মুহাম্মদ শাহ আলম
দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে একধরনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রতিনিয়ত চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ঘটছে, দখল-চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে ভুক্তভোগীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা মাঠে দৃশ্যমান থাকলেও কাজের কাজ হচ্ছে না। অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। প্রকাশ্যে দল বেঁধে মহড়া দিচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারায় সরকারের মধ্যেও একধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। যার প্রমাণ মেলে শেষ রাতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠানের ঘটনায়। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ৩টার দিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মো: জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএসে নিজ বাসভবনে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন। সেই সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের দোসররা দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। দেশ থেকে সরিয়ে নেয়া বিপুল অর্থ আওয়ামী লীগ এখন দেশকে অস্থিতিশীল করার কাজে ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, সরকার কোনো অবস্থাতেই দেশকে অস্থিতিশীল করতে দেবে না। যেকোনো অবস্থায় এ অপচেষ্টা প্রতিহত করবে সরকার। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এই বক্তব্য উড়িয়ে দেয়া যায় না। আওয়ামী লীগের পলাতক অনেক নেতাই তাদের অডিও-ভিডিও বক্তব্যে বিভিন্ন হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন প্রায়ই সেটি সত্য। এক অডিওতে আওয়ামী লীগের নেতা গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে বলতে শোনা গেছে, ‘আমাদের লোকেরা দিনের বেলায় ঢাকায় শান্তিতে চলাফেরা করতে না পারলে আমরাও ঢাকায় রাতে কাউকে শান্তিতে ঘুমাতে দেবো না।’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার শেষ রাতের এই সংবাদ সম্মেলনের খবরে অনেকেই ধারণা করেছিল, দেশে ভয়াবহ কোনো ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে; কিন্তু না, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রায়ই যে ধরনের বক্তব্য দেয়া হয়ে থাকে, অনেকটা সেই ধরনের বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তিনি। আওয়ামী দোসরদের ওপর দায় চাপানো ছাড়া তেমন নতুনত্ব কিছু ছিল না। বাস্তবতা হচ্ছে, পতিত স্বৈরাচারের দোসররা দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করবে, প্রতিবিপ্লব ঘটানোর চেষ্টা করবে- এটি তো স্বাভাবিক। পতিত স্বৈরাচারের সম্ভাব্য অ্যাকশন প্ল্যান মাথায় রেখেই তো সরকারকে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে। কাজেই এ ধরনের অজুহাত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ফলে এই সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা- দেশে ভালো কিছু হবে। দীর্ঘ ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে দেশবাসীকে আতঙ্কিত থাকতে হবে এটা কেউ আশা করেনি। যেখানে সেনাবাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ মাঠে আছে! ঘোষণা দিয়ে দেশব্যাপী অপারেশন ডেভিল হান্ট পরিচালিত হচ্ছে। ৮ ফেব্রুয়ারি ডেভিল হান্ট অপারেশন ঘোষণার পর ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত- এই ১৮ দিন অভিযান চালিয়ে সবমিলিয়ে ২৭ হাজার ৭৩৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ডেভিল হান্ট ছাড়াও অন্যান্য মামলা এবং ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি রয়েছে। এতেও আইনশৃঙ্খলার উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধিত হয়নি। এ অবস্থায় রাত ৩টার সময় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সংবাদ সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। এর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হতে পারে। বিশেষত এই সম্মেলনের মাধ্যমে দেশবাসী যে মেসেজ পায় তা হলো, প্রথমত, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের ভেতরে-বাইরে একধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। দ্বিতীয়ত, সরকার জনগণের জন্য নির্ঘুম রজনী অতিবাহিত করে কাজ করে যাচ্ছে। অন্যথায় শেষ রাতে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন এবং অংশগ্রহণ করেন কিভাবে! বস্তুত অপারেশন ডেভিল হান্টের মধ্যেই সারা দেশে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে। শহরের পাড়া-মহল্লার অলিগলি, রাস্তাঘাট- সর্বত্র এখন ছিনতাই আতঙ্ক, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, মাস্তানি, চাঁদাবাজি, ছিঁচকে সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সন্ধ্যা নেমে এলেই ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ডাকাত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিনিয়ত ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে মহাসড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনের চালক। গত ১৭ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুর জেলার চান্দুরা থেকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর এলাকায় চলন্ত বাসে ডাকাতির পাশাপাশি একজন নারী যাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা ও কয়েকজনের শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে চারটি গুলি করে ২০০ ভরি স্বর্ণ ও নগদ টাকা ছিনতাই করে সন্ত্রাসীরা। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, সন্ধ্যার পর থেকেই রাজধানীসহ শহর, নগর-বন্দর এমনকি গ্রামের রাস্তাঘাটে ছিনতাই-ডাকাতির আতঙ্কে মানুষ যাতায়াত করতে গিয়ে ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে থাকে। যদিও রাতে হাইওয়ে পুলিশ মহাসড়কে পাহারা ও টহল দিয়ে থাকে। দেশে বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও ধর্ষণের মতো অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়ার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেছেন। বিক্ষোভ মিছিলে শিক্ষার্থীরা ‘জুলাইয়ের রক্তের দাম চাই, নিরাপদ দেশ চাই, দফা এক-দাবি এক, জাহাঙ্গীরের পদত্যাগ’, ‘মা-বোনদের নিরাপত্তা দে, নইলে গদি ছাইড়া দে’- ইত্যাদি স্লোগান দেন। ‘ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’-এর ব্যানারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে পদযাত্রা কর্মসূচি থেকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়ে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগের দাবি জানান তারা।
দেশের এই পরিস্থিতিতে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ উপলক্ষে মহাখালীর রাওয়া ক্লাবে ‘পিলখানায় সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডে শহীদ অফিসারদের স্মরণে’ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। ওই অনুষ্ঠানে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সমসাময়িক বেশ কিছু বিষয় তুলে ধরে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। রাজনীতিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা যদি নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে একসাথে কাজ না করতে পারেন, নিজেরা যদি কাদা ছোড়াছুড়ি করেন, মারামারি-কাটাকাটি করেন, তাহলে এই দেশ ও জাতির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে।
মব জাস্টিস বৃদ্ধির পেছনেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভূমিকা আছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি টঙ্গীর স্টেশন রোড এলাকায় এক যুবককে ছিনতাইকারী সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং রাজধানীর উত্তরায় ছিনতাইয়ের অভিযোগে দু’জনকে পিটিয়ে ফুটওভারব্রিজে ঝুলিয়ে রাখে জনতা। এর আগে ১৬ জানুয়ারি টাঙ্গাইলে চোর সন্দেহে পিটিয়ে একজনকে হত্যা করা হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে, গত আগস্ট থেকে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে দেশে ১১২ জন গণপিটুনিতে মারা গেছে। এই পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক।
যদিও দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির দাবিতে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন, ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর টহল বাড়িয়েছেন। যেখানেই ঘটনা ঘটবে, সেখানেই ব্যবস্থা নেয়া হবে এমন আশ্বাস দিয়ে কাউকে ছাড় না দেয়ার কথা বলছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারো গাফিলতি পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন। তবু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কথায় দেশবাসী খুব একটা আশ্বস্ত হতে পারছে না। প্রতি থানায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও অফিসার থাকার পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিনের পর দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে লুট হওয়া প্রায় এক হাজার ৪০০ অস্ত্র এবং আড়াই লাখ গোলাবারুদ এবং গণভবনের দায়িত্বে থাকা এসএসএফ সদস্যদের বিশেষায়িত অস্ত্র ও বিভিন্ন সরঞ্জাম এখন পর্যন্ত পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে অত্যাধুনিক অ্যাসল্ট রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, ফ্ল্যাশব্যাং গ্রেনেড, অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম, বেতার যোগাযোগের ডিভাইস রয়েছে। লুট হওয়া এসব অস্ত্র নিরাপত্তাহুমকি ও ঝুঁকি তৈরি করেছে।
অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনীর ওপর ঝড়ঝাপটা গেছে; তাতে পুলিশ বাহিনীতে একধরনের ট্রমা কাজ করছে। ফলে পুলিশের কিছুটা নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। পুলিশ পূর্ণ পেশাদারিত্ব ও শক্তি নিয়ে মাঠে নামতে না পারলে এই অবস্থার পরিবর্তন কতটা সম্ভব সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তা ছাড়া পুলিশ বাহিনী ও সিভিল প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা গণ-অভ্যুত্থানবিরোধী শক্তি সক্রিয় হয়ে উঠলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেয়া আরো কঠিন হয়ে পড়বে।
বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের মানুষ নিরাপদে ব্যবসাবাণিজ্য ও চলাফেরা করতে চায়। সারা দিন পরিশ্রম করে রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চায়। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ‘সন্তোষজনক’ উন্নতির কোনো বিকল্প নেই। মার্চ মাস থেকে শুরু হয়েছে পবিত্র রমজান এবং তার পরই আসবে সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ব্যবসাবাণিজ্য গতিশীল হয়ে ওঠে। ব্যবসার কাজে মধ্যরাত পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা ছোটাছুটি করেন, মানুষ কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকে। গ্রামে পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে শহরে বসবাসরত ব্যক্তিরা গ্রামে ছুটে আসেন। এ অবস্থায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, রাহাজানির মতো ঘটনা পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে, যা কাম্য হতে পারে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি দেশবাসীর আস্থা ও বিশ্বাস এখনো বিদ্যমান। শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য সরকারের সব অর্জন ধূলিসাৎ হতে পারে না। আমরা আশা করব, সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রমজান মাসে এবং ঈদের আগে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হবে।
লেখক : আইনজীবী ও কলামিস্ট



