বিশ্বজুড়ে শুরু হলো মুসলমানদের সংযম সাধনার মাস পবিত্র রমজান। এ মাসে বিশ্ব মুসলিম এমন এক চর্চায় নিয়োজিত হন, যা তাদের নফসের গোলামি থেকে মুক্ত করতে সহায়ক। পরিমিত আহার ও জৈবিক চাহিদার রাশ টানার মাধ্যমে পরিপূর্ণ আত্মশুদ্ধি অর্জনই রমজানের উদ্দেশ্য।
সিয়াম মুসলিমদের অবশ্য পালনীয় একটি বিধান। সূরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- ‘হে বিশ্বাসীরা, তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল; যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।’ একজন মানুষ কিভাবে আল্লাহভীরু হবেন তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে কুরআনে। এ মাসেই অবতীর্ণ হয়েছে পবিত্র কুরআন, যা সত্য ও মিথ্যার মানদণ্ড এবং যাতে রয়েছে মানুষের জন্য হেদায়েত আর পথ চলার নির্দেশনা। কিন্তু আমরা সে নির্দেশনা কতটা মানতে পারছি সে প্রশ্ন আছে।
বর্তমানে সততার অভাব এবং নৈতিক অবক্ষয়ে আমাদের সমাজে চরম দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে। এর মুখ্য কারণ, ভোগবাদী জীবনধারা। মাহে রমজান ভোগ-বিলাস থেকে বিরত থাকার শিক্ষা গ্রহণের মাস। কিন্তু বছরের পর বছর রোজা পালন করেও সে লক্ষ্য আমরা অর্জন করতে পারছি না।
প্রকৃত সিয়াম সাধনা মানুষের মধ্যে পাশবিক শক্তির উপস্থিতি অবদমিত করে। ক্ষুধা ও পিপাসায় মানুষের জৈবিক চাহিদা খর্ব হয় এবং মনুষ্যত্ব জাগ্রত হয়। যেকোনো পরিস্থিতিতে ধৈর্য অবলম্বন, সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্ভ্রমবোধ ও সৌজন্য প্রদর্শন, সর্বোপরি সব কাজে বুদ্ধি-বিবেচনাপ্রসূত মাত্রা ও মূল্যবোধের অনুসরণ ব্যক্তি তথা সমাজজীবনের অনিবার্য অবলম্বন হওয়া আবশ্যক। সিয়াম সাধনার লক্ষ্য হলো রোজাদারের মধ্যে এই শিক্ষা জাগিয়ে দেয়া।
রমজান মাসে এমন একটি রাত রয়েছে সেটি হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। শবেকদরের সেই রাতে ফেরেশতারা আসেন পৃথিবীতে। তারা প্রতিপালকের আদেশ নিয়ে মানুষের কাছে আসেন। মূলত এই কুরআন বোঝার কৌশল তারা মানুষের কাছে এ দিন পৌঁছে দেন। তাই এই মাসের প্রতিটি দিন ও রাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ ধরনের একটি উচ্চ ফজিলতের মাসে ধনী-গরিব সব একাকার হয়ে যান। সবাই আগের চেয়ে পরিমাণে কম খান, যাতে তারা ক্ষুধার কষ্ট বুঝতে পারেন। আবার এটি তাদের প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে মোক্ষম ভূমিকা পালন করে। এমন অনুশীলন করলে দেশে খাদ্যের চাহিদা কমার কথা। দেশের ১০ কোটি মানুষও যদি রমজানের এক মাসে একবেলা কম খায় তাহলে তিন কোটি মানুষের এক মাসের খাদ্য বেঁচে যাবে; কিন্তু তা হয় না। আমরা দেখি উল্টো চিত্র।
রমজানে সংযমের পরিবর্তে ভোগের মাত্রা যেন বেড়ে যায়। ইফতার ও সাহরি ঘিরে সবাই যেন খাদ্য উৎসবে মেতে ওঠে। বিশেষ করে শহুরে তরুণদের মধ্যে সম্প্রতি এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তারা অনেকটা উৎসবের আমেজে দল বেঁধে শেষ রাতে বিভিন্ন অভিজাত হোটেল- রেস্তোরাঁয় খেতে যাচ্ছে। রোজা কতটা রাখছে তা আলিমুল গায়েব জানেন।
এ মাসে মজুদদাররা পণ্যের দাম বাড়িয়ে বেশি মুনাফা করতে চায়। দোকানিরা চায় সারা বছরের আয় এক মাসেই করে নিতে। এ দিকে পণ্যমূল্যের চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা।
রমজান মাসে মুসলিমদের অঙ্গীকার করা উচিত, আমরা সত্যিকার উপলব্ধির সাথে রোজা পালন করব। জীবনের সবপর্যায়ে রোজার শিক্ষা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের চেষ্টা করব।



