১৮ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১, ১১ মহররম ১৪৪৬
`

সভ্যতার সঙ্ঘাত

ক্রাইস্টচার্চে নিহতরা - ছবি : সংগৃহীত

নিউজিল্যান্ডে (১৫ মার্চ, ২০১৯) একটি মসজিদে গুলি চালিয়ে এক ব্যক্তি ৫০ জন মুসল্লিকে হত্যা করলেন। যিনি গুলি চালিয়েছেন তিনি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক, নিউজিল্যান্ডের নন। নিউজিল্যান্ডের নাগরিক হলে নিউজিল্যান্ডের ওপর এই গুলি চালোনার সব দোষ গিয়ে পড়তে পারত; কিন্তু এখন তা পড়ছে না। তবে ব্যক্তিটি ২০ মিনিট ধরে গুলি চালিয়েছেন। এর মধ্যে নিউজিল্যান্ডের পুলিশ এসে লোকটিকে আটকাতে পারত, কিন্তু পুলিশ আসেনি। নিউজিল্যান্ড একটি খুবই আধুনিক রাষ্ট্র। পুলিশের দ্রুত আসা উচিত ছিল, তবে আসেনি।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এই ঘটনা নিয়ে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ব্যাখ্যা দেননি পুলিশ কেন দ্রুত এলো না। নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্র নয়। তাই আমাদের মতো অনেকের মনে দেখা দিচ্ছে নানা প্রশ্ন। যে কথাটি আমাদের বোঝা দরকার তা হলো, এ রকম ঘটনা আরো ঘটতে পারে। মুসলমানদের তাই উচিত নয়, খ্রিষ্টান বিশ্বের কোনো দেশে উন্নত-সুখী জীবনের সন্ধানে ছুটে যাওয়া। মুসলমানদের উচিত তাদের নিজেদের দেশেই তাদের যা আছে তা নিয়ে জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করা। আমাদের দেশে অনেক পত্রিকায় বলা হচ্ছে নিউজিল্যান্ডে যা ঘটেছে তা হলো সাদা-কালো বিরোধ।

কিন্তু নিউজিল্যান্ডে কেবল সাদা মানুষ থাকেন না, নিউজিল্যান্ডে বাস করেন মাওড়িরা। মাওড়িরা ঠিক সাদা মানুষ নন। তারা বাস করেন দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের বিভিন্ন দিকে। মাওড়িরা কালো মানুষ নন, আবার সাদা মানুষও নন। মাওড়িরা মাওড়ি। তাদের সেভাবেই বর্ণনা করা উচিত। নিউজিল্যান্ডে মাওড়িদের সাথে সাদা মানুষের বেশ কয়েকবার লড়াই হয়েছে। কিন্তু সাদা মানুষ বন্দুক-কামান নিয়েও তাদের সাথে যুদ্ধ করে এঁটে উঠতে পারেননি। আসতে বাধ্য হয়েছেন একটা সমঝোতায়। নিউজিল্যান্ডে যা ঘটল তাকে ঠিক সাদা-কালো মানুষের লড়াই বলা যাবে না। কারণ নিউজিল্যান্ড পুরোপুরি সাদা মানুষের দেশ নয়। অন্য দিকে, মুসলমানদের সাথে চীনে হাংচিনাদের সঙ্ঘাত ক্রমেই জটিল হচ্ছে। এই সঙ্ঘাতকে সাদা-কালোর সঙ্ঘাত বলা যাবে না। কেননা, হাংচিনাদের গায়ের রঙ পীতাভ। ইউরোপীয় মানুষের মতো তা শ্বেতাজ্ঞ নয়। বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের সাথে শুধু সাদা মানুষের (ইউরোপীয়) সঙ্ঘাত হচ্ছে তা নয়; অন্য রঙের মানুষের হচ্ছে। যারা ইউরোপীয় নন। কেন এটা হতে পারছে, তাই তাকে শুধু বর্ণবিদ্বেষ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

অনেকেই একে ব্যাখ্যা করতে চাচ্ছেন সভ্যতার সঙ্ঘাত তত্ত্ব দিয়ে। সভ্যতার সঙ্ঘাত তত্ত্ব প্রদান করেছেন স্যামুয়েল পি হানটিনটন। ইনি পঞ্চাশ বছর ধরে অধ্যাপনা করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে, রাষ্ট্রশাসন বিভাগে। এর ছিল বিশ্বজোড়া খ্যাতি। আমাদের মতো ব্যক্তির পক্ষে তার জ্ঞানের সমালোচনা করা খুব সুসঙ্গত নয়। কিন্তু তবু করতে হচ্ছে। কেননা, আমাদের ইতিহাস জ্ঞানের সাথে তার ইতিহাস জ্ঞান একেবারেই খাপ খাচ্ছে না, সভ্যতার সংজ্ঞারও। মনে হচ্ছে সভ্যতা বলতে, তিনি সব ক্ষেত্রে একই রকম বাস্তবতাকে বোঝাননি। হানটিনটনের মতে, আগামীতে যুদ্ধ রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের হবে না। হবে এক সভ্যতার অন্তর্গত মানুষের সাথে আরেক সভ্যতার মানুষের। কিন্তু তার এই সভ্যতার ধারণা অনেক ক্ষেত্রে খুবই অস্পষ্ট। তিনি বর্তমান বিশ্বের মানব সভ্যতাকে আট ভাগে ভাগ করেছেন। তারা হলো- পশ্চিমি সভ্যতা, ল্যাটিন আমেরিকান সভ্যতা, ইসলামিক সভ্যতা, চীনা সভ্যতা, হিন্দু সভ্যতা, গোড়া গ্রিক খ্রিষ্টান, জাপানি সভ্যতা এবং আফ্রিকান সভ্যতা।

কিন্তু আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি যে, তিনি ঠিক কিভাবে এই সভ্যতাগুলাকে চিহ্নিত করছেন তা স্পষ্ট নয়। তার সভ্যতার শ্রেণিবিভাগ প্রধানত নির্ভর করছে ধর্মবিশ্বাসের ওপর। কিন্তু অন্যান্য ঐতিহাসিকেরা সভ্যতার শ্রেণিবিভাগের ক্ষেত্রে আরো বিভিন্ন উপাদানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। যেমন অনেকে বলেন, তাম্রপ্রস্তর যুগের সভ্যতা। যে সময়টায় মানুষ পাথরের অস্ত্রের ব্যবহার পরিত্যাগ করেনি। কিন্তু শুরু করেছে তামার মতো ধাতুর ব্যবহার। লৌহযুগের সভ্যতা বলতে বোঝান মানুষ যখন লোহার মতো ধাতুর ব্যবহার আরম্ভ করেছে। মানুষের ইতিহাসে দেখা যায় যে, সভ্যতার বিকাশ নির্ভর করে প্রাকৃতিক শক্তির ব্যবহারের ওপর। আধুনিক ইউরোপীয় সভ্যতা নির্ভর করেছে বাষ্প শক্তি চালিত ইঞ্জিনের ওপর। নির্ভর করছে পেট্রোলচালিত, বিদ্যুৎচালিত ইঞ্জিনের ওপর। কেবল ধর্মবিশ্বাসকে নির্ভর করেই যে এক একটি সভ্যতা গড়ে উঠেছে এ রকম কথা খুব বেশি ঐতিহাসিক বলেননি। যদিও ধর্মবিশ্বাস সভ্যতার অন্যতম উপাদান।

কিন্তু সভ্যতার ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হানটিনটন ধর্মকে দিয়েছেন বিশেষ গুরুত্ব। আর বলেছেন, আগামীতে ধর্মবিশ্বাস নিয়ে বাধবে বড় রকমের সঙ্ঘাত। তার এই বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে সংঘটিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনের ওপর হামলা হওয়ার ফলে। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেকে মনে করছেন, সভ্যতার সঙ্ঘাত হয়ে দাঁড়াবে প্রধানত মুসলিম বিশ্বের সাথে পশ্চিম ইউরোপীয় ও মার্কিন-কানাডার খ্রিষ্টান সভ্যতার সঙ্ঘাত। আমরা দেখছি, নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলা হতে। আর সেটি হতে পারছে একজন শ্বেতকায় খ্রিষ্টানের দ্বারা। এটাকে তাই ব্যাখ্যা করা চলে খ্রিষ্টান ও মুসলিম সভ্যতার মধ্যে সঙ্ঘাত হিসেবে। কিন্তু আমাদের সমকালীন বিশ্বে আরো অনেক ঘটনা ঘটছে। যাকে অত সরল করে ব্যাখ্যা করা যায় না। মুসলিম বিশ্বের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্ঘাত সেভাবে বাধবার আগে চীনের সাথে বেধে যেতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ। আর এটাকে দু’টি ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে যুদ্ধ বলে নিশ্চয় ব্যাখ্যা করা যাবে না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রাচীর গড়ছে মেক্সিকানদের বেআইনিভাবে সে দেশে আসা বন্ধ করার জন্য। এ ক্ষেত্রে যে কেবলই কাজ করছে ধর্মবিশ্বাস তা নিশ্চয় নয়। ল্যাতিন আমেরিকার ভাষা আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাষা যদি একই হতো, তবে মেক্সিকানদের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ নিশ্চয় এই পর্যায়ে পৌঁছাত না। কেননা, আমরা দেখছি কানাডার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচীর গড়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে না। অন্য দিকে কানাডা থেকে কুইবেক (কবেক) আলাদা হয়ে যেতে চাচ্ছে। কারণ কবেক হলো ফরাসিভাষী। হয়তো ভবিষ্যতে কবেক আলাদা হয়ে যাবে। দু’টি বিশ্বযুদ্ধে ধর্ম কোনো বিশেষ ভূমিকা পালন করেনি। খ্রিষ্টানরা নিজেদের মধ্যেই করেছে ভয়াবহ যুদ্ধ।

অন্য দিকে সভ্যতার মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়। একটি সভ্যতা গ্রহণ করে আরেকটি সভ্যতার দান। কোনো সভ্যতা তাই কেবল নিজের আবিষ্কারের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে এমন নয়। হাংচিনে আবিষ্কৃত হয় কাগজ, কম্পাস, বারুদ ও কাঠের ওপর অক্ষর খোদাই করে বই ছাপানোর কৌশল। ইউরোপীয় সভ্যতা এসব গ্রহণ করেছে হাংচিনা সভ্যতার কাছ থেকে। প্রধানত আরব মুসলিম সভ্যতার মধ্যস্থতায়। তাই সভ্যতার ইতিহাসকে অতটা সঙ্ঘাতময় বলা চলে না। কোনো সভ্যতাই একের থেকে অপরে অতটা বিছিন্নভাবে গড়ে ওঠেনি। যাকে বলা হচ্ছে হিন্দু সভ্যতা; সেটি একটি সভ্যতা কি না তা নিয়েও তোলা যায় বিতর্ক। উত্তর ভারতের সভ্যতাকে বলতে হয় আর্য সভ্যতা। কিন্তু দক্ষিণ ভারতের সভ্যতাকে বলতে হয় দ্রাবিড় সভ্যতা। কিন্তু হানটিনটন উত্তর-দক্ষিণ ভারতের সভ্যতাকে দেখেছেন এক করে। হানটিনটনের ধারণা দিয়ে ভারতের রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। ইহুদিরা চেয়েছিলেন মুসলমানদের সাথে খ্রিষ্টানদের সঙ্ঘাত সৃষ্টি করতে। যাকে বলা হচ্ছে, সভ্যতার সঙ্ঘাত তত্ত্ব। তাকে মনে করা চলে, একটা গভীর ইহুদি চক্রান্তের ফল।

বর্তমান বিশ্বে মারণ-আয়ুধ এমন অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যে, তেমন যুদ্ধ শুরু হলে গোটা মানব সভ্যতায় এমনকি মানবজাতি বিলুপ্ত হতে পারে। তাই আমাদের উচিত হবে সভ্যতার সঙ্ঘাত কমানো, বাড়িয়ে তোলা নয়।

লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট


আরো সংবাদ



premium cement