এস এম রহমান পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)
বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত মাল্টিলেন রোড টানেলের ট্রাফিক ভলিয়ম বাড়তে পারে গৃহীত দুই প্রকল্পসহ নতুন কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে-এমনটাই এখন প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানের এই টানেল চালু রাখতে গিয়ে দৈনিক গড়ে ২৭ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। সে কারণে এই টানেলে যানবাহন চলাচলের মাত্রা বাড়াতে (ট্রাফিক ভলিয়ম) সওজের গৃহীত দুই প্রকল্পসহ আরো কিছু নতুন উদ্যোগ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সুফল মিলতে পারে। এতে সরকারের প্রতিদিনের লোকসান অনেকটা সহনীয়পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হবে। পাশাপাশি কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ২৮ কিলোমিটার দূরত্ব হ্রাস পাবে এবং সময় সাশ্রয় হবে প্রায় ৪৫ মিনিট। বর্তমানে টানেলের উভয় দিক দিয়ে গড়ে ৩৯ হাজার যানবাহন চলাচল করছে। এতে টোল বাবদ আয় হচ্ছে গড়ে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অপর দিকে টানেল রক্ষণাবেক্ষণে ও ৭টি ইলেক্ট্রো ম্যাকানিকাল সিস্টেম সচল রাখতে গড়ে প্রতিদিন ৩৭ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে বলে জানা গেছে। গত জানুয়ারিতে এই টানেলে টোল আদায় হয়েছে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা, ফেব্রুয়ারিতে আয় ৩ কোটি টাকা এবং মার্চে আয় হয়েছে ৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। জানা গেছে, টানেল দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৫৫ কোটি টাকা আয় হলেও ব্যয় হয়েছে প্রায় তিন গুণ।
সওজের গৃহীত দুই প্রকল্প হচ্ছে, আনোয়ারা-বাঁশখালী-কক্সবাজার টইটং পেকুয়া বদরখালী চকরিয়া ঈদমনি আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প। এতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার ৫৮.২০ কিলোমিটার সড়ককে বর্তমান ৫.৫ মিটার (১৮ ফুট) থেকে ১০.৩০ কিলোমিটারে (৩৪ ফুট) প্রশস্তকরণ। এতে ব্যয় ধরা হয় ১২৪৯ কোটি ৪ লাখ টাকা। প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম অংশে ৪২ কিলোমিটার (আনোয়ারার কালাবিবির মোড় থেকে বাঁশখালী টইটং) এবং কক্সবাজার অংশে রয়েছে প্রায় ১৬ কিলোমিটার (টইটং পেকুয়া বদরখালী থেকে ঈদমনি) এতে ভূমি অধিগ্রহণে ৪০২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, ইউটিলিটি স্থানান্তরে (বিদ্যুৎ অপটিক্যাল ফাইবারসহ অন্যান্য স্থাপনা স্থানাত্তর) ৭২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, সেতু নির্মাণ ৯৬ টিতে ১৪১ কোটি টাকা, দুই জেলার যানজট নিরসনে ৪০টি স্থানে বাসবে নির্মাণে ৩৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ও দুই জেলার বাজার অংশে ১০ কিলোমিটার সড়ক রিজিভপেভমেন্ট করা কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
অপর প্রকল্পটি হচ্ছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশ গাছবাড়িয়া কলেজ গেট হয়ে আনোয়ারা উপজেলা সদর পর্যন্ত ২১.৮ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণ। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। প্রকল্পে বলা হয়েছে, বর্তমানে ঢাকা হতে কক্সবাজারমুখী যানবাহন ও পণ্য পরিবহনে কর্ণফুলী টানেল হতে আনোয়ারা (চাতুরী) শিকলবাহা ওয়াই জংশন-শান্তিরহাট-পটিয়া বাইপাস-গাছবাড়িয়া (চন্দনাইশ) রুটে ৩৯ কিমি: সড়ক পথ পাড়ি দিতে হয়। উল্লিখিত সড়কটি প্রশস্তকরণ করে নির্মাণ করা হলে যানবাহনগুলো কর্ণফুলী টানেল হতে কালাবিবির দীঘি- সৈয়দকুচিয়ার মোড়-গাছবাড়িয়া রুটে ২১.০৮ কিমি. সড়কে চলাচল করলে প্রায় ১৮ কিমি. দূরত্ব হ্রাস পাবে ও প্রায় ৩৫ মিনিট সাশ্রয় হবে। সড়কটি পটিয়া আনোয়ারা বাঁশখালী টইটং পেকুয়া বদরখালী (চকরিয়া) আঞ্চলিক মহাসড়কের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করবে এবং ২১.০৮ কিলোমিটারের সংযোগ সড়কটি আনোয়ারা ও চন্দনাইশ উপজেলাকে সরাসরি কর্ণফুলী টানেল হয়ে, চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চল, বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার সাথে যোগাযোগ সহজ হবে।
জানা গেছে, দুই দেশের যৌথ অর্থায়নে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে টানেল নির্মাণে আনোয়ারা ও চট্টগ্রাম প্রান্তে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল ৩৮৩ একর। যৌথভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেতু ও সড়ক বিভাগ ও চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড ২.৪৫ কিলোমিটার ও দুই প্রান্তের তীরসহ টানেলের দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৩.৪ কিলোমিটার আর নদীর পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পাশের সংযোগ সড়কসহ এই প্রকল্পের সর্বমোট দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৯.৩৩ কিলোমিটার। আর প্রতিটি টিউবের ভেতরের অংশে প্রশস্ত হচ্ছে প্রতিটি ১০.৮ মিটার করে। এ ছাড়া আনোয়ারা প্রান্তে ৭০০ মিটারের একটি উড়াল সড়ক বা ফ্লাইওভারসহ ৫.৪৫ কিলোমিটার দৈর্ঘের চারলেন সড়ক নির্মিত হয়েছে, যা আনোয়ারা চাতুরী চৌমুহনীতে এসে চট্টগ্রাম আনোয়ারা বাঁশখালী পিএবি সড়কের সাথে মিলিত হয়েছে। অপর প্রান্তে .৫৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক মিলিত হয়েছে নগরীর পতেঙ্গা নেভাল একাডেমি পয়েন্ট দিয়ে মূল সড়কের সাথে।
অপর দিকে যৌথ অর্থায়নে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে চারটি স্থানে ছয়লেনের চারটি সেতু নির্মাণ প্রকল্প শেষ হয়েছে। এ ছাড়া এ মহাসড়কের ৫টি স্থানে ৪টি বাইপাস ও একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্প কাজের কাজ শুরু হচ্ছে। একইভাবে কর্ণফুলী টানেল সংযোগ সড়কের সাথে সঙ্গতি রেখে যানবাহনের চাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমি অধিগ্রহণসহ ৪৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে আনোয়ারা ওয়াইজংশন থেকে কালাবিবির দীঘি পর্যন্ত ৮.১০ কিলোমিটার সড়ক ছয়লেনে এবং কালাবিবির দীঘি থেকে আনোয়ারা ফায়ার স্টেশন পর্যন্ত ২.৪ কিলোমিটার সড়ককে ৫.৫ মিটার থেকে ৭.৩ মিটারের উন্নীতকরণ কাজ শেষপর্যায়ে রয়েছে।
এ ছাড়া ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়া বাদামতলা থেকে আনোয়ারা ওয়াইজংশন পর্যন্ত এবং সর্বশেষ কমলমুন্সির হাট হয়ে কেরানি হাট পর্যন্ত মহাসড়কটি ৭.৩ মিটার থেকে ১০.৩ মিটারে (প্রায় ৩৪ ফুট) উন্নীতকরণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে এই মেগাপ্রকল্প ঘিরে ইতোমধ্যে পাল্টে যাচ্ছে চট্টগ্রাম অঞ্চল। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চলছে কক্সবাজার ও কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্রবন্দর ও কোল পাওয়ার প্লান, বিশালাকারের শিল্পজোন, গড়ে উঠছে পর্যটন শিল্পসহ নানা ধরনের বৃহৎ প্রকল্প।
এ দিকে কর্ণফুলী টানেল সংযোগ সড়কের সাথে সঙ্গতি রেখে যানবাহনের চাপ নিয়ন্ত্রণে আনোয়ারা ওয়াইজংশন থেকে কালাবিবির দীঘি পর্যন্ত ৮.১০ কিলোমিটার সড়ক ছয়লেনের এবং কালাবিবির দীঘি থেকে আনোয়ারা ফায়ার স্টেশন পর্যন্ত ২.৪ কিলেমিটার সড়ককে ৫.৫ মিটার থেকে ৭.৩ মিটারের উন্নীতকরণ প্রকল্পের কাজ বেশ এগিয়ে চলছে। এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম দক্ষিণ ও কক্সবাজারে আরো নতুন নতুন শিল্প কারখানা স্থাপনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ও কক্সবাজার পেকুয়া হয়ে টানেল দিয়ে উভয় প্রান্তে যানবাহনের সংখ্যা বা ট্রাফিক ভলিয়ম বৃদ্ধি পাবে।



