মো: বজলুর রশীদ
ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় দু’টি শপথ করেছিলেন গাজা ও ইউক্রেনের যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য। যদি হামাস সব ইসরাইলি বন্দীকে মুক্তি না দেয় ও চুক্তি না করে তাহলে গাজায় আরো দুর্যোগ নেমে আসবে এবং রাশিয়া-ইউক্রেন শান্তি চুক্তি না হয় তবে উভয় দেশকে মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে। ইউক্রেন যুদ্ধ ও শান্তি প্রক্রিয়া ভিন্ন মোড় নিয়েছে। জেলেনস্কির ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করার কথা উঠেছে। জেলেনস্কি-ট্রাম্প বাগ্যুদ্ধ হয়েছে, অন্য দিকে রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র কঠিন সম্পর্ক থেকে বোঝাপড়ার অবস্থানে চলে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ না হওয়ায় ট্রাম্প জেলেনস্কিকে এককভাবে দায়ী করেছেন। মিস্টার ট্রাম্প তাকে একগুঁয়ে, একনায়ক ইত্যাদি বলেছেন এবং এ-ও বলেছেন, একসময় পুরো ইউক্রেন রাশিয়ার হয়ে যাবে। তিনি জেলেনস্কিকে বলেছেন, পুতিনের কাছে ক্ষমা চেয়ে টিকে থাকার জন্য এবং হারানো ভূখণ্ড পাওয়ার আশা ছেড়ে দেয়ার জন্য।
পুতিন ইউক্রেন আক্রমণ করায় পশ্চিমারা অনেকটা ভীত। ক্রেমলিনের এ ধরনের পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় জো বাইডেন যুদ্ধের হুমকি দিয়ে, অস্ত্রসহায়তা দিয়ে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নানা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এবং বিদেশী ব্যাংকগুলোতে রাশিয়ার অর্থ বাজেয়াপ্ত করে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত করেছেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সম্প্রতি ন্যাটো। তারা ভয় করছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর পুতিন আবার সে দিকে ফিরে যাচ্ছেন এবং একটি শক্তিশালী ইউনিয়নে পরিণত করতে চাচ্ছেন। পুতিন ইউক্রেনে আক্রমণ করে, গুরুতর সামরিক পরিণতি ভোগ না করেই নির্দিষ্ট অঞ্চলটি সুরক্ষিত করছেন। এখন পুতিন সরাসরি কিয়েভে আক্রমণ চালাচ্ছেন। তার সোজা কথা, দখলকৃত শহরগুলো, যেগুলো রাশিয়াকরণ করা হয়েছে সেগুলোর দাবি ছেড়ে দিলে তিনি যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে অনেক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তবে তা দিয়ে পুতিনকে দমন করা এত সোজা নয়। বহু দেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে পুতিন প্রমাণ করেছেন, তিনি কোনো সাধারণ খেলোয়াড় নন।
রাশিয়ার সাথে চলমান সঙ্ঘাত নিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদেমির জেলেনস্কিকে বেশ কয়েকবার সতর্ক করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প জেলেনস্কিকে রাশিয়ার সাথে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে দ্রুত আলোচনার কথা বলেছেন। তিনি আরো ধ্বংস ও প্রাণহানি রোধে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর ওপর জোর দিয়েছেন। ট্রাম্প জেলেনস্কির নেতৃত্বের সমালোচনা করে, তাকে ‘নির্বাচন ছাড়া একনায়ক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, জেলেনস্কির নির্বাচন অনুষ্ঠানের অস্বীকৃতি এবং তার জনপ্রিয়তার নিম্নহার সঙ্কট গভীরতর করেছে। ট্রাম্প জেলেনস্কির বিরুদ্ধে মার্কিন সহায়তার অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ এনেছেন এবং দাবি করেছেন, ইউক্রেনে পাঠানো তহবিলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ‘হিসাব’ বা অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সমর্থন বৃহত্তর আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর নির্ভর করতে পারে। অবশ্য তিনি ইউক্রেনকে দেয়া মার্কিন সহায়তার পরিমাণ অনেক বাড়িয়ে বলেছেন যা সত্য নয়। তার চেয়েও বড় কথা, হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানিয়ে ট্রাম্প ও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে প্রকাশ্যে চাপ দিয়েছেন, যা কোনোভাবেই শিষ্টাচারের আওতায় থাকেনি। ট্রাম্পের এই সমঝোতার মরিয়া চেষ্টার পেছনে ইউক্রেনের কল্যাণের কোনো বিষয় নেই, বরং নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষা করাই তার লক্ষ্য। ইউক্রেনের একটি বিশেষ কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা আছে।
ট্রাম্প আরো ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে তার দৃষ্টি সরিয়ে চীনের মতো অন্যান্য কৌশলগত শক্তির দিকে অগ্রাধিকার সরিয়ে নিতে পারে। জেলেনস্কি সঙ্ঘাত নিরসনে পদক্ষেপ না নিলে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন কমে যেতে পারে। এ সতর্কতাগুলো ইউক্রেন সঙ্কটের প্রতি ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, জেলেনস্কি ট্রাম্পের সতর্কবার্তা অনুধাবন করতে পারেননি।
চলমান সঙ্ঘাতের কারণে ইউক্রেন প্রকৃতপক্ষে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। অবকাঠামো ধ্বংস, প্রয়োজনীয় সম্পদের ঘাটতি ও অঞ্চল হারানোর ফলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখানে ইউক্রেনের অদূর ভবিষ্যতের জন্য কিছু সম্ভাব্য পরিস্থিতি রয়েছে : সঙ্ঘাত অব্যাহত থাকলে ইউক্রেন গুরুতর মানবিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে থাকবে। চলমান যুদ্ধ সম্পদের ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করবে, আরো বেশি মানুষকে বাস্তুচ্যুত করবে এবং দেশ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হবে। ইউক্রেনের ভবিষ্যত ব্যাপকভাবে নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক সমর্থনের ওপর। পশ্চিমা দেশ ও মিত্রদের অব্যাহত সামরিক, আর্থিক ও মানবিক সহায়তা ইউক্রেনকে রাশিয়ার আগ্রাসন প্রতিহত করতে এবং এর অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে সহায়তা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ইউক্রেনের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের সহায়তা দরকার। বর্তমান ক্রান্তিলগ্নে ইইউ সেই ভূমিকা পালন করছে। ‘ড্রোন সোয়ার্ম’ তৈরি এবং ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বিস্ফোরক উৎপাদন কারখানা প্রতিষ্ঠার মতো উদ্যোগ এর সামরিক সক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর পদক্ষেপ। শান্তি চুক্তির জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ। আলোচনার মাধ্যমে একটি নিষ্পত্তি যুদ্ধবিরতির দিকে পরিচালিত করতে পারে এবং দেশ পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি কাঠামো সরবরাহ করতে পারে। তবে এর জন্য উভয়পক্ষের উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং ছাড়ের প্রয়োজন হবে। ইউক্রেনের পুনর্গঠন একটি বিশাল উদ্যোগ, যার জন্য যথেষ্ট বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন। দেশটির অর্থনৈতিকভাবে পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা নির্ভর করবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবর্তন এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য ও বিনিয়োগের স্তরের ওপর। একটি স্থিতিশীল ও স্বাধীন ইউক্রেন ইউরোপের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন যাতে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। এসব পরিস্থিতি ইউক্রেনের ভবিষ্যতের জটিল ও বহুমুখী প্রকৃতিকে তুলে ধরবে বলে মনে হচ্ছে। দেশটির স্থিতিস্থাপকতা, আন্তর্জাতিক সমর্থন ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা দেশটির সামনের পথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
রাশিয়া যদি জেলেনস্কির দাবি উপেক্ষা করে তবে বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য পরিণতি দেখা দেবে, প্রধান হলো অব্যাহত সঙ্ঘাত। তাতে ইউক্রেনে আরো ধ্বংস, প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি হতে পারে। চলমান সঙ্ঘাত উভয়পক্ষের সম্পদ এবং মনোবলের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পশ্চিমা দেশ ও মিত্ররা রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে, যা রাশিয়াকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে আরো বিচ্ছিন্ন করে তুলতে পারে। এসব নিষেধাজ্ঞা জ্বালানি, অর্থ ও প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। অন্য দিকে ইউক্রেনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে ন্যাটো ও ইউরোপীয় মিত্রদের সামরিক সহায়তা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশটিতে বিভিন্ন শক্তি গেম প্লে করার মাঠটিকে আরো প্রসারিত করবে। ফলে রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলবে। উত্তর কোরিয়া সেনা ও অস্ত্রসহায়তা আরো বাড়িয়ে দেবে। রাশিয়া আরো কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হতে পারে। এর ফলে বিশ্বমঞ্চে রাশিয়ার প্রভাব সীমিত হতে পারে এবং জোট গঠনের ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে।
চলমান সঙ্ঘাতের মধ্যে ইউক্রেনের জন্য সমর্থন ও সহায়তা নিশ্চিত করতে জেলেনস্কির দৌড়ঝাঁপ আন্তর্জাতিক সফর ও কৌশলের অংশ। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের নেতাদের সাথে সামরিক ও মানবিক সহায়তা আদায়ের জন্য বৈঠক করছেন। যদিও এসব প্রচেষ্টা ইউক্রেনের সব চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি সমাধান করতে পারবে না, তবে তারা ইউক্রেনের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য জোট গঠন এবং সংস্থান সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি এবং ফলাফল বিভিন্ন কারণের ওপর নির্ভর করবে, যার মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ও বিবর্তিত ভূরাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ রয়েছে। রাশিয়া কখনো দখলকৃত ভূমি ফেরত দেবে না। ইইউ দেশগুলো মনে করে রাশিয়া চূড়ান্তভাবে জয়ী হলে তারা বিপদগ্রস্ত ও অনিরাপদ হয়ে পড়বে। তাই তাদের জোটে অংশ নিতে হবে। সেটি এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। যুদ্ধ চার বছরে পড়েছে। ক্রেমলিন সবার সাথেই গেম প্লে করছে। এ অবস্থায় ইউক্রেন আবারো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ফিরে যেতে বাধ্য হবে, জেলেনস্কিকে শেষ পর্যন্ত হয়তো ট্রাম্পের সাথেই বোঝাপড়া করতে হতে পারে। কারণ এর বাইরে গেলে তাকে কঠোর পরিণতির জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার



