ঈদের সপ্তাহখানেক পর ‘হালাল বিল হালাল’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বন্ধুরা আসে, এমনকি অমুসলিমরাও আসে। হালকা খাওয়া-দাওয়া হয়। বিভিন্ন মহল্লা, দল, গোত্র, অফিসের লোকজন, কোম্পানির লোকজন পৃথক পৃথকভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ইন্দোনেশিয়ায় পুরো রমজান মাসটিই এক উৎসবমুখর ইবাদতের মাস
ইন্দোনেশিয়ার জনগণের ৯০ শতাংশ মুসলমান। সারা বিশ্বের মুসলমানদের মতো সে দেশের মুসলমানরাও রমজানে বিশেষ প্রস্তুতি নেয়। ইন্দোনেশীয় ভাষায় রোজাকে বলে পুয়াসা, ইফতারকে বলে বুকা পুয়াসা। রোজার মাসকে বলে বুলান পুয়াসা। রমজানের এই প্রস্তুতিতে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার নিজস্ব ছাপ। রমজানের শুরুর দিকে তারা কবরস্থানে যায়। মৃত মা-বাবা ও আত্মীয়দের রূহের মাগফিরাত কামনা করে ফাতিহা পাঠ করে। কিছু পরিবার মসজিদে নামাজের জায়গা ধুয়ে পরিষ্কার-পরিছন্ন করে। রোজাদার সব পরিবারে ইফতারের নানা খাবার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় তাজা সামগ্রী কেনাকাটা করে। রমজান উপলক্ষে ভালো খাবারেরও আয়োজন হয়। ইন্দোনেশিয়ান ডিশ তৈরির আয়োজন চলে। অনেকেই ৩০ রমজানে তাদের প্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী কমপক্ষে ৩০ ধরনের খাবার তৈরির চেষ্টা করে। তেমন এক খাবার হলো, ‘অপুর আইয়াম’। ঝাল মশলা ও নারিকেলের দুধ দিয়ে তৈরি চিকেন। পূর্ব জাভার তুবান বিভিন্ন মশলাপাতির জন্য বিখ্যাত। অনেকেই সেখান থেকে প্রয়োজনীয় মশলা সংগ্রহ করতে রমজানের আগে ছুটে যায়।
গত বছর পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে অভিনব এক অফার চালু করেছিল ইন্দোনেশিয়ার সরকার। কুরআন মাজিদ তিলাওয়াতের বিনিময়ে মোটরসাইকেল মালিকদের বিনামূল্যে জ্বালানি সরবরাহ করার কর্মসূচি। সে দেশের জনগণ এই অফারটি লুফে নিয়েছে। এ কারণেই দেশটির পেট্রল পাম্পগুলোতে এই বছরও লম্বা লাইন লক্ষ করা যাচ্ছে। এ ধরনের সংবাদ মুসলিম বিশ্বে আর শোনা যায়নি। ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানরা ধর্মপ্রাণ। রমজানে কুরআন নাজিল হয়। তাই রমজানে কুরআন পাঠ করা বা কুরআন খতম করার জন্য ব্যক্তি বিশেষকে উৎসাহিত করতে সরকারিভাবে এই অভিনব ব্যবস্থাপনা। ইন্দোনেশিয়ার অবিবাহিত মেয়েরা বিয়ের আগেই হজ-ওমরাহ সম্পন্ন করে। পাত্রপক্ষ এমন পাত্রীকে অগ্রাধিকার দেয় যারা হজ সম্পন্ন করেছেন। এ ধরনের মেয়েদের জন্য সরকার ও সৌদি কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ছাড় দিয়ে থাকে।
দেশটির রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত তেল ও গ্যাস কোম্পানি ‘পের্টামিনিয়া’ দেশের মোটরবাইকওয়ালাদের জন্য এই অফার চালু করেছে। রমজানে কোনো পেট্রল পাম্পে বসে কেউ যদি কুরআন শরিফ পড়েন তবে তাকে বিনা পয়সায় পেট্রল সরবরাহ করা হবে। যে যত পারা পড়বেন তাকে তত বেশি তেল বা গ্যাস দেয়া হবে। দেশের মুসলিমদের কুরআন পড়তে উৎসাহিত করতেই এই অফার। তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। কেননা, বাইকাররা পবিত্র গ্রন্থটি পাঠের জন্য পেট্রল পাম্পগুলোতে ছুটতে শুরু করে।
এই অফার বাস্তবায়িত করতে দেশের পেট্রলপাম্প বা গ্যাস স্টেশনগুলোতে আলাদা ঘর স্থাপন করেছে, যাতে অফার গ্রহণে আগ্রহীরা পেট্রলপাম্পে বসেই কুরআন মাজিদ পাঠ করতে পারেন। এ ধরনের অফারের আওতায় রয়েছে রাজধানী জাকার্তায় মোট পাঁচটি গ্যাস স্টেশন। সেখানে কোনো ব্যক্তি এক পারা কুরআন পড়লেই তিনি তার গাড়ির জন্য দুই লিটার তেল ফ্রি পাবেন। এভাবে কয়েক পারা পবিত্র কুরআন পড়েই একজন একটি মোটরসাইকেলের অর্ধেক ট্যাঙ্কি ভরে তেল নিতে পারছেন। আগ্রহীদের একটি রেজিস্ট্রেশন ফর্ম পূরণ করতে হয়। এরপরই তারা পেট্রল পাম্পের নির্দিষ্ট ঘরে যায়। প্রবেশের পর তাদের হাতে কুরআন শরিফ তুলে দেয়া হয়। যার যত ইচ্ছা তত পারা পাঠ করেন। অনেকেই আশা করছেন পেট্রল মুফতে নেয়ার এই অফার নিতে গিয়ে এই রমজানে তাদের কুরআন মাজিদ খতম দেয়া সম্ভব হয়ে যাবে।
ইন্দোনেশিয়ায় ইফতারপর্বেও রয়েছে চমক। রমজান শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে বুরবুর উৎসব হয়। সেন্ট্রাল জাভার পোর্ট সিটি সামারাঙে বুরবুর উৎসবের জন্য খ্যাত। বুরবুর চাউলের পুরিজ বা ফিরনির মতো এক প্রকার খাবার। স্থানীয়রা এই উৎসবে প্রচুর বুরবুর তৈরি করে এবং আগত মেহমানদের ফ্রি বিতরণ করে। বুরবুর ইফতারের প্রধান উপাদানও। উৎসবের সময় সেমারাং এলাকায় ঐতিহ্যবাহী নৃত্য হয় এবং মিউজিক উৎসবও অনুষ্ঠিত হয়।
ইন্দোনেশিয়ার বড় শহরগুলোতে দিনের বেলা সব রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকে। বিকেলে বা ইফতারের আগে রেস্টুরেন্ট রোজাদার ও অন্য সবার জন্য খোলা হয়। বালিতে মুসলমানদের রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকে তবে অন্যদের খোলা থাকে বিধায় রমজানে ট্যুরিস্টদের তেমন সমস্যা হয় না। স্থানীয় ওয়ারুং বা স্থানীয় খাবার দোকানের খাবার যদি আপনার পছন্দ হয় তবে রমজানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। এসব দোকান একটু রাত হলে খোলে।
পূর্ব জাভার পাসুরুং রিজেন্সিতে লোকজন দলগতভাবে মসজিদের কার্পেট পরিষ্কার-পরিছন্ন করে। মসজিদ পরিষ্কার রাখার কাজে এত লোকের প্রয়োজন হয় না, তাই যুবক শ্রেণীর স্বেচ্ছাসেবীরা শপিংমলও পরিষ্কার করে। বাংকা বেলিটুং এলাকার লোকেরা ‘পেরাং কেতুপাত’ উৎসব পালন করে। সিদ্ধ আঠালো ভাত নারিকেলের পাতায় মুড়ে একদল আরেক দলের দিকে ছুঁড়ে দেয়। এই উৎসবের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ার লোকেরা ঐক্য ও একে অপরকে সহায়তা করার দৃঢ়তা প্রকাশ করে। এভাবেই ইন্দোনেশিয়ার লোকজন রমজান মাসকে খোশ আমদেদ জানায়। নতুন চাঁদ দেখা ও ঈদের চাঁদ দেখা সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়।
ইন্দোনেশিয়ায় রমজানের বাজার এক অভিনব ঐতিহ্য। রমজান বাজারকে ‘পাসার আমাল’ বলা হয়। বিভিন্ন সংগঠন, দান ও খয়রাতি সংগঠন এই বাজারের আয়োজন করে। বিক্রীত সব পণ্যসামগ্রীর উপর বিশেষ ডিসকাউন্ট থাকে। বিভিন্ন সংগঠন যাতে ভালো ডিসকাউন্ট দিতে পারে সেদিকে ধনীরা নজর রাখে এবং আয়োজক সংগঠনগুলোকে এই খাতে দান-খয়রাত করে, সাহায্য-সহযোগিতা করে। এটি এমন এক বাজার যেখানে লাভের পরিমাণ খুব কম এবং কোনো কোনো দোকানে কোনো লাভ করা হয় না। রমজানের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও খাদ্য-খাবার এই বাজারে বিক্রি হয়। রমজান বাজারে সাধারণত নিম্নবিত্ত ও গরিব জনগণ বাজার করার জন্য আসে। ইন্দোনেশিয়ায় পাসার আমাল খুবই জনপ্রিয় এবং প্রচুর লোকসমাগম হয়। বিদেশী পর্যটকদের কাছেও পাসার আমাল প্রিয় ও দর্শনীয়।
রমজানকে স্বাগতম জানানোর পাশাপাশি ইসলামবিরোধী কাজ প্রতিরোধ করতেও সরকার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। ট্যুরিস্ট দেশ হলেও রমজানে জাকার্তা বা ইন্দোনেশিয়ার বড় শহরগুলোতে কোনো অ্যালকোহল মেনুতে থাকে না। শুধু বালি ব্যতিক্রম। বালি মূলত হিন্দুপ্রধান এলাকা, তাই এখানে রমজানের কড়াকড়ি পালন করা হয় না।
রোজা শুরু হয় সূর্যোদয়ের আগে, এই সময়কে ইন্দোনেশিয়ার লোকজন বলে ‘ইমশাক’। পাড়া-প্রতিবেশীর অনেকে ঢোলক বাজিয়ে ও হাঁকডাক করে সেহেরি খাওয়ার জন্য ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে দেয়। ইমশাক ও ইফতারের সময়সূচি সরকারিভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করে থাকে। পত্র-পত্রিকায়ও ছাপানো হয়। মসজিদ কর্তৃপক্ষও এলাকায় সময়সূচি প্রচার করে। রোজার নিয়মাবলি বিষয়ে প্রচারপত্র বিলি করে অনেকটা আমাদের দেশের মতো।
ইফতারের সময় হলে ঐতিহ্যবাহী ‘বেদুগ’ ড্রাম বাজানো হয়। কোথাও কোথাও ভোর রাতেও বেদুগ ঢোল পেটানো হয়। ঈদুল ফিতরের আগমনে প্রচুর বেদুগ পেটানো হয়। এই সময় লাউড স্পিকারে ইসলামী সঙ্গীত পরিবেশিত হয় এবং লোকজন দলবেঁধে রাস্তায় রাস্তায় প্যারেড করে। ইফতারের প্রধান সাধারণ উপকরণ হলো বুরবুর, সরবৎ ও খোরমা।
ইফতারের সময় ইফতারসামগ্রী নিয়ে রোজাদাররা অপেক্ষা করতে থাকেন। মসজিদে যখন আজান হয়, কোথাও কোথাও ঐতিহ্যবাহী বেদুগ বাজানো হয়, রেডিও ও টিভিতেও বেদুগ বাজানো দেখানো হয়। এই সময়ের জন্য সবাই অপেক্ষা করে। সময় হলেই বুকা পুসা বা বুকা পুয়াসা করে অর্থাৎ ইফতারের মাধ্যমে রোজা ভাঙ্গে। পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও তারাবির নামাজে অংশ নেয়।
রমজানের শেষ রাতে অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের আগের রাতে ‘তাকবিরান’ করা হয়। আল্লাহর প্রশংসা করে, বেদুগ বাজিয়ে, নেচে গেয়ে, ইবাদত করে, বক্তৃতা-ওয়াজ করে, দলবদ্ধভাবে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে তাকবিরান পালন করা হয়। ইন্দোনেশিয়ার মুসলিম সমাজে এটিও বিশেষ হৈ হুল্লা করে পালন করা হয়।
ঈদুল ফিতরকে ইন্দোনেশিয়ানরা বলে লেবারান বা ঈদুল ফিতরি। সব অফিস ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ঈদুল ফিতরির দিন বন্ধ থাকে। ঈদের দিনে ইন্দোনেশিয়ান মুসলমান মেয়েরা ‘মুকিনা’ পরিধান করে। মুকিনা সাদা কাপড়ের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা যায় এমন কাপড়। একই কাপড় হওয়ায় মেয়েদের জামাত খুবই সুন্দর দেখায়। মুসলমান পুরুষরা ‘সারং’ পরিধান করেন। সারং এক ধরনের ঐতিহ্যবাহী জামা, সে সাথে নিজস্ব ঢঙের টুপি পরিধান করেন। আমাদের দেশের মতো তারাও সাধ্য অনুযায়ী উত্তম পোশাক পরিধান করে। ঈদের সময় জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করাকে বলে ‘বুসানা মুসলিম’।
ঈদুল ফিতরের কয়েক দিন আগে বিত্তবানরা নিকটাত্মীয় ও বন্ধু-বান্ধবদের কাঠের বাক্সের মধ্যে নানা উপঢৌকন সাজিয়ে উপহার দেয়। কাগজের মোড়কেও বিভিন্ন উপহার দেয়া হয়। ইন্দোনেশিয়ানরা এই উপহার দেয়াকে ‘বিংকিসান লেবারান’ বলে। এসব উপহার সামগ্রীতে সাধারণত থাকে বিভিন্ন মজাদার খাবার, ঈদে তৈরির জন্য খাদ্য উপকরণ, বিভিন্ন গৃহস্থালী অ্যাপলায়েন্সে অথবা বাসন কোসন।
ইন্দোনেশিয়ায় ঈদে কার্ড দেয়ার রীতি প্রচলিত। ঈদ-কার্ড দেয়াকে বলা হয় কাতু লেবারান। দোকানে বিক্রির কার্ডগুলোতে মানুষ বা জীবজন্তুর ছবি থাকে না। জ্যামিতিক আর্ট, মসজিদ, প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি, বিভিন্ন রং ও বাহারি কাজ করা থাকে এসব কার্ডে।
ঈদুল ফিতরের সময় ইন্দোনেশিয়ার লোকজন ‘সুংকিম’ করে। ঈদের নামাজের পর ছোটরা বড়দের সামনে অনেক সময় হাঁটু গেড়ে বসে বা মাথা ঝুঁকিয়ে ক্ষমা চায়। বড়রা তাদের মুরুব্বিদের কাছে ক্ষমা চায়। অনুরূপভাবে মহিলারা যখন অন্দর মহলে যায় তখন সুংকিম করে। অনেক সময় বড় বড় ঈদের জামাতে, যেখানে হাজার হাজার মহিলা অংশগ্রহণ করে সেখানেও সুংকিম করা হয়।
ঈদের আনন্দ থেকে গরিবরাও যেন বাদ না যায় সে জন্য ইন্দোনেশিয়ায় গড়ে উঠেছে অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। এরা গরিবদের টাকাপয়াসা, কাপড়-চোপড় ও খাদ্যসামগ্রী ইত্যাদি প্রদান করে। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘শান্তুনান রামাদান’।
ঈদের সপ্তাহখানেক পর ‘হালাল বিল হালাল’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বন্ধুরা আসে, এমনকি অমুসলিমরাও আসে। হালকা খাওয়া-দাওয়া হয়। বিভিন্ন মহল্লা, দল, গোত্র, অফিসের লোকজন, কোম্পানির লোকজন পৃথক পৃথকভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ইন্দোনেশিয়ায় পুরো রমজান মাসটিই এক উৎসবমুখর ইবাদতের মাস।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার



