২২ জুন ২০২১
`

সানাউল হক খান

-

হাল-আমলে অনেকেই যেমনটি সংস্কৃতির সনাতন কৌলিন্য বোঝেন না, ঠিক সে রকমই আমাদের অতীতের বৈশাখী বন্ধনও বোঝেন না। সুর-তাল-ছন্দ... যা কেবল গানেরই নয়, বরং বাঙলা মায়ের প্রাণেরও, তারও কিস্সু বোঝেন না। পাটশাক, কাসুন্দি আমনের লালচে ঘ্রাণ, হালখাতা, সর্ষেবাটা নেবু পাতার সাথে নরম ইলিশ ঝুরি, নিমপাতা, আখিগুড়ের তিলছাতু, দুধকলাÑ কিছুই না।
ধলেশ্বরীর থই থই জলের গল্পকে কল্পকাহিনী ভেবে হাসেন। আর সে কি হাসি, দম ফাটানো। কোমরগঞ্জ শিবরামপুরের হাট বলতেই অনেকে আজ হা করে তাকিয়ে থাকেন। হাট? সেটা আবার কী? গুন-টানা মাঝিদের পাল-খাটানো নৌকো যেন জাদুঘরেই চলে গ্যাছে।
আজ বাঙালির বাঙালিয়ানা কোথায়? যেন এক মিশ্র জাতির মেলা বসিয়েছি: জমিয়ে তুলছি আসর। চালচলনে, সংস্কৃতির বিশাল-বিপুল ক্যানভাসে আমরা কী টেনে এনে বসাইনি নিরর্থক ভিনদেশী ভিন্নভাষীর আঁচড়? জাতিসত্তার মৌলিকতা আমরা তো বিসর্জন দিয়েছি কবেই। বিপদাপন্ন অন্নবস্ত্রের সাথে তাল মেলানো সংস্কৃতির সুস্থ আর মননশীল কৃষ্টিচর্চা উপেক্ষা করতে করতে বিনে পয়সায় (কখনো বা চড়া দামে) খরিদ করেছি আমাদের পরিচয়-সঙ্কট, যাকে আন্তর্জাতিক ভাষায় বলা হয়ে থাকে ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’। এমনটি হওয়ার কারণ কী?
আমরা কী ঝটপট দশটি গাছের নাম বলতে পারব?
Ñ না,
দশটি ফুলের নাম?
Ñ না,
দশটি ফলের নাম?
Ñ না,
দশ ধরনের আমের নাম?
Ñ না,
দশটি পাখির নাম?
Ñ না,
দশটি শস্যের নাম?
Ñ না, তাও না,
দশটি নদীর নাম?
Ñ পারব না,
দশ ধরনের সবজির নাম?
Ñ না, একটু গুনে নিতে হবে।
ঝটপট দশরকম চালের নাম?
Ñ কী যে মুশকিল, এসব প্রশ্নের মানে আছে কোনো?
Ñ আছে।
আমরা কী জানি বদ্যি-কবিরাজ-ওঝার পট-পরিচয়?
শুনলেই অনেকে ভূরু কুঁচকে যাবে।
শিকড় সন্ধানের সাথে সাথে বোধকরি আমাদের উচিত হবে শঙ্করী ধারণার ধারাপাত মুখস্ত করা। একই বাপ-মায়ের দশ ছেলেমেয়ে দশ রকম কেন? নৃতাত্ত্বিক কারণ কী বাঙালিত্ব ধ্বংস করতে পারে? অসম্ভব।
লম্বা-বেঁটে, সরু-মোটা, কালো-ধলা, গৌর-গেরুয়া ইত্যাদি কত না দেহগত আঙ্গিক। শুনলে কপালে ত্রি-শূল পড়বে। আর মনোগত আঙ্গিক? সেটা তো রয়েছেই, ব্রিটিশ-আইরিশদের পারস্পরিক বিভেদের মতো।
এতসব নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও আমরা কিন্তু খুঁজে পাব আমাদের ঐতিহ্যগত অন্য এক আনন্দ। বাঙলা ভাষাকে সম্মান দিতে গিয়ে, মাতৃবন্ধনের মমত্বকে গাঢ় রাখতে গিয়ে আমরা কী-না করেছি। রক্তে-বারুদে মাখামাখি হয়েছি কতবার। আত্মাহুতির আগুনকে পোশাকে পরিণত করেছি বারবার, ঘুরে ফিরে...
ইতিহাসের তুমুলপ্রাপ্তি আমাদের স্বাধীনতা। বোধকরি বাঙালি-ইতিহাসেরও বিশাল এক মাত্রা আমাদের এই স্বাধীনতা। অতএব, পয়লা বৈশাখের প্রভাতে হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবাই মিলে, যখন শুনি :
‘এ দিন আমি কোন্ ঘরে গো খুলে দিলো দ্বার’
তখন সমান আনন্দে নবানুরাগে, নব-আনন্দে জাগি। আমাদের সন্তানেরা নাগরদোলায় চড়ে ঘুরপাক খায়। বুঝতে মোটেও অসুবিধে হয় নাÑ ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, গম্ভীরা, মনসামঙ্গল, রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, দ্বিজেন্দ্র গীতি, অতুল প্রসাদ, রজনীকান্ত, রামপ্রসাদ ব্রহ্মচারী, হাছন-লালন, কৃষ্ণ-কীর্তন সবারই কথা ও সুরসম্ভার নিয়ে একদিন এই বাংলাদেশটাই হবে বাঙালি সংস্কৃতির মূল পীঠস্থান। কারণ আমরা সেই সে জাতি, ধর্মের নামে শহীদ, অথচ পরধর্মে সহিষ্ণু, ভূতগ্রস্ত নই। আমরা আমাদের সম্পদ আহরণে ব্যাপ্ত, অন্বেষণে ব্যস্ত। ঘাটতিপূরণে আগ্রহী ভীষণ।
মসজিদের আজান, মন্দিরের শাঁখ, গির্জার ঘণ্টা ইত্যাদি নিয়ে আমাদের ভেদবুদ্ধি একটি সরল সমীকরণের দিকে ধাবমান... এই ধাবমানতা আর কিছুই নয়, আমাদের কৃষ্টির মেলবন্ধন, ঐতিহ্যের কালচিহ্ন! আমরা বাঙালি।



আরো সংবাদ