একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. শমশের আলী

শাসক শ্রেণীর বিজ্ঞানের মেন্টালিটি নেই এ দেশে

বাংলাদেশ যন্ত্র টেপাটেপির দেশ হয়ে যাচ্ছে। সরকারে বিজ্ঞানের লোক নেই। স্কুল-কলেজগুলোর ল্যাবরেটরিতে না আছে বিজ্ঞান চর্চার পরিবেশ; না আছে বরাদ্দ। আর সবাই টাকার পেছনে ছুটতে যেয়ে অর্থই অনর্থের মূল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাশিদুল ইসলাম
Printed Edition
ড. শমশের আলী
ড. শমশের আলী |নয়া দিগন্ত

প্রযুক্তিবিমুখ রাজনীতি ও বিজ্ঞানবিমুখ মনমানসিকতার তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী মুহাম্মাদ শমশের আলী। তার আক্ষেপ, বাংলাদেশ যন্ত্র টেপাটেপির দেশ হয়ে যাচ্ছে। সরকারে বিজ্ঞানের লোক নেই। স্কুল-কলেজগুলোর ল্যাবরেটরিতে না আছে বিজ্ঞান চর্চার পরিবেশ; না আছে বরাদ্দ। আর সবাই টাকার পেছনে ছুটতে যেয়ে অর্থই অনর্থের মূল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির প্রাক্তন সভাপতি, সাউথ ইস্ট ইউনিভার্সিটির সাবেক ভিসি এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রতিষ্ঠাতা ভিসি বিজ্ঞানী শমশের আলী মনে করেন, গোড়া থেকে বিজ্ঞান চর্চার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না করা গেলে দেশে বিজ্ঞানী তৈরি সম্ভব নয়। দুর্ভাগ্যবশত দেশে তেমন পরিবেশই বিরাজ করছে। বিজ্ঞানের শিক্ষক পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। দশকের পর দশক এই পরিস্থিতি বিরাজ করছে দেশে।

১৯৬১ সালে পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশনে যোগদানের মাধ্যমে বিজ্ঞানী এম শমশের আলীর কর্মজীবন শুরু হয়। পি. এইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করার পর ১৯৬৫ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি ঢাকায় আণবিক শক্তি কেন্দ্রে সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার হিসেবে যোগ দেন। কর্মদক্ষতার জন্য তিনি ১৯৭০ সালে অত্যন্ত অল্প বয়সে আণবিক শক্তি কমিশনের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬১-১৯৮২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২১ বছর যাবৎ ড. আলী আণবিক শক্তি কমিশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটা স্পেশাল সাইটেশনের মাধ্যমে ড. আলীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনারারি প্রফেসর অব ফিজিক্স করে তাকে একটা বিরল সম্মাননা প্রদান করে। ১৯৮২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্বে অব্যাহত ছিলেন। ১৯৯২-১৯৯৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ হতে ২০১০ সময় পর্যন্ত সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়াও ২০০৪ থেকে ২০১২ পর্যন্ত বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

বর্নাঢ্য এই জীবন অতিক্রম করেও তিনি বিজ্ঞান চর্চায় দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মোটেও সন্তুষ্ট নন। কিন্তু কেন? এ প্রশ্নের জবাবে নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বিজ্ঞানী এম শমসের আলী বলেন, আমার কাছে মনে হয় আমরা বিজ্ঞান বিবর্জিত। আমরা যারা কাজ করেছি তারা নিজেদের গরজে কাজ করেছি। কিন্তু এখন বিজ্ঞানকে মোটেই প্রাধান্য দেয়া হয় না। একাডেমিক জবস আছে হাইয়েস্ট অথরিটি, সেখানে বরাদ্দ নেই। কোনো রকম আনুকুল্য নেই। এই অবস্থায় দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করে কোনো কিছু দাঁড় করানো যায় না। এটা বিদেশেও সত্য। অন্য দেশেও কেউ বলে না যে আমার এই আবিষ্কার আছে বা আমাকে একটি প্রকল্প দাও, সাহায্য কর।

নয়া দিগন্ত : তো সরকারের কী করা উচিত? বেসরকারি খাত কিভাবে এগিয়ে আসতে পারে?

এম শমশের আলী : সরকারের উচিত কারা বিজ্ঞানী, কারা ভালো কাজ করেছে, তাদের সাথে পরামর্শ করে কথাবার্তা বলা। এখানে তো বিজ্ঞান সম্পর্কে কথা বলার কোনো লোক নেই। বিজ্ঞান জানে এমন লোক বিজ্ঞান সম্পর্কে কথা বলবে। বিজ্ঞান সম্পর্কে মূল্যায়ন করবে। এখানে বিজ্ঞান জানে এমন লোকই নেই। সরকারেও বিজ্ঞানের লোক নেই।

নয়া দিগন্ত : এর খেসারত তো তাহলে জাতিকেই দিতে হচ্ছে?

এম শমশের আলী : যন্ত্র টেপাটেপির দেশ হয়ে যাচ্ছে। আজকে যে আমরা ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলেশনের কথা বলছি, আইওটির কথা বলছি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা বলছি এগুলো তো অনেক উন্নত মানের কথা। প্রথম কথা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞানের শিক্ষা কেমন হচ্ছে, তাদের বা স্কুল কলেজগুলোতে ল্যাবরেটরির অবস্থা কেমন? এসব ল্যাবরেটরির মান মোটেও উন্নত মানের নয়। সাইন্টিস্ট বানাতে হলে উপরের দিক থেকে নয়, তলা থেকে বানাতে হয়, স্কুল কলেজ পর্যায় থেকে বানাতে হয়। স্কুলগুলোতে ল্যাবরেটরি নেই। বিজ্ঞান শিক্ষক নেই। স্কুলে ইংরেজির শিক্ষক গিয়ে বিজ্ঞানের ক্লাস নেয়। অঙ্কের লোক নেই, অন্য লোক গিয়ে অঙ্ক শেখাচ্ছে। শিক্ষকের চাহিদা আছে অথচ শিক্ষক দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

নয়া দিগন্ত : আমরা এতটা প্রযুক্তিবিমুখ হলাম কী করে?

এম শমশের আলী : কী করব, অতীত সরকার খালি টাকা পয়সা নিয়ে.... একটা সময় ছিল যখন বলত, ‘টাকা দাও দুবাই যাব, টাকা দাও দুবাই যাব।’ এই টাকা, টাকা, টাকাটা হয়ে গেছে অর্থই সকল অনর্থের মূল। এই অর্থের পেছনে খালি ছটেছে লোকে, কিন্তু অর্থ যে কীভাবে হয় অন্য দেশে, অর্থ আসে বিজ্ঞান প্রযুক্তির মাধ্যমে।

নয়া দিগন্ত : অন্য দেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে পারলে তা তৈরি বা প্রযুক্তির বিকাশ কেন দেশে সম্ভব হচ্ছে না?

এম শমশের আলী : আমাদের এখানে বিজ্ঞানের আয়োজনটা নাই তো। ইনস্টিটিউশন আছে কিন্তু ইনস্টিটিউশনগুলো ওয়েল পেইড না। সরকারের তরফ থেকে বলা উচিত আমাদের এখানে অমুক ফসল হচ্ছে না বা অমুক মাছটা হচ্ছে না এটা উৎপাদন কিভাবে হবে সেজন্যে বিজ্ঞানীদের কাজ করতে বা তাদের কাজে লাগাতে হবে। এ দেশে যন্ত্র আনাতে যত ইন্টারেষ্ট, কারণ ওখানে কমিশন আছে, লোকে কমিশন খায়। যন্ত্র বানাতে কোনো ইন্টারেস্ট নেই। দেশের লোক যদি যন্ত্র তৈরি না করে, ইনোভেশন না করে তাহলে কিভাবে হবে।

নয়া দিগন্ত : আপনি দীর্ঘদিন পাট নিয়ে কাজ করছেন। পাটজাত পণ্যের বিশাল সম্ভাবনার কথা শোনা যায়। এ ক্ষেত্রে আমরা পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটকে ব্যবহার করতে পারছি না কেন?

এম শমশের আলী : পাট। পাটের কথা বলি। ফাঁকফোঁকরওয়ালা পাটের ব্যাগ যদি তৈরি করে, প্রত্যেকটা মার্কেটের সামনে যদি একটা পাটের ব্যাগের দোকান থাকে, আপনি কেনেন তাহলে লোকে কিনবে না কেন? অনেক পাটকল আছে, দুটো তিনটা পাটকলকে যদি শুধু পাটের সুতা তৈরি করতে বলা হয়, গ্রামীণ মেয়েদের পাটের ব্যাগ তৈরিতে কাজে লাগানো যায়, তাহলে তো এটা হয়। বাংলাদেশ পলিথিন নিষিদ্ধ করার জন্যে এত ভালো আইন করেছে যে অন্য দেশেও এটা অ্যাপ্রিশিয়েট করা হচ্ছে। কিন্তু আইনটা প্রয়োগ হচ্ছে না। এখন বাজারে পলিথিন উদ্ধার বা ধরতে গেলে তারা বলে যেসব মেশিন এসব পলিথিন বা পলিথিন ব্যাগ তৈরি করে ওগুলো জব্দ করেন না কেন? টাকাওয়ালা লোকগুলো ওই মেশিনে পলি উৎপাদন করছে। সরকারের কি এমন ক্ষমতা নাই যে ওই মেশিনগুলোকে জব্দ করে। এই যে পাটের কথা বললাম এটা তো খুব সিম্পল প্রযুক্তি।

নয়া দিগন্ত : তাহলে বিজ্ঞান চর্চা থেকে শুরু করে এর অনুশীলন, প্রযুক্তির ব্যবহারে অগ্রসর হওয়া এসবের মাঝে ফারাকটা কোথায়?

এম শমশের আলী : আমাদের তো কখনো ডাকে না। পরিবেশমন্ত্রী বা সরকারের সংশ্লিষ্ট কেউ যদি আমাদের ডাকেন তাহলে বুদ্ধি শলাপরামর্শ করা যায়। আমাকে দিনে ১০ বার ডাকলে আমি দিনে ১০ বার যাই। ১০ বছরে কেউ না ডাকলে আমি যাই না। এটা আমার পলিসি। সমস্ত বিজ্ঞানীর একই পলিসি। ওনারা যদি সাজেশন চান তাহলে পেতে পারেন। যাকগে; একসময় হবে। হয়তো আমরা যখন থাকব না তখন হয়তো বাংলাদেশে আবার বিজ্ঞানের ভালো সহায়ক পরিবেশ গড়ে উঠবে। কিন্তু সেই দিন এখনো আসে নাই।

নয়া দিগন্ত : বিজ্ঞানের প্রতি অনাগ্রহ কিংবা অনীহার কারণ কী?

এম শমশের আলী : এই দেশে সাইন্স ইজ নট এ স্ট্রং পয়েন্ট। আর্ট, কালচার, গান, বাজনা এগুলো স্ট্রং পয়েন্ট। খেলাধুলা, ক্রিকেট, কোটি কোটি টাকা খরচ করছে, আর খালি কি তাই, হেরে গিয়ে হাসতে হাসতে প্লেয়াররা দেশে ফিরছে। একটা গেমের তিনটা ডিপার্টমেন্ট, ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং, তিনটাতেই দুর্বল। তো এই টাকা খরচ করে লাভ হচ্ছে কী? সবটাতেই তো আমরা লোয়েস্ট।

নয়া দিগন্ত : বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে ওঠার উপায় কী?

এম শমশের আলী : প্রশিক্ষণ ছাড়া মাঠ পর্যায় থেকে বিজ্ঞানী কখনো উঠে আসবে না। ওগুলো হয় না। প্রশিক্ষণের দরকার হয়। এটা মেন্টালিটির দরকার হয়। এ দেশ যারা শাসন করে তাদের বিজ্ঞানের মেন্টালিটি নাই। ব্যবসার মেন্টালিটি আছে।