চীনের ড্রাগন বোট উৎসব একজন কবির দেশপ্রেম

Printed Edition
ছু ইউয়ান
ছু ইউয়ান

শান্তা মারিয়া

ড্রাগন বোট উৎসবের তিনটি কিংবদন্তি মূলত দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, স্থানীয় জনগণের সহানুভূতি ও ভালোবাসার কথা বলে। এই তিনটি কিংবদন্তি অবলম্বনে চীনে অনেক কবিতা, গান, অপেরা সৃষ্টি করা হয়েছে

প্রাচীন চীনের একজন বিখ্যাত কবি ছিলেন ছু ইউয়ান। তাঁর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ড্রাগন বোট উৎসব নামে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিবসের রীতি রেওয়াজ পালন।

চীনের লোকজ সংস্কৃতি অতি সমৃদ্ধ। বিশাল দেশটিতে উৎসবের শেষ নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ হান জাতির সংস্কৃতির পাশাপাশি রয়েছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর বিশেষ সংস্কৃতি। প্রতিটি জাতির রয়েছে বিশেষ উৎসব, বিশেষ পুরাণ কাহিনী, কিংবদন্তি।

ড্রাগন বোট উৎসব চীনের বিখ্যাত উৎসব। এর চীনা নাম হলো তুয়ান উ চিয়ে। বিশেষ করে মধ্য, পূর্ব ও দক্ষিণ চীনে জাঁকজমকের সঙ্গে ড্রাগন বোট উৎসব উদযাপন করা হয়ে থাকে। বেইজিংয়েও ড্রাগন বোট উৎসব হয় বেশ জাঁকালোভাবে। এই উৎসব চীনের অন্যতম প্রধান উৎসব। এই উৎসবে প্রধানত দেখা যায় নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা এবং বিশেষ ধরনের ডাম্পলিং খাওয়া। এই উৎসবের পিছনে রয়েছে একটি মহান গল্প। এর কতটা ইতিহাস আর কতটা কিংবদন্তি তা এখন আর নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে এই উৎসব যে দুই হাজার বছরের বেশি পুরনো তাতে সন্দেহ নেই।

ড্রাগন বোট উৎসবের সবচেয়ে বেশি প্রচারিত গল্পটি একজন কবির প্রতি জনগণের ভালোবাসার কথা বলে। এই কবির নাম ছু ইউয়ান। ছু ইউয়ান (খ্রিস্টপূর্ব ৩৪০-খ্রিস্টপূর্ব ২৭৮) ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক। তিনি ছিলেন বিখ্যাত কবি। সে সময় চীন দেশ বেশ কয়েকটি সামন্তরাজ্যে বিভক্ত ছিল। রাজ্যগুলোর পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ ও ঝগড়াবিবাদ লেগেই থাকতো। ছু ইউয়ান চু রাজ্যের রাজকর্মচারী ছিলেন। রাজা ও জন্মভূমির প্রতি তার বিশ্বস্ততা ছিল অবিসংবাদিত। অভিজাত রাজপরিবারের সন্তান ছু ইউয়ান ছিলেন রাজার প্রধান পরামর্শদাতা। তিনি চু রাজ্যকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্য রাজাকে বিভিন্ন সুপরামর্শ দিতেন। সে সময় চীনের সাতটি রাজ্য ছিল ছি, চু, ইয়ান, হান, চাও, ওয়েই এবং ছিন। এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল ছিন রাজ্য। ছু ইউয়ান রাজাকে পরামর্শ দেন ছি রাজ্যের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে জোটবদ্ধ হয়ে ছিন রাজ্যের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার।

কিন্তু ছু ইউয়ানের এই পরামর্শ রাজা অগ্রাহ্য করেন। এর পিছনে রয়েছে চিরকালের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। রাজদরবারে ছু ইউয়ানের প্রতিপত্তিতে ঈর্ষান্বিত অন্য মন্ত্রী ও পারিষদরা তার বিরুদ্ধে রাজার কান ভারি করে। রাজা ছু ইউয়ানের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে রাজদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন এবং তাকে নির্বাসনে পাঠান। নির্বাসনে থাকার সময় ছু দেশপ্রেমমূলক অনেক কবিতা লেখেন যার অনেকগুলো এখনও চীনে বেশ জনপ্রিয়। গ্রামবাসী এই কবিকে ভালোবাসতো। তারা তার কবিতা শুনতো এবং তাকে সমাদর করতো। এদিকে ২৭৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ছিন রাজ্য চু রাজ্যের উপর হামলা চালিয়ে রাজধানী দখল করে নেয়। নিজের প্রিয় মাতৃভূমির পরাজয়ের সংবাদ যখন কবির কানে পৌঁছালো তিনি সে দুঃখ সইতে পারলেন না। তিনি মিলোও নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করলেন।

পঞ্চম চান্দ্র মাসের পঞ্চম দিনে এই বিয়োগান্ত ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয় লোকেরা যখন তাদের প্রিয় কবির আত্মবিসর্জনের কথা জানতে পারে তখন তারা নদীতে নৌকা নিয়ে তার মৃতদেহের সন্ধান করতে থাকে। অশুভ আত্মাদের তাড়াতে তারা নৌকার বৈঠা দিয়ে নদীর পানিতে বাড়ি মারে এবং ঢাক পিটিয়ে জোরে জোরে শব্দ করতে থাকে। মাছ যেন কবির মৃতদেহ না খায় এজন্য তারা ভাতের ছোট ছোট পুঁটলি নদীতে ছুড়ে ফেলে। একজন বৃদ্ধ চিকিৎসক নদীতে কিছুটা মদিরা ঢালেন যেন অশুভ দানবরা তা পান করে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং ছু ইউয়ান দানবদের গ্রাস থেকে রক্ষা পান। এই ঘটনার স্মরণে এখনও ড্রাগন বোট উৎসব পালন করা হয়। মধ্য চীনের হুনান প্রদেশে ছাংশা শহরের ৫০ কিলোমিটার উত্তরে মিলোও নদীতে এখনও নৌকা ভাসানো হয়। কালক্রমে এটি নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। ভাতের পুঁটলি নদীতে ছুড়ে ফেলার ঘটনা স্মরণ করে ভাতের ডাম্পলিং বা চোংজি খাওয়া আর মদিরা পান করা ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এসব রীতি রেওয়াজের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় দেশপ্রেমিক কবি ছু ইউয়ানকে।

ড্রাগন বোট উৎসবের পিছনে আরও একটি কিংবদন্তি রয়েছে। সেটি আরও প্রাচীন। চীনের চিয়াংসু এবং চেচিয়াং প্রদেশে এই কিংবদন্তি খুব জনপ্রিয়। এটিও চু রাজ্যের। তবে এটি কবি ছু ইউয়ানের আগের ঘটনা। উ চিশু ছিলেন চু রাজ্যের (৭২২-৪৮১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) অভিজাত এক তরুণ। তার বাবা ছিলেন রাজ পরিবারের বিশ্বস্ত শিক্ষক। রাজাকে তিনি সবসময় সুপরামর্শ দিতেন। কিন্তু রাজার বন্ধুবেশী শত্রুরা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। রাজা ষড়যন্ত্রীদের কথায় এই প্রবীণ শিক্ষককে বন্দী করেন। শুধু তাই নয়, রাজা উ চিশুর বাবা এবং তার বড় ভাই উ শাংয়ের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। বড়ভাই এবং বাবার মৃত্যুদণ্ডের পর প্রাণভয়ে উ চিশু উ রাজ্যে পালিয়ে যান। সেখানে গিয়ে তিনি উ রাজ্যের রাজার প্রিয় পাত্রে পরিণত হন। তিনি উ রাজ্যের রাজাকে পরামর্শ দেন যেন তিনি চু রাজ্য জয় করেন। উ দেশের রাজা যখন চু রাজ্য জয় করে নেন তখন তিনি রাজার সহায়তা করেন। এইভাবে তিনি বাবা ও ভাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেন। উ চিশু রাজদরবারে বেশ প্রতিপত্তিও লাভ করেন।

কিন্তু সুখ কখনও চিরদিন স্থায়ী হয় না। রাজার মৃত্যুর পর রাজকুমার ফুচাই নতুন রাজা হন। তিনি উ চিশুকে পছন্দ করতেন না। রাজ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে উ চিশু নতুন রাজাকে পরামর্শ দেন ইউয়ে রাজ্য জয় করতে। কিন্তু রাজা এই পরামর্শ গ্রহণ করেননি। এদিকে এক পারিষদ ইউয়ে রাজ্যের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে রাজাকে উ চিশুর বিরুদ্ধে উসকানি দিতে থাকেন। এই ঘুষখোর পারিষদের কথা শুনে রাজা তার প্রকৃত মিত্র উ চিশুর বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। রাজা পঞ্চম চান্দ্র মাসের পঞ্চম দিনে উ চিশুকে আত্মহত্যায় বাধ্য করেন। মৃত্যুর আগে উ চিশু রাজাকে বলেন, যেন তার মৃতদেহ থেকে চোখ দু’টি খুলে নিয়ে নগর ফটকে ঝুলিয়ে রাখা হয়। তাহলে তিনি দেখতে পাবেন যে, ইউয়ে রাজ্যের সৈন্যদল কিভাবে উ রাজ্যকে দখল করছে। এর মাধ্যমে উ চিশু ভয়ানক পরিণাম সম্পর্কে রাজাকে সাবধান করে দিতে চান।

কিন্তু রাজা একথায় আরো রেগে গিয়ে উ চিশুর মৃতদেহ সুচৌ নদীতে ছুড়ে ফেলে দিতে আদেশ দেন। উ চিশুর মৃতদেহ সুচৌ নদীতে ফেলে দেয়া হয়। কিন্তু স্থানীয় জনগণ উ চিশুকে ভালোবাসতো। তারা নৌকা নিয়ে তার দেহ খুঁজতে থাকে। এরপর থেকে প্রতি বছর পঞ্চম চান্দ্র মাসের পঞ্চম দিনে তারা উ চিশুর স্মরণে ড্রাগন বোট প্রতিযোগিতা ও অন্যান্য রীতি পালন করে থাকে। উ চিশুর ভবিষ্যদ্বাণীও যথাসময়ে ফলে যায়। পরাজিত ও শত্রুকবলিত রাজা মনের দুঃখে স্মরণ করেন উ চিশুকে। কিন্তু তখন তো আর কোনো উপায় নেই।

ড্রাগন বোট উৎসবের সূচনার পেছনে তৃতীয় যে কিংবদন্তিটি আছে সেটিও বেশ করুণ। প্রাচীনকালে সাও ই (১৩০-১৪৩ খ্রিষ্টাব্দ) নামে এক তরুণী মধ্য পূর্ব চীনের চেচিয়াং প্রদেশে বাস করতেন। সাও ই তার বাবাকে খুব ভালোবাসতেন। এক দিন তার বাবা একটি নদীতে ডুবে যান। বাবার মৃতদেহের সন্ধানে সাও ই আহার নিদ্রা ত্যাগ করে নদীর তীরে ঘুরতে থাকেন এবং মর্মস্পর্শী বিলাপ করতে থাকেন। পঞ্চম চান্দ্র মাসের পঞ্চম দিনে সাও ই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পাঁচ দিন পর পিতা ও কন্যার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। দেখা যায় সাও ই তার বাবার মৃতদেহ জড়িয়ে ধরে আছেন। বাবার প্রতি কন্যার এই মহান ভালোবাসা ও আত্মত্যাগ স্মরণে সেখানে একটি মন্দির নির্মাণ করা হয়। নদীটির নামকরণও করা হয় সাও এর নামে। সাও নদীটি হলো হাংচৌ প্রদেশে প্রবাহিত ছিয়াংথাং নদীর একটি শাখা নদী। সাও ইর স্মরণে উত্তর চেচিয়াং-এ ড্রাগন বোট উৎসব পালন করা হয়।

ড্রাগন বোট উৎসবের তিনটি কিংবদন্তি মূলত দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, স্থানীয় জনগণের সহানুভূতি ও ভালোবাসার কথা বলে। এই তিনটি কিংবদন্তি অবলম্বনে চীনে অনেক কবিতা, গান, অপেরা সৃষ্টি করা হয়েছে।

এ বছর ড্রাগন বোট উৎসব পালিত হচ্ছে ৩১ মে থেকে ২ জুন। ড্রাগন বোট উৎসবে কবি ছু ইউয়ানের জন্য এখনো অনেক স্থানে গান গাওয়া হয়। অনেক অপেরায় তার কাহিনি প্রতিফলিত হয়। চীনের জনগণ এক কবিকে ভালোবেসে এখনো জলাশয়ে ভাসায় ড্রাগন আকৃতির নৌকা।