ড. ইকবাল কবীর মোহন
মানুষের জীবনে অর্থ-সম্পদ একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। প্রতিদিনের জীবন পরিচালনায় অর্থের প্রয়োজন হয়। সমাজে সব মানুষের আর্থিক অবস্থা সবসময় তার অনুকূলে থাকে না। কখনো কখনো সমস্যা বা সঙ্কটে পড়ে মানুষ অন্যের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা নিতে হয়। এটাই ঋণ। এই ঋণের আরবি প্রতিশব্দ করজ। এর বাংলা প্রতিশব্দ হলো ধার, দেনা বা হাওলাত। ইসলামী পরিভাষায় ঋণ হলো কেবল সহযোগিতার জন্য অন্যকে অর্থ-সম্পদ দেয়া, যেন গ্রহীতা উপকৃত হয়, সে তার প্রয়োজন পূরণ করতে পারে এবং পরে নির্দিষ্ট সময়ে দাতাকে সেই অর্থ-সম্পদ কিংবা তার অনুরূপ ফেরত দেয়া। ইসলাম এ ধরনের ধার বা করজকে অনুমোদন দিয়েছে এবং এ ধরনের কাজকে অতি ফজিলত বা সাওয়াবের বলে ঘোষণা করেছে।
করজ বা ধারের ফজিলত : মহানবী সা: নিজেই তাঁর প্রয়োজনের সময় ঋণ গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি তিনি অমুসলিম লোকের কাছ থেকেও ধার নিয়েছেন। তাই ইসলামী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় করজে হাসানার অনেক গুরুত্ব ও ফজিলত রয়েছে। এ ধরনের করজকে ইসলাম শুধু উৎসাহিতই করেনি, বরং করজ বা ধারকে অনেক ফজিলতের কাজ বলে ঘোষণা করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই দানশীল নর-নারী, যারা আল্লাহকে উত্তমরূপে ধার দেয়, তাদের দেয়া হবে বহুগুণ। তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার।’ (সূরা হাদিদ-১৮) অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠা করো, জাকাত দাও এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ (করজ বা ধার) দাও।’ (সূরা মুজ্জাম্মিল : ২০) ‘তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে, আল্লাহকে করজে হাসানা দিতে প্রস্তুত, এরপর আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ-বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেবেন।’ (সূরা বাকারা-২৪৫) আল্লাহ আরো বলেন, ‘আমি তোমাদের সাথে আছি। যদি তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠা করো, জাকাত দিতে থাকো, আমার নবীদের প্রতি বিশ^াস রাখো, তাদের সাহায্য করো এবং আল্লাহকে উত্তম পন্থায় করজে হাসানা দিতে থাকো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের গুনাহ দূর করে দেবো এবং অবশ্যই তোমাদের জান্নাতে প্রবিষ্ট করব, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে নির্ঝরণীসমূহ প্রবাহিত হয়।’ (সূরা মায়িদাহ- ১২)
ঋণ গ্রহণে সতর্কতা : ঋণ গ্রহণ ইসলামে বৈধ হলেও এটা যাতে পারতপক্ষে না নেয়া হয়, সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, ঋণ গ্রহণ করলে কথামতো সেটা যথাসময়ে পরিশোধ করা অপরিহার্য। তা না হলে অঙ্গীকার ভঙ্গ হবে। এর ফলে ঋণদাতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কোনো কারণে ঋণ পরিশোধ করা না গেলে ঋণগ্রহীতা ভয়ানক ক্ষতির মধ্যে পড়বেন। রাসূল সা: বলেছেন, ‘ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি শাহাদতবরণ করলে বিনা হিসাবে জান্নাতে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও তার জন্য জান্নাত লাভ সম্ভব হবে না।’ রাসূল সা: বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া ব্যক্তিও তার ঋণের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (মুসনাদে আহমদ-২২৪৯৩)। অন্য দিকে কেউ যদি সময়মতো তার ঋণ পরিশোধ করে তাহলে তাকে জান্নাত দেয়া হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির মৃত্যু হবে অহঙ্কার, খিয়ানত এবং ঋণ থেকে মুক্ত হয়ে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (তিরমিজি-১৫৭২)
সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করার পরিণতি : ঋণগ্রহীতার জন্য এটা অন্যতম শর্ত যে, সে অবশ্যই সময়মতো ঋণের অর্থ-সম্পদ পরিশোধ করে দেবে এবং সে তার ওয়াদা পূর্ণ করবে। করজে হাসানা বা উত্তম ঋণের ব্যাপারে আল্লাহ এবং রাসূল সা: অনেক ফজিলতের কথা বললেও, তা যদি সঠিকভাবে সঠিক সময়ে পরিশোধ করা না হয়, সে সম্পর্কেও কঠিন সতর্কবার্তা রয়েছে। আল্লাহর রাসূল সা: বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই উত্তম যে তার (ঋণের) হককে উত্তমরূপে পরিশোধ করে।’ (বুখারি-২৬০৬)
অক্ষম ব্যক্তিকে ঋণ পরিশোধে অবকাশ দেয়া : সমাজে এমন অনেক লোক আছে যারা নানা সমস্যার কারণে ঋণ গ্রহণ করে। তবে নানা পারিবারিক সমস্যা বা অক্ষমতার কারণে ঋণ সময়মতো কিংবা কোনোভাবেই পরিশোধ করতে পারে না। তাদের ঋণ পরিশোধ করতে অবকাশ দেয়া, এমনকি সম্ভব হলে ঋণ মাফ করে দিতে ইসলাম ঋণদাতাকে উৎসাহিত করেছে। অক্ষম ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে অবকাশ দেয়া এবং সম্ভব হলে মাফ করে দেয়াকে অফুরন্ত সাওয়াবের কাজ বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি অভাবী হয়, তাহলে তাকে সচ্ছল হওয়া পর্যন্ত অবকাশ দাও। আর যদি ঋণ মাফ করে দাও, তাহলে সেটা তোমাদের জন্য আরো উত্তম যদি তোমরা জানতে।’ (সূরা বাকারা-২৮০)
মহানবী সা: বলেছেন ‘যে ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত (অভাবী) ব্যক্তিকে অবকাশ দেবে সে দান-খয়রাতের সাওয়াব পাবে।’ (ইবনে মাজাহ-২৪১৮) তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহ সেই বান্দার প্রতি রহমত বর্ষণ করেন, যে ব্যক্তি ক্রয়-বিক্রয়ের সময় উদারচিত্ত হয় এবং ঋণের পাওনা আদায়ের সহনশীল হয়।’ (ইবনে মাজাহ-২২০৩)
কিয়ামতের দিন আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও করুণা লাভ করার একটি উপায় হলো, অভাবী ও দরিদ্র লোকের ঋণ মওকুফ বা মাফ করে দেয়া। এ বিষয়ে রাসূল সা: বলেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে এমন এক লোকের হিসাব গ্রহণ করা হয়, কিন্তু তার মধ্যে কোনো ভালো আমল পাওয়া যায়নি। কিন্তু সে মানুষের সাথে লেনদেন করত এবং সে ছিল সচ্ছল। তাই দরিদ্র লোকদের (ঋণ) মাফ করে দেয়ার জন্য সে তার কর্মচারীদের নির্দেশ দিত। রাসূল সা: বলেন, আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেন, এ ব্যাপারে (ক্ষমা করার ব্যাপারে) আমি তার চেয়ে অধিক যোগ্য। একে ক্ষমা করে দাও।’ ( মুসলিম-১৫৬১)
ঋণগ্রহীতার দোয়া : ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধের যেমন তার আকাক্সক্ষা এবং উদ্যোগ থাকতে হবে, তেমনি তা পরিশোধে সামর্থ্য দেয়ার জন্যও আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করতে হবে। আল্লাহর রাসূল সা: দেনা পরিশোধে তাওফিক কামনা করার শিক্ষা দিয়েছেন। দেনা বা ঋণ পরিশোধ করার চাপ থেকে যখন পেরেশানি বেড়ে যাবে, তখন আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। এমন একটি দোয়া রাসূল সা: নিজে করতেন এবং তা করার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি দোয়ায় বলতেন, ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আশ্রয় চাই, অপারগতা ও অলসতা থেকে আশ্রয় চাই, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে আশ্রয় চাই এবং ঋণের ভার ও মানুষদের দমন-পীড়ন থেকে আশ্রয় চাই।’ (বুখারি-৬৩৬৯)
ঋণ করা লাগতে পারে। ঋণ নিতে ইসলামে কোনো বাধা নেই। তবে ঋণের অর্থ-সম্পদ সময়মতো পরিশোধ করা মুমিনের অপরিহার্য দায়িত্ব। যে বা যারা ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করবে, তার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। আবার ঋণগ্রহীতা যদি তার ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে অপারগ হয়, তাকে ঋণ পরিশোধের সময় বাড়িয়ে দেয়া, এমনকি সম্ভব হলে তাকে মাফ করে দেয়াকে আখিরাতে মুক্তির উপায় ঘোষণা করা হয়েছে। তাই আমরা যারা ঋণ নিতে বাধ্য হবো, তাদের উচিত হবে ঋণ পরিশোধ করে জান্নাতের পথ সুগম করা। ঋণ দিতে না পারলে ঋণদাতার কাছ থেকে অবকাশ গ্রহণ বা মওকুফ নেয়ারও চেষ্টা করতে হবে। আর এটা ঋণদাতার জন্য মুক্তির পথ সুগম করবে। মোট কথা ঋণ না নিতে সচেষ্ট থাকাই উত্তম। আর এর জন্য মহান আল্লাহর কাছে আমাদের সাহায্য চাইতে হবে। আল্লাহ তায়ালা ঋণের ব্যাপারে আমাদের সতর্ক হওয়ার তৌফিক দান করুন।
লেখক : সাবেক ব্যাংকার, প্রাবন্ধিক ও শিশুসাহিত্যিক



