আমিনুল ইসলাম
দীর্ঘ ১৫ বছর স্বামীর পথ চেয়ে আছেন ফরিদা বেগম। তিন সন্তানকে বুকে আগলে রেখে নিদারুণ কষ্ট নিয়ে অপেক্ষা করছেন স্বামী মো: আবদুস সালামের। ফরিদার বিশ্বাস আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে ১৫ বছর কেন, ৪০ বছর পরও ফিরে আসতে পারেন তার স্বামী। তাই তো তার সন্ধান আজও বন্ধ করেননি।
যদিও ফ্যাসিবাদ শেখ হাসিনা সরকারের প্রতিটি দফতরে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণে মাঝে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর স্বামীকে ফিরে পেতে নতুন করে আশা জেগেছে তার। আত্মবিশ্বাস আরো বেড়ে যায় যখন দেখেন আয়নাঘর নামক কিছু স্থান থেকে গুম হওয়া অনেকেই ফিরে আসছেন। এসব দেখে সন্তানরাও বাবাকে দেখতে পাবে বলে আশায় বুক বাঁধছে। বাবা সম্পর্কে মায়ের কাছে নতুন করে জানতে চাইছে। তবে তাদের বাবা ফিরে আসা-না-আসা সম্পর্কে এখনো কিছুই বলতে পারছেন না। নারায়ণগঞ্জের পাগলার বিএনপি নেতা ও ব্যবসায়ী আবদুস সালামের স্ত্রী ফরিদা বেগম এভাবে কথাগুলো বলছিলেন।
ফরিদা নয়া দিগন্তকে বলেন, আবদুস সালাম বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। কোনো পদ না থাকলেও এলাকায় তার একটা সম্মান ছিল। বিচার সালিসে তিনি বড় ভূমিকা রাখতেন। পেশায় কাপড় ব্যবসায়ী ছিলেন। তার আয়ে গোটা পরিবার ভালোভাবেই চলে যেত। তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট ছেলে সাব্বির হোসেনের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। সন্তানদের নিয়ে হেসে-খেলেই চলে যেত তাদের। হঠাৎই এক ঝড়ে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।
ফরিদা বলেন, ২০১০ সালের মে মাসে আবদুস সালাম তার এক আত্মীয়ের বাড়ি খাগড়াছড়ির মোহনছড়ি বেড়াতে যান। ১৩ তারিখ রাত ১টা একটি হায়েস গাড়িতে করে কয়েকজন র্যাব সদস্য যান ওই বাড়িতে। তারা নিজেদের র্যাব পরিচয় দিয়ে আমার স্বামীকে জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। ওই সময় আমি নারায়ণগঞ্জে। আমাকে রাতেই ফোন দিয়ে সব জানানো হয়। পরদিন মোহনছড়ির সেই বাড়িতে গিয়ে দেখি বাড়ির ১০০ গজ দূরেই সেনাবাহিনীর ক্যাম্প। আমি সেখানে চলে যাই। সেনাবাহিনীর সদস্যরা বলেন, এ ব্যপারে তারা কিছু জানেন না। লোকাল থানায় যোগাযোগ করতে বলেন। থানায় গেলে একটি জিডিও গ্রহণ করেনি। পুলিশ জানিয়ে দেয় ‘আপনারা র্যাব-৭ এ যোগাযোগ করেন। সেখান থেকে র্যাব-৭ এর অফিসে গিয়ে আমার স্বামীর ছবি দেখাই। ঘটনা খুলে বলি। তারা আমাকে বলেন, আমরা এই লোককে চিনি না। এখানে এ ধরনের কাউকে আনা হয়নি। আপনারা অন্য কোথাও চেষ্টা করেন।
ফরিদা বলেন, যখন সবাই একে একে ফিরিয়ে দিচ্ছিল তখন কান্নায় বুক ভেঙে যাচ্ছিল। যারা আইনের মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত তারাই আমাকে এভাবে ফিরিয়ে দিচ্ছে। তাহলে আমার স্বামী কোথায়? কেমন আছেন তিনি। অপরিচিত জায়গা মোহনছড়ির অনেক জায়গায় দৌড়ঝাঁপ করে কোনো লাভ হয়নি। এরপর ঢাকা এসে পুলিশ সদর দফতর, র্যাব সদর দফতরসহ বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটি করেছি। স্বামীকে খুঁজে দেয়া দূরে থাক, কেউ একটু সহযোগিতাও করেননি। তাদের আচরণ ব্যবহার দেখে খুবই হতাশ হয়েছি। ভেবেছি এ ফ্যাসিবাদের আমলে মনে হয় আমার স্বামীকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই আশায় থাকলেও মাঝে অনেকই হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর নতুন করে স্বামীর সন্ধানে নেমে পড়ি। এর মধ্যে কয়েকটি আয়নাঘর থেকে কয়েকজন জীবিত ফিরে আসায় নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। সন্তানরাও যেন নতুন করে বাবাকে আবিষ্কার করছে। বিশেষ করে ছেলেটা ছিল দুই বছরের। বাবা সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই।
এক প্রশ্নের জবাবে ফরিদা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার সাজানো সংসার তছনছ হয়ে গেছে। তিন সন্তান নিয়ে খেয়ে বেঁচে থাকাই দুরুহ হয়ে পড়েছে। আভারের কারনে ছেলেকে পড়ালেখা থেকে ছাড়িয়ে এনে কাজে পাঠাতে হয়েছে। বড় মেয়ের বিয়ে হলেও মেঝো মেয়েটা বছর ধরেই অসুস্থ থাকে। ছোটবেলায় টাইফয়েড হওয়ার পর থেকেই মেয়েটা আর সুস্থ হতে পারেনি। আত্মীয়স্বজন আর কত সাহায্য করবে। এক দিন মারা গেলে সবাই এসে কান্নাকাটি করে কাফন-দাফন করে। কিন্তু প্রতিদিন মারা গেলে কেউ এগিয়ে আসে না। এটিই জগতের নিয়ম।
তিনি বলেন, অনেক কষ্ট করে স্বামীর পথ চেয়ে আছি, আল্লাহ যেন ওই জালিমদের কবল থেকে আমার স্বামী রক্ষা করে আমাাদের কাছে ফিরিয়ে দেন। সবার কাছে এই দোয়া চাই।



