ইসলামের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের অধিকার

Printed Edition

শামীমা ইয়াসমিন

ইসলামের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষের সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং তা সমতা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক অধিকার-দায়িত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে, যা পারিবারিক জীবন, সামাজিক দায়িত্ব ও আধ্যাত্মিক উন্নতিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। নারী ও পুরুষের পারস্পরিক অধিকার সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এবং রাসূলুল্লাহ সা: বিভিন্ন হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের অধিকার

ইসলাম নারী ও পুরুষকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করে। উভয়ের অধিকার ও দায়িত্ব পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনে আল্লাহ বলেন- ‘তোমাদের পরস্পরকে পরিপূরক হিসেবে সৃষ্টি করেছি’ (সূরা নিসা-১)। এখানে নারীর প্রতি পুরুষের কিছু অধিকার ও দায়িত্ব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো :

১. স্ত্রীর প্রতি স্বামীর অধিকার : ইসলাম স্বামীকে স্ত্রীর উপর নির্দিষ্ট কিছু অধিকার দিয়েছে, যা পারিবারিক শান্তি ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সহায়ক। স্বামীর অধিকারগুলো নিম্নরূপ :

ক. সম্মান ও আনুগত্য

স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো তাকে সম্মান করা এবং তার সঙ্গে সহযোগিতা করা। আল্লাহ বলেন- ‘সৎ নারীরা তাদের স্বামীদের প্রতি অনুগত এবং তাদের সম্মান রক্ষা করে, যা আল্লাহ রক্ষা করেছেন’ (সূরা নিসা-৩৪)। এখানে ‘অনুগত’ বলতে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে স্বামীর সাথে সদ্ব্যবহার এবং পারিবারিক সিদ্ধান্তে তার মতামতকে গুরুত্ব দেয়া বোঝানো হয়েছে।

খ. পারিবারিক কর্তৃত্ব ইসলাম পুরুষকে পরিবারের রক্ষক ও পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত করেছে। এটি কোনো প্রাধান্য নয়; বরং একটি দায়িত্ব। আল্লাহ বলেন- ‘পুরুষরা নারীদের উপর দায়িত্বশীল, কারণ আল্লাহ তাদের একজনকে অন্যজনের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন এবং তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে’ (সূরা নিসা-৩৪)। এই আয়াত অনুযায়ী স্বামী পরিবারে প্রধান ভূমিকা পালন করবে এবং স্ত্রীর প্রতি তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে।

গ. স্বামীর অধিকার নিশ্চিত করা স্বামীর প্রতি নারীর প্রধান দায়িত্ব তার চাহিদা পূরণ করা এবং তাকে মানসিক ও শারীরিক স্বস্তি দেয়া। হাদিসে এসেছে, ‘যদি কোনো স্ত্রী তার স্বামীর অনুগত হয়, তার কর্তব্য পালন করে এবং নামাজ আদায় করে, তবে সে জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে’ (মুসনাদে আহমাদ)।

ঘ. স্বামীর গোপনীয়তা রক্ষা ইসলাম স্বামীর গোপনীয়তা রক্ষার জন্য স্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ বলেন- ‘তারা (নারীরা) তোমাদের পোশাকস্বরূপ এবং তোমরা তাদের পোশাকস্বরূপ’ (সূরা বাকারা-১৮৭)। এই উপমার মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের গভীরতা বোঝানো হয়েছে।

২. স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব যেমন স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কিছু দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি স্ত্রীর প্রতি স্বামীরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। ইসলাম নারীর অধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছে :

ক. ভরণপোষণ স্বামীর প্রথম দায়িত্ব হলো স্ত্রীর মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। আল্লাহ বলেন- ‘তোমরা নারীদের ভরণপোষণ দাও তাদের জন্য যা উত্তম’ (সূরা তালাক-৭)।

স্বামীকে স্ত্রীর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

খ. স্ত্রীর প্রতি ভালো ব্যবহার ইসলাম স্ত্রীর প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করে’ (তিরমিজি)।

গ. স্ত্রীর মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করা ইসলাম স্ত্রীকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। স্ত্রীকে অবহেলা করা, তার প্রতি জোর-জবরদস্তি করা ইসলামসম্মত নয়।

ঘ. স্ত্রীর শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা স্বামীকে স্ত্রীর শারীরিক ও মানসিক কল্যাণের ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে। কুরআনে এসেছে- ‘তোমরা তাদের সাথে সদাচরণ করো’ (সূরা নিসা-১৯)।

৩. সমাজে নারীর প্রতি পুরুষের দায়িত্ব : নারী শুধু একজন স্ত্রীই নয়; বরং মা, মেয়ে, বোন এবং সমাজের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামে নারীর প্রতি পুরুষের কিছু সামগ্রিক দায়িত্ব রয়েছে :

ক. নারীর সম্মান ও সুরক্ষা ইসলাম নারীর সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের নিরাপত্তার গুরুত্বারোপ করেছে। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘সাবধান! আমি তোমাদের ওপর নারীদের ব্যাপারে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিচ্ছি’ (মুসলিম)।

খ. উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা ইসলাম নারীদের উত্তরাধিকারের অধিকার দিয়েছে। আল্লাহ বলেন- ‘পুরুষের যেমন উত্তরাধিকার রয়েছে, তেমনি নারীরও রয়েছে’ (সূরা নিসা-৭)।

গ. শিক্ষালাভে সহায়তা ইসলাম জ্ঞানার্জনকে বাধ্যতামূলক করেছে এবং নারীদেরও এই অধিকার দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ’ (ইবনে মাজাহ)।

৪. পুরুষের ক্ষমতার অপব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা : ইসলাম নারীদের অধিকার হরণ করা বা তাদের প্রতি অন্যায় আচরণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আল্লাহ বলেন- ‘তোমরা নারীদের প্রতি অন্যায় করো না’ (সূরা নিসা-১৯)। রাসূলুল্লাহ সা: আরো বলেন, ‘তোমরা যারা নারীদের প্রতি অন্যায় করবে, তাদের বিরুদ্ধে আমি কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে সাক্ষী দেবো’ (বুখারি)।

পরিশেষে বলতে চাই, ইসলামের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষের সম্পর্ক ন্যায়, সম্মান ও পারস্পরিক অধিকার-দায়িত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। নারীর প্রতি পুরুষের অধিকার মানে একপক্ষীয় নয়; বরং এটি একটি ভারসাম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। ইসলাম নারীর মর্যাদা ও অধিকারকে রক্ষা করে এবং তা নিশ্চিত করার জন্য স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। তাই নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রয়োজন ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলা, যাতে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

লেখক : ইসলাম-বিষয়ক প্রবন্ধকার