০৩ জুন ২০২০

প্রতিভা মেধা ও মূল্যবোধ

-

প্রাচীন রোমে পৌরাণিক উপকথায় ‘প্রতিভা’কে পথপ্রদর্শনের আত্মিক দেবতা মনে করা হতো। সম্রাট অগাস্টাসের সময়ে শব্দটিকে উদ্দীপনা ও মেধা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বস্তুত ‘প্রতিভা’ ব্যক্তির অসাধারণ সৃজনীশক্তি, ব্যতিক্রমী বুদ্ধিমত্তাবিশিষ্ট গুণাবলির সুসমন্বয়। এসব গুণাবলির অধিকারীরাই প্রতিভাবান বলে বিবেচিত হন। ‘মেধা’ একটি বিশেষ গুণ বা দক্ষতাবিশেষ যা দ্রুত আয়ত্ত বা শেখার সক্ষমতা অর্জনে সাহায্য করে। একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি খুবই সৃজনশীল এবং অসম্ভব মনে হয় এমন সব কাজ করতে সক্ষম। বস্তুত, প্রতিভা বা মেধার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও একেবারে আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই।

প্রতিভা ও মেধা মানুষের বিশেষ গুণ। এসব গুণে গুণান্বিতদের হাতেই ন্যস্ত থাকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কাজের নিয়ন্ত্রণ ভার। ব্যক্তির প্রতিভা, মেধা ও যোগ্যতা তখনই মানুষের জন্য কল্যাণকর ও ইতিবাচক হয় যখন এসবের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সততা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটে। কারণ, মূল্যবোধহীন প্রতিভা ও মেধা ফলহীন বৃক্ষের মতোই। এ প্রসঙ্গে একজন রাজনীতিকের বক্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি এক নির্বাচনী জনসভায় যা বলেছিলেন তার নির্যাসটা হলো, যোগ্য লোক নয়; মূল্যবোধসম্পন্ন লোককে ভোট দেবেন। যোগ্য অথচ অসৎ লোক নির্বাচিত হলে মানুষের সাথে তারা প্রতরণাও করবেন যোগ্যতার সাথে। কিন্তু তা বোঝার কোনো উপায় থাকবে না। তাই যোগ্যতার চেয়ে সততাকে গুরুত্ব দিন। আর যোগ্যতার সাথে সততা আর মূল্যবোধের সমাহার ঘটলে তবে তা হবে ‘সোনায়-সোহাগা’।

কথাটা নব্বইয়ের দশকের হলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ঘটনাপ্রবাহ তার এই কথার যথার্থতা প্রমাণ করে। কারণ, প্রতিভা আর মেধার সাথে সততা ও মূল্যবোধের সমন্বয় না থাকায় আমাদের দেশে প্রতিনিয়তই অনেক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে। আর তা ক্রমবর্ধমান। অবক্ষয়ের জয়জয়কারের কারণেই শুধু প্রতিভা বা মেধা দিয়ে দেশ, জাতি ও মানবতা উপকৃত হতে পারছে না। আমাদের দেশে প্রতিভাবান ও মেধাবীর তেমন একটা অভাব না থাকলেও সততা, নিষ্ঠা, কর্তব্যপরায়ণতা ও মূল্যবোধ চর্চার দুর্ভিক্ষটা রীতিমতো চোখে পড়ার মতো। যা এখন আমাদের জন্য বড় বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।

এই মহাদুর্ভিক্ষের বলি হতে হয়েছে বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে। ফাহাদ একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হলেও অপর মেধাবীদের মধ্যে মূল্যবোধের চর্চা না থাকায় গত বছর তারই মেধাবী ও প্রতিভাবান সহপাঠীরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। এমনকি তাদের এই অপকর্ম ঢাকার জন্য তারা নিজেদের যোগ্যতা, মেধা ও প্রতিভাকে নানাভাবে কাজে লাগিয়েছে। এতে প্রমাণ হয় প্রতিভা, মেধা ও যোগ্যতা তখনই ইতিবাচক হতে পারে যখন এসব গুণাবলির সাথে মূল্যবোধের সুসমন্বয় ঘটবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিচ্যুতি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রচারকে রীতিমতো অস্থির ও অশান্ত করে তুলেছে। আমরা মেধাবীদের হাতে গুরু দায়িত্ব তুলে দিলেও মাত্রাতিরিক্ত অবক্ষয়, সততার অনুপস্থিতি ও মূল্যবোধের বিচ্যুতির কারণে তা আমাদের জন্য ফলদায়ক হতে পারছে না। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই মেধাবীরা দায়িত্ব পালনে মূল্যবোধের চর্চা তো দূরের কথা বরং তারা ক্ষেত্র বিশেষে বিবেকের সাথেও বিশ্বাসঘাতকতায় লিপ্ত হচ্ছেন। ফলে সাধারণ মানুষ শুধু অধিকার বঞ্চিতই হচ্ছেন না বরং তারা অনেক ক্ষেত্রে নিপীড়নেরও শিকার হচ্ছেন।

মূলত মানুষের প্রাণশক্তি হচ্ছে ‘বিবেক’। বিবেককে সবচেয়ে বড় আদালত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষ যখন বিবেকহীন হয়ে পড়ে তখন তার আর ইতরপ্রাণীর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। সঙ্গত কারণেই বিবেকহীন মানুষ অন্য প্রাণিকুলের থেকেও হিংস্র হয়ে উঠতে পারে। ইতর প্রাণী যখন শুধু নিজের আহার সংগ্রহের জন্য হিংস্রতা দেখায়, বিবেকহীন মানুষ তখন শুধু নিজের উদরপূর্তির জন্য নয় বরং হিংসা-বিদ্বেষ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, আত্মপুঁজা ও ক্ষমতার অহমিকা প্রদর্শনের জন্য বিবেক বিসর্জন দিয়ে বসেন। রক্ষক পরিণত হন ভক্ষকে। যার সর্বসাম্প্রতিক প্রমাণ হচ্ছেন সদ্য প্রত্যাহারকৃত কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দীন, সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এস এম রাহাতুল ইসলাম।

এসব প্রশাসনিক কর্মকর্তা তাদের অনৈতিক কাজ নির্বিঘœ করতেই একজন সাংবাদিকের সাথে যে আচরণ করেছেন তা ব্যুরোক্রেসির দুষ্টক্ষত হয়ে চিহ্নিত থাকবে দীর্ঘদিন। অথচ অভিযুক্তরা প্রত্যেকেই মেধাবী ও প্রতিভাবান। শুধু সততার অভাব ও মূল্যবোধের বিচ্যুতির কারণেই এসব আমলা পুরো ব্যুরোক্রেসিকেই জনগণের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ছেড়েছেন। ফলে পুরো জনপ্রশাসনই এখন রীতিমতো অস্বস্তিতে পড়েছে।জনপ্রশাসনের দায়িত্ব সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালনে সরকারকে সহযোগিতা করা। আর এই মহতী কাজ যাতে যোগ্যতা ও দক্ষতার সাথে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা পালন করতে পারেন সে জন্য অধিকতর প্রতিভাবানদেরই গণপ্রশাসনের জন্য বাছাই করা হয়। পাবলিক সার্ভিস কমিশন বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মেধাবীদের বাছাই করে জনপ্রশাসন কর্মকর্তা। কিন্তু এসব নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধা ও যোগ্যতা যাচাই করা হলেও সততা, নৈতিকতা, পারিবারিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ বিবেচনায় আনা হয় না বরং ক্ষেত্রবিশেষে প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় আনা হয়। আর সে ছিদ্রপথেই অসাধু, অসৎপ্রবণ ও মূল্যবোধহীন ব্যক্তিদের বৃহৎ একটি অংশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে পুরো প্রশাসনব্যবস্থাকেই বিতর্কিত ও বিকল করে তোলে। আর এসব কর্মকর্তার অধঃপতন হতে হতে তারা একেবারে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিকতা ও শিষ্টাচারও হারিয়ে ফেলেন। যার জ্বলন্ত প্রমাণ যশোর জেলার মনিরামপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইয়েমা হোসেন।

জানা গেছে, চলমান করোনা পরিস্থিতিতে মুখে মাস্ক ব্যবহার না করায় এই জুনিয়র সরকারি কর্মকর্তা পিতৃতুল্য তিনজন বৃদ্ধকে কান ধরে ওঠবস করিয়েছেন। যা সবমহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। এমনকি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও এটিকে গর্হিত ও অগ্রহণযোগ্য বিবেচনায় তাৎক্ষণিক এই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী অফিসার ইতোমধ্যেই লাঞ্ছিতদের সাথে দেখা করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন। সাইয়েমা হোসেনের পক্ষ হয়ে ক্ষমা চেয়ে তারই এক ব্যাচমেট ফেসবুকে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাসও দিয়েছেন। প্রশাসনের আরো এক সিনিয়র কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে এ ঘটনার জন্য ক্ষমাও চেয়েছেন বলে সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে প্রমাণ হয় সাইয়েমা কাণ্ডে জনপ্রশাসনের বড় ধরনের সম্মানহানির ঘটনা ঘটেছে।

সততা না থাকলে প্রতিভা বা মেধা যে একেবারেই মূল্যহীন তার যথার্থ প্রমাণ এসি (ল্যান্ড) সাইয়েমা হোসেন। যতটুকু জানা যায়, তিনি তার একাডেমিক ক্যারিয়ারে ছিলেন প্রচণ্ড মেধাবী। বিসিএস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেছিলেন এই মেধাবিনী অফিসার। কিন্তু এই প্রতিভা, মেধা ও যোগ্যতার সাথে সততা, মূল্যবোধ ও আত্মপরিচয়ের সমন্বয় না ঘটায় করোনাভাইরাস রোধে চলাচল সীমিত রাখার সরকারি আদেশ পালন করতে গিয়ে তিনি পিতৃপ্রতিম বৃদ্ধদের কান ধরে ওঠবস করিয়ে নিজের আদর্শিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করেছেন। এতে তিনি শুধু ক্ষমতার অপব্যবহার ও শিষ্টাচারের লঙ্ঘনই করেননি বরং রাষ্ট্রীয় সংবিধানেরও গুরুতর লঙ্ঘন করেছেন। আমাদের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'No person shall be subjected to torture or to cruel, inhuman, or degrading punishment or treatment.' অর্থাৎ কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না কিংবা কারো সাথে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না।বিষয়টিকে কেউ কেউ কাকতালীয় বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলার চেষ্টা করলেও তা মোটেই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং একশ্রেণীর অতিদাম্ভিক সরকারি কর্মকর্তা প্রায়ই এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন। গত বছর সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সঞ্চিতা কর্মকারকে এক মাছ বিক্রেতা দিদি সম্বোধন করায় তিনি তাকে লাথি দিয়ে ড্রেনে ফেলে দিয়েছিলেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। আর সাইয়েমা তো নিজ হাতেই বৃদ্ধদের কান ধরতে বাধ্য করেছিলেন। কিন্তু কুড়িগ্রামের সদ্য সাবেক হওয়া আরডিসি নাজিম উদ্দীন নিজ হাতেই বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধার ঘাড় ধরে টেনে হিঁচড়ে নাজেহাল করেছিলেন।

যার ভিডিও ও স্থিরচিত্র এখনো রয়েছে। এমনকি সম্প্রতি করোনাভাইরাস রোধে চলাচল সীমিত রাখার সরকারি আদেশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাস্তায় কাউকে পেলে কান ধরে ওঠবস করানো, লাঠিপেটা করা, মাটিতে গড়াতে বাধ্য করার মতো বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা গেছে। যা সীমালঙ্ঘন হিসেবেই মনে করছেন অভিজ্ঞমহল। আর সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবেলায় দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশসহ দায়িত্বপ্রাপ্তদের সাধারণ মানুষের সাথে বিনয়ী, সহিষ্ণু ও পেশাদার আচরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এসব কর্মকর্তাকে নিয়োগের সময় যদি যোগ্যতার পাশাপাশি তাদের সততা, মূল্যবোধ ও পারিবারিক ঐতিহ্য বিবেচনায় আনা হতো তাহলে হয়তো আমাদের এই বিড়ম্বনা পোহাতে হতো না।উপসংহারে এ কথা বলা যায়, আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিভাবান ও মেধাবী উপহার দিতে পারলেও সততা ও মূল্যবোধের মানদণ্ডে এসব প্রতিভাবান মোটেই উত্তীর্ণ হতে পারছেন না। মূলত আমাদের দেশের শিক্ষা কারিকুলামে নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ উপেক্ষিত হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ভাবার অবকাশ অবশ্যই থেকে যাচ্ছে। 

[email protected]


আরো সংবাদ