অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাবে না বিধায় ১০টি সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল বাতিল করে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। গতকাল রোববার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড (বিডা) গভর্নিং বডির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
বাতিল করা অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে কক্সবাজারের সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক, বাগেরহাটের সুন্দরবন ট্যুরিজম পার্ক, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল, গাজীপুরের শ্রীপুরের অর্থনৈতিক অঞ্চল, ময়মনসিংহ অর্থনৈতিক অঞ্চল, মুন্সীগঞ্জের গার্মেন্ট শিল্প পার্ক (বিজিএমইএ), সুনামঞ্জের ছাতক ইকোনমিক জোন, বাগেরহাটের ফমকম ইকোনমিক জোন, ঢাকার সিটি স্পেশাল ইকোনমিক জোন এবং নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ অর্থনৈতিক অঞ্চল।
এ বিষয়ে গতকাল বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, বিডা গভর্নিং বডির সভায় নেপালের জন্য পৃৃথক একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করার নির্দেশনা দেয়া হয়।
বিডা গভর্নিং বডির সভা বিষয়ে সংস্থাটির চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক বিন হারুন বলেন, গভর্নিং বডির সভায় ওয়ান স্টপ সার্ভিস নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা হয়েছে। আমরা এখন যেটা ওয়ানস্টপ সার্ভিস বলছি, তা আসলে ওয়ান কাইন্ড অফ ম্যানুয়াল। প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছে এক মাসের মধ্যে এটিকে ডিজিটালাইজড করতে হবে। এর ফলে রেন্ট সিকিং বিহেবিহার (চাঁদাবাজি মনোভাব) অনেকাংশে কমে যাবে। তিনি আরো জানান, এখন থেকে গভর্নিং বডির মিটিং ঘন ঘন হবে। আগে এটি দুই-তিন বছর পরপর হতো। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, আগামী মাসেই বিডা ও বেপজার গভর্নিং বডির আরেকট মিটিং হবে। এ দিকে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বিডা চেয়ারম্যান বলেন, বিনিয়োগ সম্মেলনে ৩১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।
বিনিয়োগ সম্মেলনে ৩১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে : বিডা চেয়ারম্যান
সদ্য শেষ হওয়া বিনিয়োগ সম্মেলনে প্রাথমিকভাবে তিন হাজার ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
তিনি আরো জানিয়েছেন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আয়োজিত অনুষ্ঠিত সম্মেলনে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের খরচ এক কোটি ৪৫ লাখ টাকা। তবে এতে পার্টনার হিসেবে যারা অংশ নিয়েছেন তারা ব্যয় করেছেন প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। সবমিলিয়ে চার দিনের এই সম্মেলনে খরচ হয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। এই পার্টনারের মধ্যে বিশ্বব্যাংক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিটি ব্যাংক এনএ, ইস্টার্ণ ব্যাংকও রয়েছে।
গতকাল রোববার রাজধানীর বেইলি রোডে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান তিনি। এ ছাড়া আরো বিনিয়োগ প্রস্তাব পাইপ লাইনে আছে বলেও জানান বিডা চেয়ারম্যান।
ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিলের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি আমাদের ব্যবসার কিছু ক্ষতি হলেও তা আমাদের সুযোগ করে দিয়েছে। কারণ সিলেট, লালমনিরহাট ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া খুব সহজ হবে। আমরা সেটাই করতে চাচ্ছি।
আশিক চৌধুরী বলেন, সদ্য সমাপ্ত বিনিয়োগ সম্মেলন সফল হয়েছে কি হয়নি তা সময়ই বলে দেবে। দশে দশ না পেলেও সম্মেলনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, সম্মেলনে অংশ নেয়া বিনিয়োগকারীদের সাথে আলোচনা অব্যাহত রাখা হবে। দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে বছরে এক বা একাধিক বিনিয়োগ সম্মেলন করতে হবে।
তিনি বলেন, বিনিয়োগের সব ক্রেডিট এই সামিটের নয়, এটা আগে থেকে চলতে থাকা আলোচনার ভিত্তিতে হয়েছে। সামিটে এসেই বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়ে দেবেন বিষয়টি এমন নয়। তাই এটাকে সামিটের সফলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এ সময় বিডার হেড অব বিজনেস ডেভেলপমেন্ট নাহিয়ান রহমান বলেন, সামিটের চার দিনে সাড়ে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ অংশ নিয়েছে। প্যানেলিস্ট, এক্সপার্টসহ অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ১৩০। চার দিনে অফিসিয়াল মিটিং হয়েছে ১৫০টি। অফিসিয়ালি আমাদের সামিটে বিনিয়োগ ঘোষণা হয়েছে দু’টি। একটি হান্ডা ইন্ডাস্ট্রি, আরেকটি শপআপ। এই বিনিয়োগের মোট পরিমাণ ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর বাইরে সমঝোতা সই হয়েছে ৬টি। আর এই সামিটে সরকারের পক্ষ থেকে খরচ হয়েছে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা আমাদের প্রথম আনুমানিক খরচের চেয়ে ৪২ শতাংশ কম।
আশিক চৌধুরী বলেছেন, সদ্য সমাপ্ত বিনিয়োগ সম্মেলন সফল হয়েছে কি হয়নি তা সময়ই বলে দেবে। দশে দশ না পেলেও সম্মেলনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিদেশে যেভাবে সম্মেলন হয় সেই মানের সম্মেলন হয়েছে।
তিনি বলেন, সামিটের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদেশীদের কাছে বাংলাদেশ নিয়ে মূল যে ধারণা সেটা বদলাতে। বিদেশীরা যখন প্রথম এসে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা ধারণা নিয়ে ফেরত যান, এরপর গুগল ব্যবহার করে একই ধারণা পান না। এখন যারা এসেছেন তারা ফিরে গিয়ে তাদের বন্ধুবান্ধবদের বলবেন যে গুগল করে যা দেখেছি সেটা সত্য না। কারণ প্রথম দুই দিন আমরা তাদের বাংলাদেশ ঘুরিয়ে দেখিয়েছি। ৯ এপ্রিল আমরা তাদের আমাদের ভিশন দেয়ার চেষ্টা করেছি। এরপর আমরা বিভিন্ন মিটিং করার সুযোগ দিয়েছি। সেই চারপাশের যে ছবি আমরা দেখানোর চেষ্টা করেছি তার থেকে আমাদের কাছে বিদেশীদের যে ফিডব্যাক হচ্ছে, তারা খুব খুশি হয়েছেন এমন সুযোগ করে দেয়ার জন্য।
উল্লেখ্য, গত ৭ থেকে ১০ এপ্রিল রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে বিনিয়োগ সম্মেলন-২০২৫। দেশী-বিদেশী কমপক্ষে সাড়ে চার শ’র মতো বিনিয়োগকারী অংশ নিয়েছিলেন এই আয়োজনে। চার দিনের এই সম্মেলনে বাংলাদেশে বিনিয়োগের অমিত সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন আয়োজকরা, তরুণ প্রজন্মকে সামনে রেখে ২০৩৫ সালের রূপরেখা তুলে ধরেন তারা। ফলশ্রুতিতে অধীর আগ্রহ দেখিয়েছেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে সম্মেলনে।



