শ্মশান ঘাটে গরুর হাট!

Printed Edition

ত্রিশাল বাজারের দণি পাশে সুতিয়া নদীর ওপর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে একটি ব্রিজ রয়েছে। এই ব্রিজের পশ্চিম পাশেই নদীর ধারে একটি শ্মশান ঘাট। এই শ্মশান ঘাট ঘিরে শোনা যায় যতসব ভুতুড়ে ঘটনা। এলাকাবাসীর মুখে শোনা কিছু ভুতুড়ে ঘটনার কথা জানাচ্ছেন মো: মাঈন উদ্দিন মৃধা

ত্রিশাল বাজার ও আশপাশের যত হিন্দুধর্মের লোক রয়েছে সবার মৃতদেহ সৎকার করার জন্য একটিমাত্র শ্মশান ঘাট। পুরো ত্রিশাল থানার মধ্যে এই শ্মশান ঘাটেই সবচেয়ে বেশি মৃতদেহ সৎকার করা হয়। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের এই ব্রিজের ওপর দাঁড়ালে এখনো এই শ্মশান ঘাট ভূতের আখড়া মনে হয়। মনে হয় শত শত পোড়া কালো-লাশ মুখথুবড়ে পড়ে আছে। পড়ে আছে তাদের হাজারো দুঃখ-বেদনা উপুড় হয়ে। একে-অপরের সাথে জড়াজড়ি করে। আজও এলাকার প্রবীণ মানুষের মুখে এই শ্মশান ঘাট কেন্দ্র করে নানান কাহিনী শোনা যায়, যা নবীনদের কাছে কিচ্ছা-কাহিনীর মতো। যে কাহিনী নবীনদের গায়ে শিহরণ জাগায়। পায়ে কাঁপন ধরায়।

আব্দুস সালাম এলাকার একজন ভ্যানচালক। বয়োবৃদ্ধ এই ভ্যানচালক বলেন, তখন তো ভ্যানের প্রচলন ছিল না। আমাদের এলাকায় দু-একটা রিকশা এসেছে মাত্র। তার মধ্যে একটি রিকশা আমি চালাতাম। প্রায় ৩০-৪০ বছর আগে ত্রিশাল বাজারে এত লোকজনের যাতায়াত ছিল না, যেমনটা এখন। রাতে তো দূরের কথা, দিনের বেলায়ও লোকজন একা শ্মশান ঘাটের আশপাশে আসত না। শ্মশান ঘাট বা তার আশপাশের এলাকা সর্বদা জনশূন্য থাকত। শ্মশান ঘাট থেকে খানিক দূরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দিয়ে মানুষজন বাজারে আসা-যাওয়া করত। এক রাতের ঘটনা। অবশ্য তখন রাত বেশি হয়নি। সম্ভবত ৮টা হবে। সন্ধ্যা থেকে অনেক বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টি একটু থামল। বাজার থেকে একজন লোক নিয়ে ফিরছি। লোকটি বলল, তালতলা বাজারে যাবো। যদিও তালতলার পাশেই আমাদের বাড়ি কিন্তু লোকটিকে চিনলাম না। ভেবেছিলাম হয়তো কারো আত্মীয় হবে। তাই পরিচয় জিজ্ঞাস করিনি। কিন্তু এই শ্মশান ঘাটের কাছে এসে ঘটে গেল এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড। লোকটি আমাকে বলল, আপনার ভাড়াটা নিন। পাঁচ টাকা ভাড়া নিয়ে পকেটে রাখলাম। রিকশার নিচে মিটমিট করে হারিকেনের আলো জ্বলছিল। হঠাৎ করেই আলো নিভে গেল। ‘হারিকেনটা নিভে গেল কেন?’ বলে রিকশা থেকে নামলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি রিকশা ফাঁকা। যাত্রী নেই। নেই তো নেই-ই। আমি চমকে উঠলাম। আমার শরীর ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে এলো। হঠাৎ দেখি লোকটি শ্মশান ঘাটের দিকে হাঁটছে! সে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। অন্ধকারের মধ্যেও দেখতে পেলাম সে হাসছে। তার সাদা দাঁতগুলো স্পষ্ট দেখতে পেলাম। পকেটে হাত দিয়ে দেখি তার দেয়া টাকাটাও নেই। ভয়ে আমার হাত-পা অবশ হয়ে এলো।

তিনি শোনালেন আরেক ঘটনা। তখন রাত ১২টা বাজে। তখনকার দিনে রাত ১২টায় বাজারে সাধারণত লোকজন থাকত না। দু-একজন ব্যবসায়ী থাকত যারা রিকশা দিয়ে বাড়ি ফিরত। আমি দু’জন যাত্রী নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরছিলাম, যারা আমার পরিচিত। শ্মশান ঘাটের পাশে ব্রিজের ওপর রিকশা নিয়ে উঠতেই বিকট শব্দ হলো। মনে হলো টায়ার ফাটা শব্দ। সামনে তাকাতেই দেখি ব্রিজটা ভাঙা। আমি আশ্চর্য হলাম- ব্রিজ হঠাৎ ভাঙল কেমন করে! অথচ আসার সময় দেখলাম ব্রিজ ভালো। এখন ভাঙা! আমি চিৎকার করে বললাম, ওই দেখুন ব্রিজ ভাঙা! কিন্তু যাত্রীরা বলল, তুমি পাগল হয়ে গেছ! কোথায় ভাঙা? আমি দেখছি ভাঙা, যাত্রীরা দেখছে না। এর পরই যাত্রীরা চিৎকার করল, আব্দুস সালাম, শ্মশান ঘাটে ওই দেখো মূর্তি! কিন্তু আমি কোনো মূর্তি দেখতে পেলাম না। আমি দেখছি ব্রিজ ভাঙা। যাত্রীরা দেখছে না। আর যাত্রীরা দেখছে শ্মশান ঘাটে সাদা মূর্তি, অথচ আমি দেখছি না। সব মিলে আমরা তিনজনেই ভয়ে মরমর অবস্থা। ভাগ্য ভালো, একটি বাস এসে এখানে থেমে গেল। চার-পাঁচজন লোক নামল। এরপর সব স্বাভাবিক হলো কিন্তু আমাদের মনের ভেতর তখনো কি যেন লাফাচ্ছিল। কালেমা পড়তে পড়তে বাকি পথ চলে আসি।

শ্মশান ঘাটের অদূরে বাদল রায়ের বাড়ি। তিনি বলেন, একদিন সন্ধ্যার পরপর আমি বাড়ির পূর্বপাশে বসেছিলাম। হঠাৎ কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। চাপা কান্না। তাকিয়ে দেখি কোনো এক মহিলা কান্না করছে। তার মুখটা আমি দেখতে পাচ্ছি না। এক-পা দু-পা করে এগিয়ে গেলাম। মহিলাও হাঁটা ধরল। আমি কৌতূহলী হয়ে দ্রুত হাঁটলাম। মহিলাও হাঁটার গতি বাড়াল। দেখলাম মহিলাটি শ্মশান ঘাটে নেমে গেল। কোনো এক সম্মোহনি শক্তির আকর্ষণে আমিও শ্মশান ঘাটের কাছে চলে এলাম। মহিলা শ্মশান ঘাটের পানিতে নেমে গেল এবং ধীরে ধীরে পানির নিচে তলিয়ে গেল। আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। আমি স্বাভাবিক হলাম। বুঝতে পারলাম, কোনো অশরীরী আমাকে বশ করে ফেলেছে। আমি দ্রুত চলে এলাম শ্মশান ঘাট থেকে।

ওসমান গনি, একজন কৃষক। অনেকগুলো গরু তার। তিনি শোনালেন আরেক কাহিনী। আমি তখন সকাল-বিকেল ঘাস কাটতাম। অনেক গরু। বুঝতেই পারছ। তো একদিন যথারীতি ঘাস কাটছি। শ্মশান ঘাট থেকে খানিকটা দূরে। তখন অবশ্য দুপুরবেলা। বোশেখ মাস। রোদে খাঁ খাঁ করছে চারিদিক। আমার মাথায় গামছা, পরনে লুঙ্গি, উদোম গা, হাতে কাঁচি। এক আইল থেকে ঘাস কেটে আরেক আইলে যাবো, এমন সময় চোখ গেল শ্মশান ঘাটের দিকে। একি! শ্মশান ঘাটে এগুলো কী! চোখে আসা ঘাম মুছে আবার তাকালাম। না, আমার চোখ ভুল দেখেনি। শত শত গরু শ্মশান ঘাটে। প্রত্যেক গরুর সাথে একজন লোক। আবার ক্রেতাও দেখছি। জনগণের কোলাহল আমার কানে আসছে। কিন্তু এ কিভাবে সম্ভব। শ্মশান ঘাটে গরুর হাট! আবার আমি এও বুঝতে পারছিলাম এটা হয়তো আমার মাথার সমস্যা অথবা কোনো ভুতুড়ে কাণ্ড। এই গরমের মধ্যেও ভয়ে আমার শরীর হিম হয়ে এলো। ঘাসের খাঁচি মাথায় নিয়ে দ্রুত ছুটলাম বাড়ির দিকে। আমার বড় ছেলে ও স্ত্রীকে বললাম। তারা বলল, তোমার মাথায় গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে। ওদের নিয়ে দৌড়ে এলাম। কিন্তু কোথায় গরু। কোথায় মানুষ। শূন্য শ্মশান। সুনসান নীরবতা চারিদিকে। এখন অবশ্য এরকম ভুতুড়ে ঘটনার কথা আর শোনা যায় না। শহরায়নের প্রভাবে শ্মশান ঘাটের পাশেই গড়ে উঠেছে বড় বড় ইমারত। লোকে গিজগিজ করে দিবা-রাত্রি সারাণ।

লেখক : সেকশন অফিসার, রেজিস্ট্রার দফতর

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ত্রিশাল, ময়মনসিংহ