়া হয়।

স্টিয়ারিং কমিটির সভায় বিদায়ী প্রকল্প পরিচালকের তথ্যানুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় কাজগুলো হলোÑ কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশনে বিদ্যমান ৫২.৫৪ কিলোমিটার মিটার গেজ রেললাইনকে ৬০ কেজি ডুয়েল গেজে সিঙ্গেল লাইনে পুনর্বাসন, চারটি বি শ্রেণী ও দুইটি ডি শ্রেণী স্টেশন ভবন নির্মাণ এবং প্লাটফরম নির্মাণ, ৫৯টি রেল সেতু, যার মধ্যে ১৭টি মূল এবং ৪২টি মাইনর নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ, নন-ইন্টারলকড কালার লাইট সিগন্যালিং ব্যবস্থা স্থাপন।

প্রকল্পের বর্তমান পরিস্থিতিতে খোদ রেলপথ মন্ত্রণালয়ই বলছে, কাজের যে হাল তাতে বাকি কাজ শেষ করতে আরো ৯ বছর লাগতে পারে।
এ দিকে কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশনের পুনর্বাসন (১ম সংশোধিত) প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নি¤œ অগ্রগতির কারণ অনুসন্ধান, পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদানের জন্য রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে (উন্নয়ন ও পরিকল্পনা) আহ্বায়ক করে একটি কমিটি করা হয় গত ১১ অক্টোবর। কমিটিকে ১৫ কার্য দিবসের মধ্যে রিপোর্ট দাখিল করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন, প্রতিনিধি পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের, পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের, আইএমইডির, বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-প্রধান (পরিকল্পনা), সদস্যসচিব হলেন প্রকল্প পরিচালক।

এ ব্যাপারে দীর্ঘসময় কাজ করা প্রকল্প পরিচালক তানভিরুল ইসলামের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, তিনি এখন আর এই প্রকল্পে নেই। বদলি হয়ে গেছেন। এখন নতুন পিডি হলেন সুলতান আলী। প্রকল্পের ব্যাপারে তার সাথেই কথা বলতে হবে। আর বর্তমান প্রকল্প পরিচালক জানান, তিনি মাত্র প্রকল্পটির দায়িত্ব পেয়েছেন। তাই প্রকল্পটি সম্পর্কে সব কিছু বুঝে না নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছেন না।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: সেলিম রেজার সাথে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করে বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রকল্পটি নিয়ে গত ১১ সেপ্টেম্বর তারই সভাপতিত্বে পর্যালোচনা বৈঠক করে নি¤œ অগ্রগতির কারণ অনুসন্ধানে কমিটি গঠন করে দেয়া হয়।


আরো সংবাদ