ন্যায়বিচারের স্বার্থে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সহযোগীসহ ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর কোনো বিকল্প নেই। কেননা তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে গুমে জড়িত থাকা এবং জুলাই-আগস্টে বিক্ষোভকারীদের ওপর গণহত্যা চালানোর সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এ প্রসঙ্গে জেনেভায় গত বুধবার জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার পরিষদের ৫৮তম অধিবেশনে বাংলাদেশে গত জুলাই-আগস্টের বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনবিষয়ক তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন উত্থাপন করেছেন হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। প্রতিবেদন উত্থাপনকালে তিনি বলেছেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি বিগত সরকারের কর্মকর্তা, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট সহিংস পক্ষগুলো পদ্ধতিগতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। এর মধ্যে ছিল শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার আটক ও গ্রেফতার, নির্যাতন এবং নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারে এবং নির্দেশনায় বিক্ষোভ দমনের নামে, মূলত বিগত সরকারকে ক্ষমতায় রাখার উদ্দেশ্যে জঘন্য মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছে।’
বাস্তবতা হলো- হাসিনা গত সাড়ে ১৫ বছর যেভাবে দেশ চালিয়েছেন, তাতে তার নেতৃত্বে মানবতাবিরোধী অপরাধের হাজারো তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনের তদন্ত দলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যেমন এসব তথ্য উঠে এসেছে, ঠিক তেমনি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও শেখ হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধের দালিলিক প্রমাণ রয়েছে। সঙ্গত কারণে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়।
হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিচার নিয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজকে এক সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, শেখ হাসিনার বিচার হবেই, এতে কোনো সন্দেহ নেই। শুধু হাসিনাই নয়, তার সহযোগীদেরও বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। ড. ইউনূস আরো বলেন, যদিও তিনি এখন বাংলাদেশে নেই, প্রশ্ন হচ্ছে আমরা তাকে বাংলাদেশে আনতে পারব কি-না। তা নির্ভর করছে ভারত ও আন্তর্জাতিক আইনের ওপর। আমরা ইতোমধ্যে ভারতকে বলেছি- তাকে ফেরত দিতে।’
শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনে বিরোধী কণ্ঠ দমনে বন্দিশালা আয়নাঘরে চলে অমানুষিক নির্যাতন। ভুক্তোভোগীরা নৃশংসতার যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা অবিশ্বাস্য। কোনো মানুষ অন্য আরেকজনের ওপর এমন নির্যাতন করতে পারে তা কল্পনার বাইরে। মূলত ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে শেখ হাসিনার পুরো সরকার এ ধরনের গুম, হত্যা, নির্যাতনের সাথে জড়িত ছিল। জুলাই-আগস্টেও বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতায় শেখ হাসিনার সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযুক্ত। জাতিসঙ্ঘের অনুমান, হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত প্রায় ১৪০০ বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হয়েছে।
যদিও হাসিনাসহ তার সহযোগী যারা গুম, খুন ও নির্যাতনের সাথে জড়িত তাদের অনেকে এখনো চিহ্নিত হননি। তাদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আশার কথা হলো- গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর এখন জবাবদিহি নিশ্চিতের সময় এসেছে। এ প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ বিভিন্ন আদালতে অনেক মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলার বিচারে যাতে সুষ্ঠু প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে এ কথা বলতে হবে যে, শেখ হাসিনাসহ তার অপরাধী সাঙ্গোপাঙ্গদের বিচারের বিষয়ে স্কাই নিউজে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রধান উপদেষ্টা দৃঢ়তার সাথে যে কথা বলেছেন, তা আশা জাগানিয়া।



