আবদুল কাদের তাপাদার সিলেট
- লম্বা ছুটিতে লাখো পর্যটকের সমাগম
- আড়াই শতাধিক হোটেল মোটেল ও রিসোর্টে পা ফেলার জায়গা নেই
- পাঁচ শ’ কোটি টাকার ব্যবসার আশা পর্যটন সংশ্লিষ্টদের
এ এক অভাবনীয় দৃশ্য। পর্যটন স্পটগুলোতে যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই শত শত ভ্রমণপিপাসুর সমাগম। সিলেট শহরের সবচেয়ে দূরবর্তী প্রকৃতি কন্যা জাফলং যেন পর্যটকে ভেঙে পড়েছে। লোকে লোকারণ্য পর্যটন স্পট এবং আশপাশের দুই তিন কিলোমিটার এলাকা। হাজার নয়, লাখো মানুষের সমাগম ভোর থেকে সূর্যাস্ত অবধি। শহরের সবচেয়ে কাছের দুটো আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট সাদাপাথর ও রাতারগুল জলারবনে (সোয়াম ফরেস্ট) হাজারো মানুষের আনাগোনা। দূরের পথ মৌলভীবাজারের বড়লেখায় দেশের একমাত্র আকর্ষণীয় জলপ্রপাত মাধবকুণ্ডে ভ্রমণপিপাসুদের উপস্থিতি দৃষ্টি কেড়েছে এলাকাবাসীর। সিলেট বিভাগের সিলেট নগরীসহ আড়াই শতাধিক হোটেল মোটেল ও রিসোর্টে কোথাও পা ফেলার জায়গা নেই। স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় বড় বড় রুমগুলোতে কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে অতিরিক্ত পর্যটক জায়গা করে নিচ্ছেন। স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি পর্যটকদের সমাগম ঘটেছে এ বছর। পর্যটন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ী দৈনিক নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, এবার ঈদের মৌসুমে কমপক্ষে পাঁচ শ’ কোটি টাকার ব্যবসার আশা করছেন তারা। ঈদের সপ্তাহ দিন আগ থেকেই সিলেট শহরসহ আশপাশের হোটেল মোটেল ও রিসোর্টের আশি ভাগ বুকিং সম্পন্ন হয়ে যায়। এ বছর ঈদের লম্বা ছুটিতে ভ্রমণপিপাসু ও পর্যটকদের দফায় দফায় সিলেটে সমাগম ঘটছে। ঈদের আগে আগেই ঘুরতে এসেছেন অনেকেই। আর ঈদের দিনসহ পরের ছুটির দিনগুলোতে সবচেয়ে বেশি পর্যটক সমাগম হচ্ছে। ঈদের চতুর্থ দিন পেরিয়ে গেলেও ভ্রমণপিপাসুদের সংখ্যা কোনোভাবেই কমছে না। শুক্রবার শাহজালাল রহ:-এর মাজার, শাহপরাণ রহ:-এর মাজার ও জাফলং ঘুরে দেখা গেছে এক অভাবনীয় দৃশ্য। যা নিকট অতীতে কোনোদিন চোখে পড়েনি। আজ জুমাবার (৪ এপ্রিল) মাজার মসজিদে লাখো মুসল্লির সমাগম ঘটে। এদের অধিকাংশই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত ভ্রমণপিপাসু পর্যটক। জুমার নামাজে মসজিদের পাঁচতলা পরিপূর্ণ হয়ে আশপাশের আঙ্গিনা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। একই অবস্থা শহরের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিাত হজরত শাহপরাণ রহ: মাজার মসজিদে। সেখানেও কয়েক হাজার মুসল্লির সমাগম দেখা যায়।
জাফলংয়ে পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে ভ্রমণপিপাসুদের সমাগম, শত শত যানবাহনের সারি লোকে লোকারণ্য জাফলং। শুধু পিকনিক স্পট নয়। আশপাশের পাঁচ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পর্যটকবাহী যানবাহনের সারি। লেগেছে তীব্র যানযট। নিরুপায় হয়ে হেঁটেই জাফলং জিরো পয়েন্ট অভিমুখে যাচ্ছেন পর্যটকরা।
ভ্রমণপিপাসুদের পদচারণায় মুখরিত জাফলংয়ে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতায় প্রশাসন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, স্কাউট, রোভার স্কাউটসসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাও। এ দৃশ্য গত দুদিন ধরে জাফলং জুড়ে।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের টানা ছুটিকে কেন্দ্র করেই পর্যটক দর্শনার্থীদের পদচারণায় এখন মুখরিত সিলেটের জাফলংসহ উত্তর-পশ্চিম সিলেটের আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলো। কাকডাকা ভোর থেকে হাজারো পর্যটকের আগমনে কর্মচাঞ্চল্য দেখা দেয় গেছে পর্যটক ব্যবসায়ীদের মাঝে। দিনব্যাপী পর্যটকের সরব উপস্থিাতিতে খুশি সিলেটের পর্যটক রিলেটেড ব্যবসায়ীরাও।
ভারতের মেঘালয়ের বিস্তৃত সবুজ টিলা, পাহাড়, নুড়িপাথর আর পিয়াইনের বহমান স্বচ্ছ জলরাশি, ঝরনার শাঁ শাঁ শব্দের পানি নামার দৃশ্য দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঈদের দিন থেকেই ভ্রমণে আসেন পর্যটকরা। ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে উত্তর-পশ্চিম সিলেটের সবগুলো পর্যটন স্পটের হোটেল-মোটেলের বেশির ভাগ রুমই অনলাইনে বুকিং হয়ে যায়।
বৃহস্পতি ও শুক্রবার লাখো পর্যটক সিলেটের গোয়াইনঘাটের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ভ্রমণে এসেছেন। এর মধ্যে গোয়াইনঘাট উপজেলার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র প্রকৃতি কন্যা জাফলংয়ে সবচেয়ে বেশি পর্যটক ঘুরতে এসেছেন। এ ছাড়াও প্রকৃতির অপ্সরাখ্যাত বিছনাকান্দি ও জলারবন রাতারগুলেও পর্যটকদের ভিড় লেগে আছে।
শুক্রবার সকালে সরেজমিন জাফলংয়ে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই দলবেঁধে পর্যটকরা ঘুরতে বের হয়েছেন। মেঘালয়ের পাহাড়, পাথর আর স্বচ্ছ জলের সমাহার দেখে যেন তারা মুগ্ধ হন। পরিবার পরিজন ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরছেন আর ছবি তুলছেন। কেউ কেউ নৌকা নিয়ে খাসিয়াপল্লী আর চা-বাগানের উদ্দেশে যাচ্ছেন। ঠাঁই ছিল না এখানকার হোটেল-মোটেলগুলোতে। রেস্টুরেন্টগুলোতেও ব্যস্ততা বেড়ে গেছে সীমাহীন। রেস্টুরেন্টে খাবার দাবার দিয়ে সামলাতে পারছিলেন না মালিকরা।
এবারের ঈদে দেশের বর্তমান পরিস্থিাতিতে পর্যটক আগমন নিয়ে শঙ্কা থাকলেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়ার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালোই ছিল। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা অঘটন ঘটেনি।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা পর্যটকদের কাছে সিলেটের জাফলং, সাদা পাথর, বিছনাকান্দি, রাতারগুল, পান্তুমাই, চা-বাগান পছন্দের শীর্ষে। অবসর পেলেই এসব স্পটসহ সিলেটজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ছোট পাহাড়-টিলা আর ঝরনা দেখতে ভিড় জমান পর্যটকরা। এ ছাড়া শাহজালাল রহ: এবং শাহপরাণ রহ: মাজারেও প্রচুর মানুষ বেড়াতে আসেন। এই ঈদের লম্বা ছুটিতে সিলেটে কয়েক লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সিলেটের দরগা গেটে অবস্থিত হোটেল অর্কিড গার্ডেনের পরিচালক সারওয়ার খান দৈনিক নয়া দিগন্তকে জানান, পুরো রমজান মাস পর্যটকশূন্য ছিল সিলেট। ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র এখন হোটেল মোটেলগুলো জমজমাট অবস্থা বিরাজ করছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্র্যাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সাবেক সভাপতি আব্দুল জব্বার জলিল নয়া দিগন্ত জানান, গত কয়েক বছর বন্যা, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সিলেটের পর্যটন খাত ছিল লোকসানের মুখে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এবার সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন তারা। এবার লাখ লাখ পর্যটক ও দর্শনার্থী সিলেটে আসায় ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি ফুটেছে।
সিলেট হোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউজ ওনার্স গ্রুপের সাবেক সভাপতি সুমাত নূরী চৌধুরী জুয়েল জানান, পর্যটকদের সমাগমে এবার সিলেটে এক ভিন্ন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গোটা সিলেটজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশে ঘুরছেন লাখ লাখ পর্যটক।
দি সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) ফয়েজ হাসান ফেরদৌস জানান, এবার ঈদে সিলেটের স্পটগুলোতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। ঈদে এই খাত থেকে শত কোটি টাকার ব্যবসার আশা করা হচ্ছে।
সিলেট জেলা পুলিশের মিডিয়া ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা মো: সম্রাট তালুকদার জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তায় প্রতিটি স্পটে নেয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা। ট্যুরিস্ট পুলিশের সাথে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
সিলেট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ দৈনিক নয়া দিগন্তকে জানান, পর্যটকরা যাতে নির্বিঘেœ স্পটগুলো ঘুরতে পারেন সে জন্য ঈদের আগ থেকেই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।



