১০ ডিসেম্বর ২০২২, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

চলে গেলেন এক বিদগ্ধ শরিয়াহ স্কলার

চলে গেলেন এক বিদগ্ধ শরিয়াহ স্কলার - ছবি: সংগৃহীত

উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন, দেশের শীর্ষস্থানীয় দ্বীনী প্রতিষ্ঠান আল জামেয়াতুল ইসলামিয়া পটিয়ার মহাপরিচালক, সরকারের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত পাঁচটি কওমি শিক্ষাবোর্ডের অন্যতম আঞ্জুমান-ই-ইত্তিহাদুল মাদারিস বাংলাদেশের মহাসচিব, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির সভাপতি, শ্রদ্ধেয় মুরব্বি আল্লামা শাহ আবদুল হালিম বোখারী রহ. পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন।

গত ২১ জুন চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে একটি বর্ণাঢ্য জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল। ইসলামী অর্থনীতির ওপর তার গবেষণালব্ধ বহু কর্মপন্থা ও ফতোয়া ইসলামী ব্যাংকসগুলো যেমন সমৃদ্ধ হরয়রছ তেমনি মুসলিম উম্মাহকে সুদভিত্তিক অর্থনীতির বিকল্প হিসেবে একটি শরিয়াহভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠায় অনন্য সহায়তা প্রদান করেছে। পটিয়া জামিয়ায় তিনি তার তত্ত্বাবধানে স্কলারদের নিয়ে ৪০ খণ্ডের ফতোয়াকোষ প্রণয়নের বৃহৎ প্রকল্পের কাজ শুরু করেছিলেন। পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ বেশ এগিয়ে চলে কিন্তু হায়াতের অভাবে তিনি পূর্ণতা দিতে পারেননি।

আল্লামা বোখারী ১৯৪৫ সালে চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া থানার রাজঘাটা গ্রামে ইলমি খান্দানে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মাওলানা আবদুল গণি বোখারী রহ. ছিলেন খ্যাতিমান বক্তা ও শিক্ষাবিদ। উজবেকিস্তান থেকে তার পূর্বপুরুষরা ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে এ দেশে এসেছিলেন। আল্লামা শাহ আবদুল হালিম বোখারী রহ. ১৯৬৪ সালে পটিয়া জামিয়া থেকে দাওরায়ে হাদিস সমাপ্ত করেন। এক বছর জামিয়ার অধীনে উচ্চতর বাংলা সাহিত্য ও গবেষণা বিভাগে অধ্যয়ন করেন। তিনি সাতকানিয়া আলিয়া মাদরাসা থেকে আলিম, গোপালপুর মাদরাসা থেকে ফাজিল ও টাঙ্গাইল আলিয়া মাদরাসা থেকে কামিল পরীক্ষায় স্টার মার্ক পেয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তিনি টাঙ্গাইল কাগমারী কলেজ থেকে এইচএসসি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করেন। পাশাপাশি তিনি লাহোর ডন হোমিওপ্যাথিক কলেজে বায়োক্যামিকের ওপর দু’বছর মেয়াদি কোর্স সম্পন্ন করেন।

১৯৬৭-১৯৬৮ পর্যন্ত তিনি টাঙ্গাইল দারুল উলুম আলিয়া মাদরাসার আরবি প্রভাষক ছিলেন। এরপর খতিবে আজম মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ রহ. ও অধ্যক্ষ মাওলানা হাবিবুল্লাহ রহ.-এর অনুরোধে তিনি সাতকানিয়া মাহমুদুল উলুম আলিয়া মাদরাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন ও চার বছর শিক্ষকতা করেন। ১৯৭২ সালে তিনি পুনরায় টাঙ্গাইল দারুল উলুম আলিয়া মাদরাসায় চলে যান। ১৯৭২-১৯৮২ পর্যন্ত সেখানে মুহাদ্দিস ও শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে তৎকালীন প্রধান পরিচালক হজরত মাওলানা হাজী ইউনুছ রহ: তাকে আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়ায় শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেন। ২০০৩-০৮ পর্যন্ত জামিয়ার সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব পালনের পর ২০০৮ সাল থেকে মৃত্যু অবধি প্রধান পরিচালক হিসেবে খিদমত আঞ্জাম দেন। তার আমলে পটিয়া জামিয়া অ্যাকাডেমিক ও অবকাঠামোগত বেশ উন্নতি করে। মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের মেহনতের ফলে প্রতি বছর ইত্তেহাদ ও হাইআতুল উলইয়ার কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা কৃতিত্বপূর্ণ রেজাল্ট করতে থাকে।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্সের স্বীকৃতি দেয়ার নিমিত্তে আল হাইআতুল উলইয়া গঠিত হলে এর স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন তিনি। বাংলাদেশ তাহফিজুল কুরআন সংস্থার সভাপতি ও জামিয়া পটিয়ার মুখপাত্র মাসিক আত-তাওহিদের প্রধান সম্পাদক ছিলেন। জীবনের ৫০ বছর হাদিসের খিদমত করেন। তিনি তাহাভি, তিরমিজি ও বোখারি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছেন আরবি ভাষায়। এসব গ্রন্থের উর্দু ও বাংলা ভাষ্য বেরোচ্ছে। তিনি যেকোনো কঠিন ও জটিল বিষয়ে তাৎক্ষণিক সহজভাবে উত্তর দিতে পারদর্শী ছিলেন। মেধা ও মননশীলতার বহুমাত্রিকতা তার জীবনকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে।

হাদিসশাস্ত্রের ওপর বিশেষ পাণ্ডিত্য থাকলেও তাফসির, ফিকাহ, সাহিত্য, ইলমুল কালাম, নাহু-সারাফ ও বালাগত শাস্ত্রে তার বিচরণ ছিল অবাধ। কওমি, আলিয়া ও কলেজে অধ্যয়নের ফলে তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হয়। দেওবন্দ চেতনাকে সযত্নে লালন করায় আকাবেরিনদের উসুলের বাইরে পা রাখেননি। আশআরি ও মাতুরিদি দর্শন তার চিন্তাধারাকে ঋদ্ধ করে। আরবি, বাংলা, উর্দু, ফারসি ও ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে ও লিখতে তিনি কুণ্ঠাবোধ করতেন না। উর্দু ও আরবি ভাষায় গদ্যসাহিত্যের পাশাপাশি কাব্যরচনা করতেও তার বেগ পেতে হতো না। ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের শায়খুল হাদিস আল্লামা সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ:-এর জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থে তিনি ‘কালাম মুআররা’ শীর্ষক ১৬ লাইনের উর্দু ভাষায় নুকতাবিহীন একটি মর্সিয়া রচনা করেন (মুফতি ওমর ফারুক সম্পাদিত মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ: স্মারকগ্রন্থ, ২০২০ খ্রি., ঢাকা, পৃষ্ঠা-৪৩)। গভীর জ্ঞান ও মনীষা না থাকলে এ-জাতীয় কঠিন কাজ সম্ভব নয়।

ব্যক্তিজীবনে আল্লামা শাহ আবদুল হালিম বোখারী রহ: ছিলেন সহজ, সরল ও বন্ধুবৎসল। ঠাণ্ডা মাথায় জটিল ও কঠিন সমস্যা সমাধানে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। পাঠদান পদ্ধতি আকর্ষণীয় হওয়ায় শিক্ষার্থীরা তার ক্লাসে হুমড়ি খেয়ে পড়ত। বোখারী সাহেবের ছোট ভাই চট্টগ্রামের গারাঙ্গিয়া আলিয়া মাদরাসার প্রধান মুহাদ্দিস মাওলানা আবদুর রহিম বোখারী রহ: কয়েক বছর আগে ইন্তেকাল করায় তিনি অনেকটা ভেঙে পড়েন। ধীরে ধীরে নিজের বিদায়ের প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

মৃত্যুর স্বল্পদিন আগে নিজের বাস্তুভিটা সমঝোতার ভিত্তিতে ছেলেমেয়েদের মধ্যে বণ্টন করে দেন; যাতে তার অনুপস্থিতিতে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি না হয়। পটিয়া জামিয়ায় সহযোগী ও সহকারী পরিচালক নিয়োগ দেন; যাতে তার অনুপস্থিতিতে মাদরাসা পরিচালনা বিঘ্নিত না হয়। এ ক্ষেত্রে তিনি পূর্বসূরিদের ঐতিহ্য অনুসরণ করেন এবং উত্তরসূরিদের জন্য দৃষ্টান্ত রেখে যান। পটিয়া জামিয়া ইসলামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক কুতবে জামান শাহ মুফতি আজিজুল হক রহ. জীবদ্দশায় মাওলানা হাজী মুহাম্মদ ইউনুস রহ.-কে পরবর্তী মুহতামিম নিয়োগ করে যান।

তিনি জীবিত থাকতে হজরত মাওলানা হারুন ইসলামাবাদীকে পরবর্তী মুহতামিম ঠিক করে যান। আল্লামা আবদুল হালিম বোখারী রহ, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ হামযা হাফি.-কে নায়েবে মুহতামিম ও মাওলানা আবু তাহের নদভী কাছেমী হাফি.-কে মুঈনে মুহতামিম নিযুক্ত করে যান। মাদরাসা পরিচালনার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নায়েবে মুহতামিমই মজলিশে শুরার পরবর্তী বৈঠক না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাবেন। নায়েবে মুহতামিম না থাকলে মুঈনে মুহতামিম ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। শুরার সদস্যরা ঠিক করবেন পরবর্তী পূর্ণকালীন মুহতামিম।

আল্লামা বোখারী ছিলেন আল জামিয়া আল ইসলামিয়ার সাবেক শায়খুল হাদিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ রহ.-এর শীষ্য ও রাজনৈতিক সহকর্মী। খতিবে আযমও বোখারী সাহেবকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন।

স্মৃতিচারণমূলক এক নিবন্ধে তিনি বলেন, ‘আমি ছিলাম খতিবে আযম রহ.-এর রাজনৈতিক জীবনের সহকর্মী। সে সুবাদে আমি সবসময় তার সাথে থাকতাম। বাংলার জমিনে খতিবে আযম একজনই আমরা দেখেছি, ভবিষ্যতে আর পাবো এ আশা করতে পারি না। আমি বলতে চাই, কয়েকজন আযম দুনিয়াতে এসেছেন; আর আসবেন না। তার মধ্যে- ১. ইমামে আযম আবু হানিফা রহ:; ২. গাউসুল আজম শায়খ আবদুল কাদের জিলানী রহ:; ৩. বাংলার মুফতিয়ে আজম মুফতি ফয়জুল্লাহ রহ: ও ৪. খতিবে আজম মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ রহ: এ ক’জন আজম আমরা দেখেছি। এ ধরনের গুণাবলির অধিকারী ব্যক্তি, অদ্যাবধি আমাদের নজরে পড়েনি, পড়বে বলেও মনে হয় না। আমি যখন টাঙ্গাইল আলিয়ার হেড মুহাদ্দিস ছিলাম। তখন আমি মনস্থ করলাম, বোখারি শরিফের সর্বশেষ দারস আমি খতিবে আজম সাহেবের মাধ্যমে সমাপ্ত করাব। হুজুরের সাথে দেখা করলে তিনি দাওয়াত কবুল করেন। বার্ষিক সভায় বোখারি শরিফের খতম হবে। আমি তাকে আমার কক্ষে অবস্থানকালীন বললাম, হুজুর বার্ষিক সভায় বয়ান করার আগে আমার ছেলেদের সবক পাড়াতে হবে। এটি ছিল বোখারি শরিফের সর্বশেষ হাদিস। হুজুর বললেন, ঠিক আছে। আমি মনে করলাম, হুজুর আমাকে বোখারি শরিফের সংশ্লিষ্ট জিলদখানা ও এর কয়েকটি ব্যাখ্যা গ্রন্থ নিয়ে আসতে বলবেন। অথচ তিনি তার কিছুই করলেন না। আগত লোকজনের সাথে গল্প-গুজব করতে লাগলেন। আমি চিন্তিত হয়ে গেলাম। হুজুর বোখারি শরিফ দারস দেয়ার কথা ভুলে গেলেন কি না? দেখি যে না! তিনি স্টেজে গিয়ে বললেন, বোখারি শরিফ নিয়ে এসো। ছাত্রদের ডাক দাও। ছাত্ররা এলো। সাঈদুর রহমান নামে এক ছাত্র মতন পড়ল, মতন পড়ার পর হুজুর তাকরির আরম্ভ করেন, ইমাম বোখারি কোন সালে জন্মলাভ করেন, কোন সালে ইন্তেকাল করেন, বোখারি শরিফের সর্বপ্রথম হাদিসের সাথে সর্বশেষ হাদিসের কী সম্পর্ক, এই হাদিস দিয়ে কেন শুরু করা হয়েছে এবং এই হাদিস দিয়ে কেন শেষ করা হলো ইত্যাদি বিষয়। তিনি অনর্গল বলে যেতে থাকেন এবং এই হাদিসের মাধ্যমে আমরা কী শিক্ষা লাভ করলাম ইত্যকার যাবতীয় বিষয়া। এভাবে অন্তত এক ঘণ্টা দিলেন তিনি মন্ত্রমুগ্ধ দারস। একেকটি হাদিসের ওপর তিনি অসাধারণ বক্তৃতা করতে লাগলেন। আমি অবাক হয়ে গেলাম; খতিবে আজম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের কোনো গ্রন্থই দেখলেন না, এমনকি বোখারি শরিফ পর্যন্ত তিনি একবারের জন্যও ক্লাস শুরু করার আগে দেখতে চাইলেন না। কোনো রেফারেন্স বুক ছাড়া এত দীর্ঘ সময় ধরে জ্ঞানমুগ্ধ আলোচনা তিনি কিভাবে করতে পারলেন! এটাই হলো খতিবে আজম রহ:-এর মুহাদ্দিসি যোগ্যতার শান’ (ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন সম্পাদিত ‘খতিবে আজম স্মারকগ্রন্থ’, চট্টগ্রাম, ২০২২)।

হক ও বাতিলের দ্বন্দ্ব নিয়ে তিনি বলেন, ‘এ যুগ ফিতনার, এ যুগ ফ্যাসাদের, এ যুগ সঙ্ঘাতের। সবচেয়ে বড় ফিতনা হচ্ছে হক ও বাতিলের সংমিশ্রণ। যার ফলে হক ও বাতিলকে পৃথক ও স্বতন্ত্র সত্তায় চেনা অনেকটা দুরূহ হয়ে পড়ছে। অনেক সময় বাতিলকে হকের পোশাকে পেশ করার অপচেষ্টা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এ ফিতনা সম্পর্কে অনেকটা বেখবর ও উদাসীন। ইসলামের বিরুদ্ধবাদী শক্তি কখনো প্রত্যক্ষভাবে অথবা কখনো সংগোপনে ফিতনাকে চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে ইন্ধন জুগিয়ে চলেছে, যাতে সাধারণ মানুষ হক ও বাতিলের এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য উপলব্ধি করতে না পারে। এ উপমহাদেশে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ অপপ্রয়াস চলে আসছে অব্যাহত গতিতে’ (আল্লামা কারি মুহাম্মদ তৈয়ব রহ: লিখিত ও ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন অনূদিত ‘মাসলাকে ওলামায়ে দেওবন্দ’, চট্টগ্রাম, ভ‚মিকা, পৃষ্ঠা-৬)।

ওলামায়ে দেওবন্দের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লামা বোখারী বলেন, ‘ওলামায়ে দেওবন্দের মতাদর্শ হচ্ছে ইমাম রব্বানি মুজাদ্দিদে আলফে সানী, শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী ও শাহ আবদুল আযীয দেহলভীর মত, পথ ও চিন্তাধারায় অনুরূপ; এক কথায় হুবহু প্রতিরূপ। ইসলামী ফিকাহ ও ইজতিহাদের গুরুত্ব বিবেচনা করে হজরত ইমাম আবু হানিফাকে ইমাম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সাথে সাথে ইলমে তাসাউফ ও ইলমে তাজকিয়াকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পন্থায়।

দারুল উলুম দেওবন্দের দীর্ঘদিনের মুহতামিম আল্লামা কারি মুহাম্মদ তৈয়্যব রহ: বলেন, ‘দারুল উলুম দেওবন্দ হচ্ছে ধর্মের ক্ষেত্রে মুসলিম; দল হিসেবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত; মাজহাব হিসেবে হানাফি; রুচি হিসেবে সুফি; মারিফাতের ক্ষেত্রে চিশতি বরং কাদেরিয়া, সোহরাওয়ার্দিয়া, নকশবন্দিয়া সিলসিলার অনুসারী; আকায়িদ হিসেবে মাতুরিদী; চিন্তাধারার ক্ষেত্রে শাহ ওয়ালিউল্লাহী; মৌলিক বিষয়াবলিতে কাছেমী; বিস্তারিত বিষয়াবলিতে রশিদী এবং নিসবাত হিসেবে দেওবন্দী’ (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৭)।

মৃত্যুকালে আল্লামা শাহ আবদুল হালিম বোখারী রহ:-এর বয়স হয়েছিল ৭৭। তিনি স্ত্রী, চার ছেলে, তিন মেয়ে এবং অসংখ্য ছাত্র ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হার্ট, কিডনি, ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন। তার ইন্তেকালে প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতারা তার রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। তার নামাজে জানাজা পটিয়ার ইতিহাসের স্মরণকালের বৃহত্তর সমাবেশের রূপ ধারণ করে। সর্বস্তরের বিপুলসংখ্যক মানুষ তার নামাজে জানাজায় শরিক হন এবং মাদরাসাসংলগ্ন মাকবারায়ে আজিজিতে দাফন করা হয়। এতে তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার পরিচয় মেলে। আল্লামা শাহ আবদুল হালিম বোখারী রহ: তার কর্ম, সাধনা ও কীর্তির মাঝে বেঁচে থাকবেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন এবং দারাজাত বুলন্দ করে দিন, আমিন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও গবেষক।
drkhalid09@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement