০১ জুন ২০২০

করোনা আর্থসামাজিক নীরব বিপ্লবের সুযোগ সৃষ্টি করেছে

করোনা আর্থসামাজিক নীরব বিপ্লবের সুযোগ সৃষ্টি করেছে - সংগৃহীত

করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা বহু যুগে দেখা যায়নি। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি অনুজীব আজ মানব সভ্যতাকে বিপন্ন করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত আমার ছেলে একজন ছোঁয়াচে রোগ বিশেষজ্ঞ। কয়েক দিন আগে সে আমাকে একটি দীর্ঘ ই-মেইল পাঠায়। সে আমাকে ও তার মাকে কোয়ারেন্টিনে থাকার ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়। কেউ যেন আমাদের কাছাকাছি না আসে।

আমরা দু’জনই প্রবীণ। আমাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে টেলিফোন করে আমার মেয়েও একই পরামর্শ দেয়। সে একজন হেলথ ইকোনমিস্ট। আমার সাবেক এক ছাত্র, যে পরে কিং আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটিতে আমার সহকর্মী হয়েছিল, মেইলে করোনাভাইরাস নিয়ে বিশাল এক প্রতিবেদন আমাকে পাঠায়। এর মানে হলো দুনিয়াজুড়ে এখন করোনাভাইরাস ছাড়া আর কোনো কথা নেই, আলোচনা নেই। কারণ এর কোনো প্রতিষেধক নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নানা রকম সতর্কতা অবলম্বনই এখন পর্যন্ত এ রোগের প্রতিরোধক। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় অনেক দেশ লকডাউন করা হয়েছে। মৃতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। ইতালির কথা না হয় বাদই দিলাম। ইউরোপের অনেক দেশই আজ বিপর্যস্ত এই ভাইরাসের কারণে।

এতসব উদ্বিগ্ন মুখ দেখে ও মিডিয়াজুড়ে প্রতিবেদন পড়ে ও আলোচনা শুনে আমার প্রথমেই মনে হয়েছে, আজকে মানব সভ্যতার এই বিপন্ন অবস্থার জন্য আসলে আমরা মানুষরাই দায়ী। পৃথিবীতে বহু সভ্যতা এসেছে। বহু সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই ভাইরাস কি সভ্যতা বিলুপ্তির একটি উপলক্ষ? ইউরোপে সফরকালে রোমান সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। আমি অবাক বিস্ময়ে সেগুলো দেখেছি। বাংলাদেশেও তো অনেক প্রাচীন সভ্যতা ছিল। আমাদের বগুড়াও একসময় বৌদ্ধ সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্রভূমি ছিল। এখন তা মাটির নিচে চলে গেছে।

করোনাভাইরাস নিয়ে উদ্বেগজনক নানা খবর জেনে অর্থনীতির একজন সামান্য ছাত্র হিসেবে আমার মনে এই ভাইরাসের ফলে ইতোমধ্যে আমাদের যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে ওঠার চিন্তাটিই ঘুরপাক খাচ্ছিল। মানুষকে ঘরের মধ্যে থাকার পরামর্শ দেয়া, হোম কোয়ারেন্টিন বা লকডাউন যাই বলি না কেন, এর জন্য তো অর্থনীতির বিপুল ক্ষতি হচ্ছে। সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার উপায় কী? শুনলে অনেকে অবাক হবেন যে, আজকের পরিস্থিতিতে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের মতো বিপুল ক্ষমতাধর অর্থনৈতিক মাফিয়া, যারা মানুষের কাছ থেকে সম্পদ শুষে নিতে অভ্যস্ত, তারা পর্যন্ত সুদের হার শূন্য করে দিয়েছে। বিনা সুদে বিনিয়োগের জন্য ঋণ দিতে বাধ্য হয়েছে। তবে এটি যে সাময়িক সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। যে দিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার শূন্য করার ঘোষণা দেয়, সে দিন আমার ছেলে ই-মেইলে কিছুটা রসিকতা করে লিখে যে ‘ফেডারেল রিজার্ভ এখন পুরোপুরি ইসলামিক শরিয়াহ কম্পøায়েন্স’ হয়ে গেছে।

অর্থনীতিকে সত্যিকার অর্থে কল্যাণমুখী করতে হলে বিনা সুদে বা নামমাত্র সার্ভিস চার্জে ঋণ দেয়ার কথা আমি আজ থেকে পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় আগে আমার বইতে লিখেছিলাম। সেখানে বলেছি, এ ধরনের মহা অর্থনৈতিক দুর্যোগ দেখা দিলে শূন্য সুদে ঋণ দানের ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যক্তির বেকারত্ব লাঘব, শিল্পের উৎপাদনশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্যই এটা করতে হবে। এর জন্য অনুৎপাদনশীল অবস্থায় পড়ে থাকা সম্পদ কাজে লাগাতে হবে। জীবদ্দশায় নিজের চিন্তাধারাটি বাস্তবায়ন হতে দেখা আমার জন্য অবশ্যই খুশির বিষয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারকেও আমি বলব ক্ষতি কাটিয়ে উঠে অর্থনীতিকে আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ‘শূন্য’ সুদে বা এক-দুই শতাংশ সার্ভিস চার্জ নিয়ে ঋণ বিতরণের ব্যবস্থা করতে। শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমেও ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের কাছে এই ঋণ পৌঁছে দিতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। বিশ্বের সব দেশের জন্যই এই পরামর্শ। আমার আজীবনের প্রচেষ্টা ছিল অর্থনীতিকে কল্যাণমুখী করা। ইসলামী অর্থনীতি যে এই কল্যাণমুখিতার সন্ধান দেয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের দেশে আজ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নামে যা চলছে, তা পরিপূর্ণ নয়। এর জন্য পার্লামেন্টে যে আইন পাস হওয়া দরকার ছিল সেটা হয়নি। এখন সময় এসেছে, আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্যারাডাইম চেঞ্জ বা আমূল পরিবর্তনের।

প্রধানমন্ত্রী বুধবার জাতির উদ্দেশে ভাষণে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছেন। এগুলোকে আমার অপ্রতুল মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, আমাদের অর্থনৈতিক নীতিপ্রণেতাদের ভিশনের ঘাটতি রয়েছে। তারা অর্থনীতির মূল শেকড়টিই ধরতে পারছেন না। এটা যেন সাধারণ ঘায়ের মলম দিয়ে ক্যান্সারের ক্ষত নিরাময়ের চেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্রের বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান সারা বিশ্বে তাদের শাখাগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখে মনে হয় তিনি কী করবেন বুঝতে পারছেন না। কখনো চীনকে কখনো অন্যকে দোষ দিচ্ছেন। তিন মাস সুদ দেয়া লাগবে না, আয়কর কমানো, প্রণোদনা দেয়া, এগুলো হলো প্রান্তিক পরিবর্তন। করোনাভাইরাসের আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠে ভবিষ্যতে এমন ক্ষতি এড়াতে প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন। সে ধরনের পরিবর্তনের কথাটি কারো মুখে শুনছি না।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণে জনগণকে সচেতন হতে ও সতর্ক থাকতে বলেছেন, এ জন্য তাকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এটি যথেষ্ট নয়।
আতঙ্কিত মানুষের আতঙ্ক দূর করতেই বিনা সুদে বা এক-দুই শতাংশ সার্ভিস চার্জ নিয়ে তাদের কর্মসংস্থানে সহায়তার কথা আমি বলেছি। অর্থমন্ত্রণালয় অর্থের সংস্থান করবে। এরপর ইসলামিক ও অন্যান্য ব্যাংকের কনসোর্টিয়াম করে এই অর্থ বিতরণ করতে হবে। বিতরণকৃত অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্যও কঠোর শর্ত আরোপ করতে হবে।
পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক গণসংযোগ চালাতে হবে। আমাদের সামনে যে মহাবিপর্যয় অপেক্ষা করছে সে বিষয়ে আমাদেরকে এখনই সচেতন হতে হবে। যে ঝড় আসছে তা যদি আমরা আগেভাগে বুঝতে না পারি তা হলে সেই ঝড়ের কবলে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবো।

ছেলেবেলায় ঝড়ের সময় আম কুড়াতে যেতাম। তখন দেখেছি, ঝড়ে ছোট ছোট পাখি মারা যাচ্ছে। পাশাপাশি দেখতাম, কিছু পাখি অনেক উপরে ডানা মেলে উড়ছে। সেগুলোকে ঝোড়ো হাওয়া কিছু করতে পারছে না। মাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছিলেন, ঈগল। বড় হয়ে জেনেছি, বৈজ্ঞানিকভাবেই প্রমাণিত যে ঈগল পাখি আগেই ঝড়ের আভাস পায়। ঝড়ের আভাস পেলেই সে আর মাটির কাছাকাছি না থেকে আকাশের অনেক উঁচুতে উঠে যায়। ফলে ঝড় ওকে কাবু করতে পারে না।
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ দেখা দিতে পারে আশঙ্কা করে ১৯৯৮ সালের দিকে আমি সোস্যাল ইসলামিক ব্যাংকে চেয়ারম্যান থাকাকালে ‘সবুজ হাট প্রকল্প’ নামে সারা দেশে ব্যাংকের চার শ পল্লী শাখা করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শেষ পর্যন্ত এই বিশেষ মডেলের শাখাগুলো করার জন্য অনুমতি পাওয়া যায়নি। সেই শাখাগুলো করা হলে গত দুই দশকে দেশের অর্থনৈতিক চেহারা আমূল বদলে যেত। সবুজ হাট প্রকল্পে ক্যাশ ওয়াকফ ধারণা গ্রহণ করে দেশের পল্লী অঞ্চলে কোটি কোটি ঋণগ্রস্ত নারীর ঋণ মওকুফের প্রস্তাব করেছিলাম। আমার সেই ধারণাগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক। তবে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।

করোনাভাইরাহ আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেবে, এটি জানা কথা। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমি মনে করি সরকারের উচিত হবে ‘ক্রিটিক্যাল মিনিমাম ওয়েজ সিস্টেম’ প্রবর্তন করা। প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উভয়কে বাঁচানোর জন্য প্রতিষ্ঠানের মুনাফার সাথে শ্রমিকের মজুরিকে সংযুক্ত করে দিতে হবে। আমি বলব ‘প্রফিট ডিপেনডেন্ট ওয়েজ সিস্টেম’ চালু করার জন্য। এটা হলো মজুরির জন্য মুনাফা ভাগাভাগির প্রক্রিয়া। আমি অনেক দিন ধরে শিল্প-কারখানা ও সরকারি অফিস-আদালত বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলে আসছি। সেটা করা হলে আজ করোনাভাইরাসের কারণে ছুটি পেয়ে মানুষ মরিয়া হয়ে রাজধানীর বাইরে যাওয়ার জন্য ছুটত না। এতে করোনাভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি আরো বেড়েছে। আমরা করোনাভাইরাস সংক্রমিত হওয়া প্রতিরোধে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছি। কিন্তু এটা কোনো সমাধান বলে আমার মনে হয় না। মাঠে ময়দানে ঘুরে বেড়ানো সেনা সদস্যদের কি এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নেই? তারা তো আমাদেরই সন্তান, ভাই বা স্বজন।
আমি মনে করি, করোনাভাইরাস আমাদের দেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বর্তমান দুর্যোগ থেকে উত্তরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরেকটি এ ধরনের দুর্যোগ বা আরো বড় কোনো বিপর্যয় থেকে বাঁচার জন্যই আমাদেরকে এসব মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। বিভিন্ন পরিষেবা জনগণের জন্য সহজ করতে হবে। বিশেষ করে তথ্যের সহজ প্রবাহের জন্য ইন্টারনেটের মতো পরিষেবা। এর মাধ্যমে আমরা সহজেই জনগণকে সচেতন করতে পারি।

অদৃষ্টের আরেক পরিহাস হলো, আমরা অস্ত্রের পেছনে যত অর্থ ব্যয় করছি চিকিৎসার পেছনে সেটা করছি না। বিশ্বের খুব কম দেশই তা করছে। দেশে দেশে হানাহানি থামছে না। এ অবস্থার মধ্যেও পশ্চিমা শক্তিগুলোর দোষারূপের খেলা বন্ধ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র সমরাস্ত্রের পেছনে ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করলেও এখন করোনাভাইরাস মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ মাস্ক পাচ্ছে না। অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব তো রয়েছেই। মাত্র একটি রোগের প্রাদুর্ভাব সারা বিশ্বের চিকিৎসাব্যবস্থাকে প্রান্তিক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। করোনাভাইরাস আসলেই গোটা মানবতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর বিরুদ্ধে জয়ী হতে হলে গোটা মানবতাকেই যুদ্ধ করতে হবে।হ

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড; সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক, জেদ্দা
[email protected]


আরো সংবাদ