২০১৮ সালে ৫৯ আসন শরিকদের ছেড়েছিল বিএনপি, এবার কতটি

``আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হলে তারা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে থাকা মিত্রদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, কাদেরকে নিয়ে নির্বাচনী জোট গঠন করবে বিএনপি।''

মঈন উদ্দিন খান
Printed Edition

বিএনপি সর্বশেষ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। সেই নির্বাচনে জোট ও আন্দোলনের শরিকদের জন্য ৫৯ আসন ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি। এবার দলটি কতগুলো আসন শেখ হাসিনাবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে থাকা শরিকদের ছাড়বে সেটি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী এবার আলাদাভাবে ৩০০ আসনে নির্বাচন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে অন্য শরিরকদের জন্য ৫০টির মতো আসন ছাড় দিতে পারে বিএনপি।

চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় ২০১৮ সালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি। বিএনপি তখন শরিকদের জন্য মোট ৫৯টি আসন ছেড়ে দিয়েছিল। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং ২০ দলীয় জোটের হয়ে বিএনপির ধানের শীষ কিংবা নিজেদের দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করেছিল তারা। এরপর ২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ও মিত্ররা। ছোট-বড় মিলিয়ে এই নির্বাচনে ৬২টির মতো রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি।

জানা গেছে, বিএনপির বর্তমান অবস্থান হচ্ছে, আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হলে তারা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে থাকা মিত্রদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, কাদেরকে নিয়ে নির্বাচনী জোট গঠন করবে বিএনপি। প্রাথমিকভাবে দলটির তরফ থেকে এখন পর্যন্ত নির্বাচনী জোটের রূপরেখা কেমন হবে, সে ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো ধারণা দেয়া হয়নি।

তবে জানা গেছে, বিএনপি আন্দোলনে থাকা মিত্রদের নিয়েই নির্বাচন করবে। সে ক্ষেত্রে জোটের যেসব প্রার্থীর সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিজয়ী হয়ে আসার মতো সক্ষমতা রয়েছে, আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে তাদেরকে প্রাধান্য দেবে, সেসব আসন তারা ছেড়ে দিতে পারে। জামায়াতে ইসলামীর সাথে এবার বিএনপির আসন সমঝোতা হবে কি না, কিংবা জামায়াত তাদের নির্বাচনী জোটে থাকবে কি না, সে ব্যাপারটি এখনো স্পষ্ট নয়। বিএনপি এবং জামায়াত এবার আলাদাভাবে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।

জানা গেছে, গত ২৪ এপ্রিল বিএনপির সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নির্বাচনী জোট নিয়ে আলোচনা উত্থাপন করেন গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের নেতারা। বৈঠক সূত্র মতে, বিএনপির পক্ষ থেকে তখন বাম ঐক্যের নেতাদের আশ্বস্ত করে বলা হয়, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে যারা ছিল, বিএনপি আগামীতে তাদের নিয়ে নির্বাচন করবে এবং তারা সরকারেও থাকবে।

জানা যায়, বিএনপি ২০১৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীসহ তৎকালীন ২০ দলীয় জোটকে ৪০টি আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে ছেড়েছিল ১৯টি আসন। সেই নির্বাচনে তৎকালীন ২০ দলীয় জোটভুক্ত জামায়াতকে ২২টি, এলডিপি পাঁচটি, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) দু’টি, খেলাফত মজলিস দু’টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ চারটি, কল্যাণ পার্টি একটি, লেবার পার্টি একটি, এনপিপি একটি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) একটি এবং পিপলস পার্টি অব বাংলাদেশকে (পিপিবি) একটি আসন ছেড়েছিল বিএনপি। অন্য দিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত গণফোরাম সাতটি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি চারটি, নাগরিক ঐক্য চারটি এবং কৃষক শ্রমিক জনতা লীগকে চারটি আসন ছাড় দিয়েছিল।

তখন জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে ঠাকুরগাঁও-২ থেকে আব্দুল হাকিম, দিনাজপুর-১ থেকে মোহাম্মদ হানিফ, দিনাজপুর-৬ থেকে আনোয়ারুল ইসলাম, নীলফামারী-২ থেকে মনিরুজ্জামান মন্টু, নীলফামারী-৩ থেকে আজিজুল ইসলাম, রংপুর-৫ থেকে গোলাম রব্বানী, গাইবান্ধা-১ থেকে মাজেদুর রহমান, সিরাজগঞ্জ-৪ থেকে রফিকুল ইসলাম খান, পাবনা-৫ থেকে ইকবাল হোসেন, ঝিনাইদহ-৩ থেকে মতিয়ার রহমান, যশোর-২ থেকে আবু সাঈদ মুহা: শাহাদৎ হুসাইন, বাগেরহাট-৩ থেকে আব্দুল ওয়াদুদ সেখ, বাগেরহাট-৪ থেকে আব্দুল আলীম, খুলনা-৫ থেকে মিয়া গোলাম পরওয়ার (বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল), খুলনা-৬ থেকে আবুল কালাম আজাদ, সাতক্ষীরা-২ থেকে আব্দুল খালেক, সাতক্ষীরা-৪ থেকে জি এম নজরুল ইসলাম, পিরোজপুর-১ থেকে শামীম সাঈদী, ঢাকা-১৫ থেকে বর্তমান আমির ডা: শফিকুর রহমান, কুমিল্লা-১১ থেকে ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো: তাহের, চট্টগ্রাম-১৫ থেকে আ ন ম শামসুল ইসলাম এবং কক্সবাজার-২ থেকে হামিদুর রহমান আজাদ নির্বাচন করেন।

এ ছাড়া নাগরিক ঐক্যের মো: রহমতউল্লা রংপুর-১, মাহমুদুর রহমান মান্না বগুড়া-২, নুরুর রহমান জাহাঙ্গীর বরিশাল-৪ ও এস এম আকরাম নারায়ণগঞ্জ-৫; জেএসডির প্রফেসর ড. মো: সাইফুল ইসলাম কিশোরগঞ্জ-৩, শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন ঢাকা-১৮, আব্দুল মালেক রতন কুমিল্লা-৪ ও আ স ম আব্দুর রব লক্ষ্মীপুর-৪; কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের মনজুরুল ইসলাম নাটোর-১, লিয়াকত আলী টাঙ্গাইল-৪, কুড়ি সিদ্দিকী টাঙ্গাইল-৮ ও ইকবাল সিদ্দিকী গাজীপুর-৩; এলডিপির সৈয়দ মাহমুদ মোর্শেদ ময়মনসিংহ-১০, রেদোয়ান আহমেদ কুমিল্লা-৭, নুরুল আলম চট্টগ্রাম-৭, কর্নেল (অব:) অলি আহমদ চট্টগ্রাম-১৪ ও শাহাদাত হোসেন সেলিম লক্ষ্মীপুর-১; জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) ফজলে রাব্বী চৌধুরী গাইবান্ধা-৩ ও আহসান হাবিব লিংকন কুষ্টিয়া-২; খেলাফত মজলিসের আব্দুল বাসিত আজাদ হবিগঞ্জ-২ ও আহমদ আব্দুল কাদের হবিগঞ্জ-৪; জমিয়তের মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস যশোর-৫, মনির হোসেন নারায়ণগঞ্জ-৪, শাহিনুর পাশা চৌধুরী সুনামগঞ্জ-৩ ও ওবায়দুল্লাহ ফারুক সিলেট-৫; লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান পিরোজপুর-২; কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম চট্টগ্রাম-৫; এনপিপির ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নড়াইল-২; পিপিবির রিটা রহমান রংপুর-৩; গণফোরামের আমসা আমিন কুড়িগ্রাম-২, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ পাবনা-১, এ এইচ এম খালেকুজ্জামান ময়মনসিংহ-৮, সুব্রত চৌধুরী ঢাকা-৬, মোস্তফা মহসীন মন্টু ঢাকা-৭, রেজা কিবরিয়া হবিগঞ্জ-১ ও সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ মৌলভীবাজার-২ থেকে ভোট করেন।

পরবর্তী সময়ে এদের মধ্যে থেকে দু-একটি দল আওয়ামী সরকারবিরোধী বিগত আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিল না। অন্য দিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে এদের বাইরে ছয়দলীয় জোট গণতন্ত্র মঞ্চ, চার দলীয় জোট গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, গণ অধিকার পরিষদ, এবি পার্টি, এনডিএম, বিপিপি সম্পৃক্ত ছিল। জানা গেছে, এদের মধ্য থেকে যাদের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে তাদের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেবে বিএনপি। এ ছাড়া বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ কয়েকটি ইসলামী দল দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বর্জন করে যুগপতের বাইরে নিজস্ব কর্মসূচি নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ছিল। নির্বাচনী জোটে সম্পৃক্ত হলে তাদেরকেও কয়েকটি আসন দিতে পারে বিএনপি।

বিএনপির এক নেতা জানিয়েছেন, দলগুলোর মধ্যে যারা সরকারবিরোধী বিগত আন্দোলনে ছিল না, আগামী নির্বাচনে আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে তাদের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হবে না। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মিত্রদের জন্য বিএনপির আসন ছাড়ের সংখ্যা এবার কমে ৫০ কিংবা এর নিচেও নামতে পারে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও যুগপতের লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশে নির্বাচনী প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। সুতরাং শরিকদের সাথে আসন বণ্টন নিয়েও এখনো আলোচনার অবস্থা আসেনি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান অনেক আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, নির্বাচনে বিজয়ী হলে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে থাকা সবাইকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবেন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা বাস্তবায়ন করবেন। তিনি আরো বলেন, দল এখনো আসন বণ্টন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে এটা তো সময়মতো, স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় আসবে।