০৩ ডিসেম্বর ২০২০

ইসলামে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ

ইসলামে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ - আনিসুর রহমান এরশাদ - ফাইল ছবি

মহানবী সা: সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে জিবরাইলের আ: মাধ্যমে কিংবা স্বপ্নের মাধ্যমে স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞান আহরণ করেছেন। হেরা গুহায় ধ্যান করেছেন মানবজাতির সঙ্কট থেকে মুক্তির পথ ও পদ্ধতি নিয়ে। তিনি জ্ঞানার্জনকে উৎসাহিত করতে বলেছেন, ‘জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলমান পুরুষ ও নারীর জন্য ফরজ। যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়, সে আল্লাহর পথে রয়েছে যে পর্যন্ত না সে প্রত্যাবর্তন করে।’ (তিরমিজি ও দারেম, মেশকাত শরিফ)। মহানবী সা:-এর আদর্শের আলোকে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে আমাদের করণীয় হচ্ছে -

জ্ঞানের ব্যবহারিক দিকটাকে গুরুত্ব প্রদান : মহানবী সা: জ্ঞানের ব্যবহারিক দিকটাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, ‘হে আবুজার! ওই ব্যক্তি কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট, যে নিজের জ্ঞান থেকে উপকৃত হয় না’। (লি-আলিল আখবার, পৃষ্ঠা-১৬১) অর্থাৎ জ্ঞানচর্চা বা জ্ঞান সাধনার উদ্দেশ্য হতে হবে মানবকল্যাণ।

জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিতকরণ : একদিন হজরত রাসূল সা: দেখলেন মসজিদে দু’টি দল বসে আছে; একটি দল ইসলামী জ্ঞানচর্চায় ব্যস্ত এবং অন্যটি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা ও মুনাজাতে ব্যস্ত। তিনি বললেন, ‘উভয় দলই আমার পছন্দের, কিন্তু জ্ঞানচর্চাকারী দলটি প্রার্থনায়রত দলটি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। আর আমি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে শিক্ষাদানের লক্ষ্যে প্রেরিত হয়েছি।’ অতঃপর তিনি জ্ঞানচর্চাকারী দলটিতে গিয়ে বসলেন (বিহারুল আনওয়ার, প্রথম খণ্ড , পৃষ্ঠা-২০৬)।

জ্ঞানীকে সম্মানজনকভাবে উপস্থাপন : মহানবী সা: বলেন, ‘লজ্জা দুই প্রকারের, বুদ্ধিবৃত্তি ভিত্তিক লজ্জা এবং বোকামিপূর্ণ লজ্জা। বুদ্ধিবৃত্তি ভিত্তিক লজ্জা জ্ঞান থেকে উৎসারিত এবং বোকামিপূর্ণ লজ্জা অজ্ঞতা ও মূর্খতা থেকে উৎসারিত হয়। (উসুলে কাফি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৪)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথে বাঁচতে অপেক্ষাকৃত বেশি যারা জানে তাদের কাছ থেকে শিখতে হবে আর কম যারা জানে তাদেরকে শেখাতে হবে।

জ্ঞানের উত্তম প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ : হজরত মুস্তাফা সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে ক্ষণিকের জন্য হেয় প্রতিপন্ন হতে প্রস্তুত হয় না, সে সারা জীবন অজ্ঞতার কারণে হেয় প্রতিপন্ন হয়’। (বিহারুল আনওয়ার, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৭৭) তিনি আরো বলেছেন, ‘জ্ঞানী ব্যক্তিরা দুই প্রকারের, যে আলেম নিজের জ্ঞানের ওপর আমল করে তার জ্ঞান তার জন্য পরিত্রাণদাতা হয়। আর যে আলেম নিজের জ্ঞানকে ত্যাগ করে সে ধ্বংস হয়ে যায়’ (বিহারুল আনওয়ার, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৬ )।

জ্ঞানী ও অজ্ঞকে পৃথকীকরণ : জ্ঞানই মানুষকে ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, সুন্দর-অসুন্দর, কল্যাণ-অকল্যাণ প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে; অশান্তির পথ পরিহার করে শান্তির পথে অগ্রসর হতে অনুপ্রাণিত করে। আল্লাহ বলেছেন, ‘হে রাসূল সা: আপনি বলুন, যারা জ্ঞানী ও যারা অজ্ঞ, তারা কি সমান হতে পারে? সেই লোকেরাই অসিয়ত গ্রহণ করে যারা বুদ্ধিমান।’ (আল কুরআন, ৩৯:৯) ‘পাঠ করো তোমার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ বস্তুত সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত দ্বারাই মহানবী সা:-এর শিক্ষাব্যবস্থার যাত্রা সূচিত হয়।

জ্ঞান বিতরণ সম্মানযোগ্য ও শ্রদ্ধেয় : মহানবী সা: বলেন, ‘বিজ্ঞান শিক্ষা দাও, এটি মানুষকে আল্লাহভীতি শিক্ষা দেয়, যে জ্ঞানার্জন করে, সে আল্লাহকে সম্মান করে, যে তা দান করে সে যেন শিক্ষা দেয়, এ জ্ঞান যে ধারণ করে সে সম্মানযোগ্য ও শ্রদ্ধেয়। কারণ বিজ্ঞান মানুষকে ভুল ও পাপ থেকে রক্ষা করে এবং বেহেশতের পথ আলোকিত করে।’

জ্ঞানার্জনকে উত্তম ইবাদত ঘোষণা : হজরত আয়েশা রা: বলেন, আমি রাসূল সা:-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন ‘আল্লাহ তায়ালা আমার নিকট অহি পাঠিয়েছেন, যে ব্যক্তি ইলম তলবের উদ্দেশ্যে কোনো পথ অবলম্বন করবে, তার জন্য আমি জান্নাতের পথ সহজ করে দেবো এবং যে ব্যক্তির দুই চক্ষু আমি নিয়েছি তাকে তার পরিবর্তে আমি জান্নাত দান করব। ইবাদত অধিক হওয়া অপেক্ষা ইলম অধিক হওয়া উত্তম। দ্বীনের তথা ইলম ও আমলের আসল হচ্ছে শোভা-সন্দেহের জিনিস হতে বেঁচে থাকা।’ (বায়হাকি শোআবুল ঈমান)

জ্ঞানীরাই জান্নাতে যাবে : সহিহ-আল বুখারি শরিফে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান আহরণ করে সে প্রচুর কল্যাণ লাভ করে, আর যে ব্যক্তি কোনো পথচলাকালে জ্ঞান লাভ করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।’ জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি : শিক্ষা সম্প্রসারণে মহানবী সা: প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। শিক্ষা প্রদানের জন্য সাফা পাহাড়ের পাদদেশে বিশিষ্ট সাহাবি আরকাম বিন আবুল আরকামের বাড়িকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করেন। সে হিসেবে দারুল আরকামই ইসলামের প্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে ধর্মশিক্ষা দেয়া হতো।

প্রশিক্ষক প্রেরণ ও প্রশিক্ষণ প্রদান : আকাবার শপথের মাধ্যমে যারা ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন তাদের প্রশিক্ষিত করতে হজরত মুসআব ইবনে উমাইরকে মদিনায় প্রেরণ করেছিলেন। মহানবী সা:-এর হিজরতের সময় দারুল আরকামে শিক্ষাদানের জন্য হজরত ইবনে উম্মে মাকতুম ও মাসআব বিন উমাইরের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।

জ্ঞান সংরক্ষণে সময় উপযোগী উদ্যোগ : হিজরতের পর মক্কায় অবশিষ্ট মুসলমানদের মধ্যে দারুল আরকামের মাধ্যমেই দাওয়াতে ইসলামের কর্মকাণ্ড জারি রাখা হয়। কিছুসংখ্যক সাহাবিকে তিনি পবিত্র কুরআনের লিপিকার হিসেবে দায়িত্ব দেয়ার জন্য তাদেরকে হস্তলিপিবিশারদ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। হজরত উমর রা: ইসলাম গ্রহণকালে তার বোন ফাতিমার কাছে সূরা ত্বহার লিখিত হস্তলিপি পাওয়া গিয়েছিল।

উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকে গুরুত্ব প্রদান : মদিনায় মসজিদভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইসলামের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদানের ইতিহাস পাওয়া যায়। মহানবী সা: মহাগ্রন্থ আল কুরআন শিক্ষার সাথে সাথে আকাইদ ও ইবাদতের নিয়মকানুন, স্বাস্থ্যশিক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শিক্ষা, রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মনীতি, জীববিদ্যা, প্রকৃতিবিদ্যা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র-আকাশ-বাতাস প্রভৃতির সমন্বয়ে বিজ্ঞান শিক্ষা এবং স্র্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্ক বিষয়ক নানা ধরনের শিক্ষা দিতেন। সাহাবিরা কুরআন শিক্ষার পাশাপাশি সাহিত্য, উত্তরাধিকারী আইন, চিকিৎসা বিদ্যা, ফিকহ, তাজবিদ, দর্শনসহ সময়োপযোগী পণ্য বিপণন প্রক্রিয়াও রপ্ত করতে পারতেন।

নারী শিক্ষাকে গুরুত্ব প্রদান : নারী শিক্ষাকে মহানবী সা: সমভাবে গুরুত্ব দিতেন। হিজরতের পর তিনি সপ্তাহে একদিন শুধু মহিলাদের শিক্ষা-দীক্ষার জন্য সময় দিতেন। মহিলাদের পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি নানা প্রশ্নের জবাবও দিতেন। উম্মুল মুমিনিন আয়শা রা:, হাফসা রা:, উম্মে সালমা রা:সহ অনেক নারী সাহাবিকে তিনি উঁচুমানের শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছিলেন। তারা পবিত্র কুরআন হিফজসহ মানব জীবনের প্রয়োজনীয় সব বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। মহানবী সা: বলেছেন, ‘জ্ঞান হলো মুমিনের অন্তরঙ্গ সঙ্গী আর অধ্যবসায় হলো তার সহযোগী, বুদ্ধিমত্তা হলো তার পথনির্দেশক আর ধৈর্য হলো তার সৈন্যদলের সেনাপতি এবং মমতা তার পিতা ও পুণ্যকর্ম তার ভাইয়ের মতো।’

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক


আরো সংবাদ