২৮ অক্টোবর ২০২০

সাংবাদিকতার মহীরুহ আতাউস সামাদ

আতাউস সামাদ
আতাউস সামাদ - ছবি : সংগৃহীত

বিমানে আমাকে দেখেই বাকরুদ্ধ কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি এখনো বেঁচে আছো?’ দিল্লি থেকে ঢাকা ১৪২ মিনিটের যাত্রায় বঙ্গবন্ধু সহকর্মী ও বন্ধুদের খোঁজ করেন। যশোরের মশিউর রহমানের হত্যার কথা শুনে ভেঙে পড়েন। তিনি আমার পেশায় নিয়োজিত নামগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। জানালাম, শহীদুল্লøাহ কায়সার, সিরাজউদ্দীন হোসেন, ডা. আবুল খায়ের, নাজমুল হক, নিজামউদ্দীন, ডা. ফজলে রাব্বী, আহাদ, সায়দুল হাসান, মামুন মাহমুদ, ডা. আলীম চৌধুরী চিরদিনের জন্য চলে গেছেন অথবা চলে গেছেন বলে অনুমান করা হচ্ছে। তার মুখ বিষণ্ন ও বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে।

১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত বাসস পরিবেশিত রিপোর্টে এটা সাংবাদিক আতাউস সামাদের বর্ণনা। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকালে একমাত্র সাংবাদিক হিসেবে দিল্লি থেকে তার সফরসঙ্গী ছিলেন আতাউস সামাদ। রিপোর্টে তিনি আরো লিখেন, ঢাকার আকাশে এলে বিমানবালা এসে বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘ইচ্ছে করলে এখন আপনি ঢাকা দেখতে পারেন।’ কিন্তু অনেক স্মৃতির ভিড়ে তিনি সে কথায় সাড়া দেননি। এরপর আমি তাকে বলি ‘বঙ্গবন্ধু আপনি এখন ঢাকা দেখতে পারেন’। সাথে সাথে তিনি বিমান থেকে দেখতে থাকেন তার প্রিয় শহর ঢাকা। এরপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি ঢাকায়, আমি আমার জনগণের মধ্যে ফিরে এসেছি!’

এমন ঐতিহাসিক সব ঘটনার সাক্ষী আতাউস সামাদের আজ তার মৃত্যুর দিন। ২০১২ সালের এই দিনে (২৬ সেপ্টেম্বর) তিনি আমাদের মাঝ থেকে চিরদিনের জন্য চলে যান। আমরা তাকে ভুলিনি। এ দিনে তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।

বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে মহীরুহ ছিলেন আতাউস সামাদ। সেই পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীন বাংলাদেশ- যত তোলপাড় করা ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে, সেসব ঘটনার তিনি জীবন্ত সাক্ষী ছিলেন। তিনি শুধু ঘটনার রিপোর্টই করেননি, ঘটনার বিশ্লেষণ করেছেন। ষাটের দশকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার শুনানি একজন রিপোর্টার হিসেবে আতাউস সামাদ শুধু কভারই করেননি, এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি চিরকুট বার্তা জেল থেকে নিয়ে গিয়ে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। সেই বার্তার পরিপ্রেক্ষিতেই মওলানা ভাসানী শেখ মুজিবকে মুক্ত করতে লাট ভবন ঘেরাও কর্মসূচি দেন এবং তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর রক্তচক্ষু এড়িয়ে আত্মগোপনে থেকে তিনি সাহসিকতার সাথে সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন। এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের ওপর বিবিসিতে তার রিপোর্ট এরশাদকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়। এ জন্য এরশাদ সরকার ১৯৮৭ সালে অকুতোভয় এই সাংবাদিককে গ্রেফতার করে। ১৫ দিন কারাবন্দী ছিলেন।

১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর, পতনের ঠিক আগ মুহূর্তে জেনারেল এরশাদ পদত্যাগের জন্য ১৫ দিন সময় চেয়ে একটি ফর্মুলা ঘোষণা করেছিলেন। এ সময় দুই নেত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা আত্মগোপনে ছিলেন। আত্মগোপন অবস্থা থেকেই বিবিসি থেকে খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎকার নেয়ার ব্যবস্থা করেন আতাউস সামাদ। খালেদা জিয়ার ফোন নম্বর বিবিসিকে সরবরাহ করেন তিনি। ফলে ঐতিহাসিক সাক্ষাতকারটি প্রচারিত হয়। বেগম জিয়া বলেছিলেন, ‘এরশাদকে এক্ষুণই, এই মুহূর্তে পদত্যাগ করতে হবে।’ এরপরই রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হাজার হাজার মানুষ বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়।

তার ছিল এক দরদী মন। সাধারণ মানুষের কল্যাণেই তিনি সবসময় প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। তার শিক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ভাষায়, ‘আতাউস সামাদ নিরপেক্ষ ছিলেন না। বস্তুনিষ্ঠ ছিলেন। জনগণের উপকারে, দেশের কল্যাণে বস্তুনিষ্ঠভাবে রিপোর্ট করেছেন।’

১৯৯৮ সালের দীর্ঘস্থায়ী বন্যার সময় প্রবীণ বয়সেও তিনি ঘরে বসে থাকতে পারেননি। বন্যাদুর্গত এলাকায় ঘুরে ঘুরে সরেজমিন রিপোর্ট করেছেন। প্রতিটি রিপোর্ট পাঠকের কাছে হৃদয়গ্রাহী ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে রিপোর্টের যথার্থতা যাচাই করার জন্য যতগুলো সূত্র আছে সব জায়গায় তিনি ধর্ণা দিতেন। রিপোর্টে তথ্যের গরমিল একেবারেই পছন্দ করতেন না।

একবার রাজশাহী গিয়ে পদ্মার জীর্ণদশা দেখে শুধু মর্মাহতই হননি, সফরসঙ্গী ফটো সাংবাদিককে দিয়ে শুকনো পদ্মার ধু-ধু বালুচরের অসংখ্য ছবি তুলিয়ে এনেছিলেন। ঢাকায় আমার দেশ অফিসে এসেই তিনি আমাকে ডেকে বললেন, পুরো একটি পাতাজুড়ে ছবি দিয়ে পদ্মার এই মরে যাওয়ার কাহিনী ছাপতে হবে। পাতাটির নামও তিনি দিয়েছিলেন ‘চারিদিকে দেখ চাহি’। পাতাটি খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।

আমার দেশ নিয়ে আলোড়ন তুলতে একবার সামাদ ভাইয়ের চিন্তায় ‘মা দিবস’ পালনের জন্য গুলশান মাঠে একটি কনসার্ট হয়েছিল। ওই কনসার্টে দেশবরেণ্য সব শিল্পী মাকে নিয়ে গান গেয়েছিলেন। মা দিবসে আমার দেশ অফিসে এক গোলটেবিলে মাকে নিয়ে বিশিষ্টজনদের স্মৃতিচারণ শুনে বিশেষ করে শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর স্মৃতিচারণ শুনে শিশুর মতো তিনি অঝোরে কেঁদেছিলেন। ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে ক্লাব চত্বরে আমরা তাকে সম্মাননা জানিয়েছিলাম। ভাবী, ছেলে সন্তু ও নাতি এবং মেয়ে শান্তাকে নিয়ে তিনি ক্লাবে এসেছিলেন। ভীষণ খুশি হয়েছিলেন।

আমার দেশের উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে ৭৫ বছর বয়সে এসেও লেখালেখির বিষয়ে তাকে ক্লান্ত হতে দেখিনি। শরীরের নানা ধরনের অসুস্থতা নিয়েও সপ্তাহে তিনি অন্তত চারটি উপ-সম্পাদকীয় লিখতেন। এ লেখাগুলো আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ছাপা হতো। বাংলায় চারটি উপ-সম্পাদকীয় ছাড়াও হলিডেতে নিয়মিত ইংরেজিতে একটি কমেন্ট্রি লিখতেন তিনি।

সেই ১৯৫৭ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি লিখেই গেছেন। অ্যাপোলো হাসপাতালের বেডে জীবনের শেষ মুহূর্তে আমার দেশ রিপোর্টারকে দেয়া সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি আমার জীবন নিয়ে পরিতৃপ্ত। আমার কোনো আফসোস নেই। পরিবারকে নিয়ে আমি খুব সুখী ছিলাম।’ বাংলাদেশ অবজারভার, বাংলাদেশ টাইমস, বাসস, বিবিসি, দৈনিক আমার দেশ, এনটিভি, হলিডে এমন অনেক মিডিয়ায় তিনি কাজ করেছেন। বিবিসির সংবাদদাতা হিসেবে তিনি ছিলেন সর্বাধিক আলোচিত সাংবাদিক। ‘সাপ্তাহিক এখন’ নামে একটি পত্রিকা তার সম্পাদনায় বের হতো। এর বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে তিনি শিক্ষকতাও করেছেন। তার বেশির ভাগ লেখাই ইংরেজিতে। তবে ১৯৯১ সালের পর সাপ্তাহিক যায়যায়দিন পত্রিকা ফের প্রকাশিত হলে সেখানে তিনি বাংলায় লেখা শুরু করেন। এরপর বাংলায় তার অসংখ্য লেখা বের হয়েছে। আমার সৌভাগ্য এমন একজন মানুষ, এমন একজন সম্পাদক এবং সাংবাদিকের সাথে দীর্ঘদিন কাজ করেছি।

একটা বই বের হলে রেণু খুশি হবে
তার লেখা দিয়ে অনেকগুলো বই বের করা যায়। কিন্তু তার বইয়ের সংখ্যা খুবই কম। কেন বই করছেন না বললেই তিনি বলতেন, ‘ও কাজ আমাকে দিয়ে হবে না’। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত তার বই ‘একালের বয়ানে’ তিনি এ নিয়ে লিখেছেন, ‘আমার বউ রেণু, মনে করে, আমার অবশ্যই বই লেখা উচিত। ওর এমন ভাবার কারণ, ও ২৮ বছর ধরে দেখে আসছে, আমি প্রায় প্রতিদিন টাইপরাইটার নিয়ে খটখট করছি। বিয়ের পর প্রথম দিকে প্রায়ই কথা দিয়েও মাঝরাতের আগে অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে পারতাম না কাজের চাপে। তখনো সে অফিসে ফোন করলে ওই টাইপরাইটারের আওয়াজই শুনতে পেত।’ রেণুর কথা হলো ‘এতই যদি দেখো আর শোনো আর রিপোর্ট করো, তাহলে বই লিখতে পারবে না কেন?’ যায়যায়দিনে ‘একালের বয়ানে’ প্রকাশিত লেখা নিয়ে বই হয়। এ বই প্রসঙ্গে তিনি লেখেন ‘ইউপিএলের মহিউদ্দিন ভাই আমাকে গ্রন্থকার করে ফেললেন। একদিন ফোন করে বললেন, তিনি আমার কিছু বয়ান একত্র করে পড়ে দেখেছেন, এগুলো এখন একসাথে বই হিসেবে প্রকাশ করা যায়। আমি একবাক্যে রাজি হয়ে গেলাম। কারণ আমার একটা বই বের হলে রেণু খুশি হবে।’

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব


আরো সংবাদ