সফল মুমিনের বিশেষ গুণ

Printed Edition

মাওলানা কাওসার আহমদ যাকারিয়া

ঈমান যাদের আছে, তাদের মুমিন বলে। যারা ইসলামে প্রবিষ্ট হয়েছেন, তাদের ইসলামের যাবতীয় বিষয়ে ঈমান রাখা অপরিহার্য। মুমিনের পরিচয় বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন- ‘মুমিন তো তারাই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে। অতঃপর তাতে কোনো ধরনের সন্দেহ পোষণ করেনি। আর তাদের জীবন ও সম্পদ দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে। প্রকৃতপক্ষে তারাই হলো সত্যনিষ্ঠ’ (সূরা হুজরাত, আয়াত-১৫)।

সূরা মুমিনুনের শুরুতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুমিনের এমনই কিছু বিশেষ গুণ ও বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরেছেন। ইরশাদ হয়েছে- ‘নিশ্চয়ই সফলতা অর্জন করেছ মুমিনরা, যারা তাদের নামাজে আন্তরিকভাবে বিনীত। যারা অহেতুক বিষয় থেকে বিরত থাকে। যারা জাকাত সম্পাদনকারী। যারা নিজ লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে; নিজেদের স্ত্রী ও মালিকানাধীন দাসীদের ছাড়া অন্য সবার থেকে। কেননা এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। তবে কেউ এ ছাড়া অন্য কিছু কামনা করলে তারাই হবে সীমা লঙ্ঘনকারী এবং যারা তাদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং যারা নিজেদের নামাজের পরিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করে। এরাই হলো সেই ওয়ারিছ, যারা জান্নাতুল ফিরদাউসের মিরাস লাভ করবে।

তারা তাতে সর্বদা থাকবে’ (সূরা মুমিনুন, আয়াত: ১-১১)।

উল্লিখিত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনের সাতটি গুণ-বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন :

প্রথম গুণ : যারা তাদের নামাজে আন্তরিকভাবে বিনীত। প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো, মুমিন নামাজে ‘খুশু’ অবলম্বন করে। নামাজ ঈমানের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মুমিনের চক্ষু-শীতলতা। আল্লাহর নৈকট্য লাভের অনেক বড় একটি মাধ্যম। রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘নামাজে রাখা হয়েছে আমার চোখের শীতলতা’ (সুনানে নাসায়ি-৩৯৪০)।

দ্বিতীয় গুণ : যারা অহেতুক বিষয় থেকে বিরত থাকে। মুমিনের বিশেষ একটি গুণ হলো- সে অনর্থক কথাবার্তা থেকে বেঁচে থাকে। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘সুন্দর মুসলিম হওয়ার একটি নিদর্শন হলো, অর্থহীন কাজ ত্যাগ করা’ (তিরমিজি-২৩১৮)।

অহেতুক বিষয় থেকে বেঁচে থাকার সর্বপ্রথম ক্ষেত্র হলো, সব ধরনের গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকা। তেমনি এমন কথা, কাজ, লেখা ও চিন্তা থেকে বেঁচে থাকা, যাতে না দ্বীনি কোনো ফায়দা আছে, না দুনিয়াবি।

তৃতীয় গুণ : যারা জাকাত সম্পাদনকারী। মুমিন জাকাত আদায় করে। জাকাত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ বিধান। হাদিসের ভাষায় ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের একটি। তাই ঈমানের অপরিহার্য দাবি, জাকাত ফরজ হলে তা আদায় করা। জাকাত আদায় না করার ব্যাপারে কুরআন ও হাদিসে কঠিন হুঁশিয়ারি এসেছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- “যারা সোনা-রুপা পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের যন্ত্রণাময় শাস্তির ‘সুসংবাদ’ দাও। যে দিন সে ধন-সম্পদ জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে, তার পর তা দ্বারা তাদের কপাল, পাঁজর ও পিঠে দাগ দেয়া হবে (এবং বলা হবে) এই হচ্ছে সেই সম্পদ, যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভূত করতে। সুতরাং তোমরা যে সম্পদ পুঞ্জীভূত করতে, তা মজা করে ভোগ করো” (সূরা তাওবা, আয়াত : ৩৪-৩৫)।

চতুর্থ গুণ : যারা নিজ লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। মুমিন তার লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। নিজের চাহিদা পূরণের জন্য সে কোনো অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে না। নিজের স্ত্রী ও শরিয়তসম্মত দাসী ছাড়া অন্য কারো সাথে তার চাহিদা পূরণ করে না। এ প্রসঙ্গে আরো ইরশাদ হয়েছে- ‘মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। এটিই তাদের জন্য শুদ্ধতর। তারা যা কিছু করে আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত এবং মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হিফাজত করে’ (সূরা নূর, আয়াত : ৩০-৩১)।

পঞ্চম গুণ : এবং যারা আমানত ও অঙ্গীকার সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকে। মুমিন আমানতের হিফাজত করে। আমানতের হিফাজত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। কুরআন ও হাদিসের বিভিন্ন জায়গায় আমানত হিফাজতের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ করছেন যে, তোমরা আমানত তার হকদারকে আদায় করে দেবে’ (সূরা নিসা, আয়াত-৫৮)।

ষষ্ঠ গুণ : অঙ্গীকার পূর্ণ করা। অঙ্গীকার বলতে প্রথমত, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বোঝায়, যা কোনো ব্যাপারে উভয়পক্ষ অপরিহার্য করে নেয়। এরূপ চুক্তি পূর্ণ করা ফরজ (বাধ্যতামূলক) এবং এর খেলাফ করা বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা তথা হারাম। দ্বিতীয় ধরনের অঙ্গীকারকে ওয়াদা বলা হয়। অর্থাৎ একতরফাভাবে একজন অন্যজনকে কিছু দেয়ার অথবা অন্যজনের কোনো কাজ করে দেয়ার ওয়াদা করা। ওয়াদা পূর্ণ করা ইসলামী আইনে জরুরি ও ওয়াজিব। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ‘আর অঙ্গীকার পূরণ করো। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত-৩৪)।

সপ্তম গুণ : যারা নিজেদের নামাজের পরিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করে। ‘নামাজের রক্ষণাবেক্ষণ করে’ কথাটি ব্যাপক। এর মধ্যে অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত। যেমন- যথাযথভাবে নামাজ আদায় করা, কখনো পড়বে কখনো পড়বে না- এমন নয়। সময়মতো জামাতের সাথে নামাজ পড়া। সব শর্ত, আদব ও নিয়মাবলি রক্ষা করে সুন্দর ও সুচারুরূপে আদায় করা (তাফসিরে কাবির-২৩/২৬৩)।

লেখক : ইসলামী কলামিস্ট, মজলিশপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া