তাঁত বিলুপ্ত হলেও নকল রুহিতপুরী লুঙ্গিতে বাজার সয়লাব

Printed Edition
লুঙ্গি তৈরিতে ব্যস্ত এক তাঁতি : নয়া দিগন্ত
লুঙ্গি তৈরিতে ব্যস্ত এক তাঁতি : নয়া দিগন্ত

ঢাকা জেলা প্রতিনিধি

কাঁচামালের অভাব, রং, সুতা, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি ও মেশিনের যাঁতাকলে বিলুপ্ত হয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী রুহিতপুরী লুঙ্গি তৈরির তাঁত । এক সময় যেখানে ৫ হাজার তাঁত ছিল সেখানে এখন মাত্র ৮টি লুঙ্গি তৈরির তাঁত রয়েছে । অথচ নকল রুহিতপুরী লুঙ্গিতে বাজার সয়লাব । সিরাজগঞ্জ থেকে লুঙ্গি এনে রুহিতপুরের স্টিকার লাগিয়ে একেকটি লুঙ্গি ১৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি করছে অসাধুচক্র । রুহিতপুরের প্রতিটি লুঙ্গি তৈরিতে ১ হাজার ৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয় । অথচ অসাধু ব্যবসায়ীরা পাবনা ও সিরাজগঞ্জ থেকে মেশিনের তৈরি লুঙ্গি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় কিনে এনে রুহিতপুরের স্টিকার লাগিয়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি করছে। এভাবে দিনে দিনে সাধারণ মানুষ যেমন নকল রুহিতপুরী লুঙ্গি ক্রয় করে প্রতারিত হচ্ছে। তেমনি ভেজালের দাপটে হারিয়ে গেছে আসল তাঁতের তৈরি রুহিতপুরি লুঙ্গি । কেন এমন হলো জানতে চাইলে রুহিতপুরের নারায়ণ পট্টি গ্রামের বাসিন্দা মো: শরিফ হোসেন জানান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলার রুহিতপুর ইউনিয়নের নারায়ণ পট্টি, রামের কান্দা, সোনাকান্দাসহ ১০-১২টি গ্রামে তাঁতের রহিতপুরি লুঙ্গি বুনানো হতো। তখন ৪ থেকে ৫ হাজার তাঁত ছিল । গ্রামের প্রতিটা ঘরে ঘরে পরিবারের ছেলে-মেয়ে, মা বাবা, ভাই, বোন সবাই মিলে কাজ করতো । সব মিলিয়ে ১০-১২ হাজার লোক এ পেশার সাথে জড়িত ছিল। দেশের মানুষ ঐতিহ্যবাহী লুঙ্গি হিসেবে রুহিতপুরি লুঙ্গিকেই চিনতো। তিনিও তখন তাঁতে লুঙ্গি বানাতেন। ১৯৯৬ পরবর্তী সময়ে ভারত থেকে সুতা ও লুঙ্গি আমদানি করা হয়। ভারতীয় নিম্নমানের রঙচটা কমদামি সুতা ও লুঙ্গির কাছে দেশীয় সুতা এবং হাতে বুনানো লুঙ্গি বাধাগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে লুঙ্গি তৈরিতে দেশীয় সুতা তৈরির কারখানাগুলো হোঁচট খায়।

আস্তে আস্তে কমতে থাকে রুহিতপুরের তাঁত

রহিতপুরের নারায়ণপট্টি গিয়ে দেখা যায়, শরীফ নামের একজন মালিকের ৬টি তাঁত রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি চালু আছে ১টি শ্রমিকের অভাবে বন্ধ রয়েছে। রামের কান্দা গ্রামের আব্দুল হাকিমের ১টি ও রুহিতপুরের মো: ওমরের ১টি তাঁত রয়েছে ।

কথা হয়, শরিফ লুঙ্গির তাঁতি বোরহানউদ্দিন, মোহাম্মদ আলী ও মো: শামসুল আলমের সাথে। এই তিনজনসহ মোট ১০ থেকে ১২ জন তাঁতি আছেন, যারা এখনো হাতে লুঙ্গি বুনানোর কাজ করেন । তাঁতি মোহাম্মদ আলী জানালেন, তারাই শেষ প্রজন্ম । তারা মারা গেলে হারিয়ে যাবে রুহিতপুরি লুঙ্গি। তখন হয়তো জাদুঘরে খুঁজতে হবে। কারণ হিসেবে বলেন, এ পেশায় শ্রমের মূল্য কম হওয়ায় নতুন করে কেউ এই পেশায় যুক্ত হয়নি। এলাকার যুবকদের মধ্যে ৯০% লোক বিদেশে কর্মরত। তারা দেশে আসার পরে ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা অন্য পেশায় যুক্ত হয়ে পড়েন। আমরা বাপ-দাদার আমল থেকে এ কাজটা শিখেছি। আমাদের সন্তানরা কেউ এ কাজ শিখতে রাজি হয়নি । তাঁত শিল্পে মজুরি কম । মেশিনে লুঙ্গি তৈরিতে সময় লাগে কম। যেখানে এক থান লুঙ্গি হাতে তৈরিতে সময় লাগে দুই দিন। ১ থানে চারটা লুঙ্গির মজুরি হিসেবে আমরা পেয়ে থাকি মাত্র ৬০০ টাকা। সেখানে মেশিনে একদিনে ২৫ থেকে ৩০টা লুঙ্গি তৈরি হয়। যে কারণে মেশিনে তৈরির লুঙ্গির দাম খুবই কম। শ্রমিক লাগে কম, মজুরি পাচ্ছে বেশি। রিকশা চালালিয়েও মানুষ এক হাজার টাকা ইনকাম করছে। আর আমরা দুই দিনে পাচ্ছি মাত্র ৬০০ টাকা। তাই এ পেশায় নতুন করে শ্রমিক না আসায় এবং রং ও সুতার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় রুহিতপুরের তাঁত শিল্প হারিয়ে গেছে ।

তাঁতি মো: সামসুল আলম জানান, তারা সারাদিন কষ্ট করেও তেমন মজুরি পাচ্ছে না অথচ মানুষ ধোঁকা খাচ্ছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা সিরাজগঞ্জ ও পাবনা থেকে লুঙ্গি এনে রুহিতপুরী স্টিকার লাগিয়ে বেশি দামে বিক্রি করে সাধারণ কাস্টমারকে ধোঁকা দিচ্ছে। রুহিতপুরের তৈরি লুঙ্গি প্রতি একটি ১ হাজার ৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা দামে বিক্রি হয় । অথচ অসাধু ব্যবসায়ীরা পাবনা ও সিরাজগঞ্জ থেকে মেশিনের তৈরি লুঙ্গি এনে রুহিতপুরের স্টিকার লাগিয়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি করছে। এভাবে দিনে দিনে মানুষ যেমন, প্রতারিত হচ্ছে, তেমনি রুহিতপুরের শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে।

রামের কান্দা গ্রামের তাঁতের মালিক আব্দুল হাকিম জানান, মেশিনের তৈরি লুঙ্গির কাছে তাঁত শিল্প বিধস্ত। মেশিনে খুব দ্রুত লুঙ্গি তৈরি হয়। হাতে বুনানো লুঙ্গি তৈরিতে দেড় থেকে দুই দিন লাগে। প্রথমে সুতোয় মাজন দিতে হয়। সুতার দানা বানাইতে হয়। সানা বানাইতে হয়। (বিশেষ লোহার পাত)’ ব’ বানাইতে হয়, একেক ঘরে এক একটি করে সুতা ব’য়ের মধ্যে পেঁচানো লাগে। এরপর ভিম পেঁচানো লাগে। আবার সুতার দানা খোলাতে হয়। এক একটি সুতা এক একটা নালে ঢুকিয়ে দিতে হয়, এমন অনেক কারু কাজের মাধ্যমে রুহিতপুরের হাতে বোনা লুঙ্গি তৈরি হয়। তিনি বলেন, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা থেকে মেশিনের তৈরি লুঙ্গি কম দামে এনে রহিতপুরি স্টিকার লাগিয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু আমরা মানুষের সাথে এ ধরনের প্রতারণা করতে পারি না তাই আমরা হারিয়ে যাচ্ছি।

রুহিতপুরের নারায়ণ পট্টি এলাকায় ছয়টি তাঁতের মালিক মো: শরীফ হোসেন। তিনি জানান তাঁতের লুঙ্গির চেয়ে মেশিনে তৈরির লুঙ্গির দাম কেন কম? তিনি জানালেন, মেশিনের তৈরি লুঙ্গিতে যে সুতা ব্যবহার হয় তা মোটা। হাতে বুনানো লুঙ্গির সুতা ৮০ থেকে ৮০ কাউন্ট হতে হয়। অন্য দিকে মেশিনে তৈরি সুতা ৫০/৪৮/৬০ কাউন্ট হয়ে থাকে। এক থান কাপড় তৈরিতে দুই দিন সময় লাগে। অন্য দিকে একটা মেশিনে দিনে ৩০ থেকে ৪০টি লুঙ্গি বের হয়। তিনি বলেন, আমি নিজে ব্যবসার সাথে জড়িত, রুহিতপুরের রামের কান্দা বাজারে আমার প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাই আমি এই তাঁত শিল্প ধরে রেখেছি। আমার ছয়টি তাঁতের বাইরে যে দুটি দাঁত রয়েছে, তারাও আমাকে লুঙ্গি বানিয়ে দেয়।

তিনি বলেন, স্বাধীনতা উত্তর পরবর্তী সময়ে কোনো সরকারই রুহিতপুরের তাঁত শিল্প টিকিয়ে রাখার জন্য উদ্যোগ নেয়নি। যে কারণে হারিয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী রুহিতপুরের লুঙ্গি। সরকার উদ্যোগ নিলে এখনো সময় আছে এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার। যদি সরকারি অনুদান বা সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া যায়, তাহলে শ্রমিকদের মজুরি বাড়িয়ে এই পেশাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব।