গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের বার্ষিক বৈঠকে অংশ নিতে বাংলাদেশের সাত সদস্যের প্রতিনিধিদল পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় গেছে। প্রতিনিধিদলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন যৌথ নদী কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আবুল হোসেন। ৫ আগস্ট বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ভারতে আশ্রয় নেয়াকে কেন্দ্র করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যখন তলানিতে, ঠিক সেই সময়ে দুই দেশের মধ্যে এমন বৈঠক দিল্লির সবুজ সঙ্কেতেই হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি-বিষয়ক বৈঠক বিশেষজ্ঞ কমিটির নিয়মিত কাজের অংশ। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। তাই এই সময়ে বৈঠকটির গুরুত্ব রয়েছে। বৈঠক সম্পর্কে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গঙ্গার ফারাক্কা পয়েন্টে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কতটা বজায় রয়েছে, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান কী বলছে, গঙ্গার পানির কতটা কোন নদীতে যাচ্ছে, সেসব বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হবে।
বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এসব নদীর প্রায় প্রতিটির উজানে বাঁধ দিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণ করছে ভারত। শুধু গঙ্গা নদীর উজানেই ৩৬টি বাঁধ নির্মাণ করেছে দেশটি। গঙ্গা ছাড়া আর কোনো নদীর পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি করেনি।
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি হলেও ভারত এই চুক্তির আলোকে বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা দেয়নি। শুষ্ক মৌসুমে বরাবরই ভারত বাংলাদেশকে প্রাপ্য পানি থেকে বঞ্চিত করেছে। ফলে গঙ্গার পানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বিরূপ প্রভাবের মুখোমুখি হয়েছে। বিশেষ করে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প ও মিঠা পানির ওপর বেঁচে থাকা সুন্দরবন হুমকির মুখে পড়েছে।
ভারত ১৯৬১ সালে ফারাক্কা বাঁধের কাজ শুরু করে যা ১৯৭৫ সালে চালু হয়। সে সময় থেকেই হয় গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তিটি বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) একটি প্রধান দাবি ছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রথম গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মেয়াদ ছিল ১৯৭৭-৮২। জিয়াউর রহমানের সময়ে করা চুক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল পানির ন্যায্যতা নিশ্চিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’। চুক্তিটি নবায়নের কথা থাকলেও পরে আর নবায়ন করা হয়নি।
এরপর ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়া ও বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেন। যাতে কোনো গ্যারান্টি ক্লজ ছিল না। তবুও বাংলাদেশ চুক্তিটি মেনে নিয়েছে।
গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের বিষয়ে কলকাতায় ভারত-বাংলাদেশের এই বৈঠকে আলোচনা হবে। পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতে গ্যারান্টি ক্লজ যুক্ত করার বিষয়টি আলোচনায় আসতে হবে।
আগের পানিবণ্টন চুক্তিগুলোতে শুধুই পানির অধিকারের কথা স্থান পায়। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নৌচলাচল, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের বিষয়গুলো ছিল না। চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ও আলোচনায় রাখা সময়ের দাবি। আমরা গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা চাই, চাই পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, যার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবে প্রাণ ও প্রকৃতি। সুদৃঢ় হবে ভারত-বাংলাদেশের মানুষের মেলবন্ধন।



