২৬ মে ২০২০

মোকারিম ভাইয়ের সাথে শেষ দেখা

মোকারিম
মেজর (অব:) অধ্যাপক ডা: আবুল মোকারিম মো: মহসিন উদ্দিন - সংগৃহীত

বছরখানেক আগে পুত্রতুল্য এক কিডনি চিকিৎসককে ফোন করেছিলাম। পুত্রতুল্য বললাম এ কারণে যে, সে আমার এক বন্ধুর ছেলে। সে আমার স্বাস্থ্য জটিলতার সব বিবরণ শুনে হেসে বলল, আপনিও তো দেখি আমার বাবার মতো বুড়ো হতে চান না। আসলে বুড়ো যে কে হতে চায় তা জানি না। কিন্তু বুড়ো তো হয়ে যাচ্ছি। তাকে বললাম, আমার যে কিডনি রোগ তা সারানোর কোনো উপায় আছে? সে বলল, এটা সারানোর কোনো কায়দা নেই।

এই তরুণ ডাক্তার আরো বলল, ধরুন আপনি আজ কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, কিন্তু এমনও তো হতে পারত, আপনি ডায়াবেটিস, লিভার বা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। আসলে বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে মানবদেহের এসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষয় হতে থাকে। এভাবেই জীবন একসময় শেষ প্রান্তে পৌঁছে যায়। ছেলেটি বয়সে তরুণ কিন্তু সত্যিকার অর্থে সে এমন একটি শিক্ষা দিলো, যা ভোলার নয়। তখন থেকেই মনে হয়, শরীরের অঙ্গগুলো ক্ষয় তো হতেই থাকবে। কিন্তু সে ক্ষয় কতটা কমানো যায় প্রবীণদের সে চেষ্টাই করা উচিত। আমার সে চেষ্টাই এখন চলছে।

আমাদের বয়সের মানুষজন বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হই এবং সেটি খুবই স্বাভাবিক। বাইরে যখন বের হই, সব সময় তখন আমরা রোগের কথা আলোচনা করি না। কিন্তু কখনো কখনো বন্ধুজন, স্বজন বা চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করি। চিকিৎসকের কাছে তো লুকানোর কিছু নেই। তার কাছে সব কথাই প্রকাশ করতে হয়। সব কথাই তাকে জানাতে হয়। সেভাবেই দীর্ঘকাল চিকিৎসা করে আসছি এবং আল্লাহর রহমতে মোটামুটি ভালোই চলছি।
কিন্তু এখন করোনাকাল। যে দিকেই যাবেন একটিই প্রশ্ন, করোনার কী হবে? একটিই উত্তরÑ সতর্ক থাকুন, ঘর থেকে বেরোবেন না। সবাই পরামর্শ দিতে চান, সোশ্যাল ডিসট্যান্স মেনে চলেন। একজন থেকে আরেকজন তিন ফুট দূরত্বে দাঁড়াবেন। গারগেল করেন, গরম পানি পান করুন, আরো নানা কথা।

এর মধ্যেই দেশে যখন প্রথম করোনা দেখা দিলো, তখনই ঘটল বিপর্যয়। সরকার করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি হিসেবে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করল। এরপর একসাথেই প্রায় সব কিছু বন্ধ হয়ে গেল। ক্লিনিক বা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের দ্রুত অনুপস্থিতি লক্ষ করা গেল। এসব চিকিৎসকের কাছে হয়তো শত শত রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করতেন। রোগীরা নিয়মিত তাদের কাছে পরামর্শ নিতে যান। কিন্তু দেখা গেল হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো সম্পূর্ণ ডাক্তারশূন্য হয়ে পড়ল। কিংবা যারা দায়িত্ব পালন করবেন তারাও রোগীদের ভয় পেতে থাকলেন এবং রোগীদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করলেন। এমনও ঘটল যে, খুব বন্ধুস্থানীয় চিকিৎসকও আর ফোনকল রিসিভ করছিলেন না। এভাবে শুধু আমিই নই, হয়তো আমার মতো হাজার হাজার রোগী বিপন্ন হয়েছেন। কিন্তু চিকিৎসার কী হবে? শুধু করোনাই নয়, এর বাইরে কারো হৃদরোগ বা চক্ষুরোগ রয়েছে, লিভারের বা কিডনির জটিলতা রয়েছে। এভাবে নানা সমস্যায় ভুগছে মানুষ। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর কার্যত অন্য ধরনের রোগীদের চিকিৎসা এক ধরনের অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। ফলে বিপন্ন হয়ে পড়ছিল সাধারণ মানুষের জীবন। ডাক্তাররা চেম্বারে আসছিলেন না, অব্যাহতভাবে তারা ছিলেন অনুপস্থিত। সে রকম একটি সময় একদিন আমার মনে হলো আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়েছে।

এপ্রিলের মাঝামাঝিতে আমি এক বিকেলে ইবনে সিনা ইমেজিং সেন্টারে হাজির হলাম। সেখানে কৌতূহলবশত খুঁজলাম কোনো ডাক্তার উপস্থিত আছেন কি না। আসলে কিডনির রোগীদের এর সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক জটিলতা দেখা দেয়। যেমনÑ কিডনি রোগীদের হাড় ক্ষয়ের রোগ হয়। এরকম সময়ে আমি মনে করলাম, এ ধরনের কোনো চিকিৎসক উপস্থিত আছেন কি না। কিন্তু দেখলাম এ ধরনের ডাক্তার নেই। কিন্তু একজন ডাক্তার আমাকে মুগ্ধ করলেন। তিনি উপস্থিত ছিলেন না এবং চেম্বারে উপস্থিত হবেন না বলে জানিয়ে রেখেছিলেন। তবে তিনি একটি টেলিফোন নম্বর দিয়ে বলেছিলেন, এখন থেকে এই নম্বরে বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত তার পরামর্শ নেয়া যাবে। ওই মুহূর্তে সেটি ছিল আমার কাছে আপ্লুত হওয়ার মতো ঘটনা। তখন আমি খোঁজ নেয়া শুরু করলাম যে, ডাক্তারের ফি কিভাবে দেবো। একপর্যায়ে জানতে পারলাম, তিনি ফি নিচ্ছেন না। তিনি হলেন কিডনি হাসপাতালের প্রফেসর আইয়ুব আলী চৌধুরী। পরে রক্ত দিয়ে বের হয়ে আসতেই দেখা হলো মোকারিম ভাইয়ের সাথে।

মোকারিম ভাইয়ের সাথে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে পরিচয়। তিনি একজন অমায়িক ও সদাহাস্য ব্যক্তি। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধাও। ফলে তার সাথে আমার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। চিকিৎসাসংক্রান্ত যেকোনো কাজ নিয়ে গেলে তিনি দ্রুত সব কিছুর ব্যবস্থা করে দিতেন। সে সাথে আমার অন্য কোনো ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন হলে তারও ব্যবস্থা তিনি করে দিতেন। সেখানে আমাকে অপেক্ষা করতে হতো না, মোকারিম ভাইয়ের কথা অনুযায়ী ডাক্তার আমাকে দেখে দিতেন। এভাবে তার সাথে এমন সম্পর্ক হয়েছিল যে, যেকোনো কাজে ইবনে সিনায় গেলে মোকারিম ভাইয়ের সাথে দেখা না করে আসতাম না। তার চেম্বারে একবার ঢুঁ দিয়ে আসতাম মোকারিম ভাই আছেন কি না।

কিন্তু সে দিন আমি একটু বিস্মিত হলাম, চট করেই তার সাথে দেখা হলো ৯/এ ইবনে সিনা ইমেজিং সেন্টারে। তিনি আমাকে দেখে চমকে উঠলেন। তার মুখেও মাস্ক পরা, আমার মুখেও মাস্ক পরা। তিনি বললেন, বিকেলে কেন আপনি এখানে এসেছেন। আমি বললাম, নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার জন্য এসেছি ডাক্তার আসছেন কি না খোঁজ নিতে। তিনি বললেন, শরীরে কোনো সমস্যা অনুভব করছেন কি না। আমি বললাম, হাড় ক্ষয়ের কারণে ব্যথার যে সমস্যা ছিল, সেটিই কষ্ট দিচ্ছে। নতুন করে আর কোনো জটিলতা দেখা দেয়নি। এ কথা শুনে তিনি বললেন, তাহলে আপনি এখনই বাসায় ফিরে যান। সে সময় আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি যে, কেন তিনি আমার সাথে এভাবে কথা বলছেন। সাধারণত তিনি যে ভাষায় কথা বলেন, সে দিন তার কথার মধ্যে সে রকম মাধুর্য লক্ষ করিনি; বরং তার কথায় উদ্বেগ ও ভীতি ছিল। তিনি আর একবার জোর করে বললেন, এখনই বাসায় চলে যান। আমি ভেবেছিলাম তার সাথে কয়েক মিনিট কথা বলব। এর কয়েক দিন পরই গত ২ মে তিনি করোনা আক্রান্ত হয়ে ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু সে সংবাদ আমার জানা ছিল না। সেখানে তার পরিস্থিতির অবনতি হলে ৪ মে তাকে সিএমএইচএ ভর্তি করা হয় এবং ২২ মে তিনি ইন্তেকাল করেন। মেজর (অব:) অধ্যাপক ডা: আবুল মোকারিম মো: মহসিন উদ্দিন ছিলেন ইবনে সিনা হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগের প্রধান। শুনেছি ৬৫ বছর বয়সী খ্যাতিমান চিকিৎসক মোকারিম ভাইয়ের করোনাভাইরাসে ফুসফুস মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

মোকারিম ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ শোনা আমার জন্য ছিল একটি বেদনাদায়ক ঘটনা। এ হাসপাতালের সদা হাস্যময় সবসময় যিনি আমাকে সহযোগিতা করেছেন, আমাকে সুস্থ থাকার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করেছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন; তার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে মনে হলো আমি একজন আপন মানুষকে হারালাম। চিকিৎসার পরামর্শের জন্য তাকে আর ফিরে পাবো না। তার মৃত্যুতে আমি শোকাহত। আমি দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাকে বেহেশত নসিব করেন এবং তার পরিবারের আক্রান্তদের আল্লাহ যেন সুস্থতা দান করেন।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

[email protected]


আরো সংবাদ