সুবিধাবঞ্চিত রাজধানীর পথশিশুরা

ইট-পাথরের নগরে সবার জন্য ঈদ আসে না

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition

আব্দুল কাইয়ুম

‘আমাদের ঘর নেই, বাড়ি নেই, থাকার কোনো জায়গা নেই। ফুটপাথই আমাদের একমাত্র ঠিকানা। আমাদের কি না আবার ঈদ উৎসব।’

ঢাকার রাস্তায় ফুটপাথে বসে থাকা আফরোজা এগিয়ে বলল, ‘আমি জানি, দুই দিন পরই ঈদ। কিন্তু সেই ঈদ আমাদের জন্য কখনোই উৎসব হয়ে আসে না। ঈদ শুধু বড় লোকদের জন্য। তারা নতুন জামা পরবে, হাতে মেহেদি লাগাবে, মা-বাবার কাছ থেকে নতুন টাকার সেলামি পাবে। আমাদের কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই। কেউ দিলে হয়তো পড়তে পারব। আমার মতো যারা ফুটপাথে ঘুমায়, তাদের জন্য এসব স্বপ্নের ব্যাপার।’

হাবিব নামের আরেক পথশিশু বলেন, ‘আমি সারাদিন বোতল ও কাগজ টুকাই। দিনে যা আয় হয় তা দিয়ে কোনো রকম খাবার কিনে দিন পার করি। যেখানে জীবন চলতে কষ্ট হয়, সেখানে আমাদের জন্য ঈদ স্বপ্নের মতো। ছোটবেলায় মা অসুস্থ হয়ে মারা গেছে, বাবাকে দেখিনি। তার পর থেকে রাস্তায় ঘুমাই, যা পাই তাই খাই। কখনো ঈদ মানে কী বুঝিনি। অনেক ইচ্ছে ছিল এবারের ঈদে নতুন প্যান্ট, শার্ট ও জুতা কিনব। কিন্তু সামর্থ্য নেই। দিনভর যা আয় করি, তা দিয়ে শুধু বেঁচে থাকি। সবার মতো নতুন কাপড় পরে ঈদগাহে গিয়ে নামাজ পড়তে যাওয়া ও পরিবারের সাথে ভালো খাবার খেতে আমারও মনে চায়। তবে কখনো সম্ভব হয়নি। হয়তো মা বেঁচে থাকলে কিছুটা আনন্দ করতে পারতাম। তবে আমরা বন্ধুরা মিলে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াই, মানুষ যদি কিছু দেয়, তাই খেয়ে নেই।’

রাস্তার ধারে দুই ও সাত বছরের সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন আবুল ও তার স্ত্রী। আবুল বলেন, ‘সারা দিন খাটতে খাটতে একবেলা খাবার জোগাড় করা, এটি তো আর আমাদের ঈদ হতে পারে না। আমার সন্তানেরও ঈদের আনন্দ করতে ইচ্ছে। চাই, তাদের একটু সাজুগুজু করে ঘুরতে নিয়ে যাই। কিন্তু সেই সামর্থ্য নেই। এখন পর্যন্ত সন্তানদের জন্য ভালো জামা কিনতে পারিনি। ঈদের দিন সেমাই ও ভালো খাবার রান্না করে পরিবার নিয়ে খেতে চাই। কিন্তু এগুলো শুধু স্বপ্ন। এই শহরে কত বড়লোক আছে, কেউ আমাদের খবর নেয় না।’

মাহে রমজান শেষের পথে। আর মাত্র দুই দিন পার হলেই দেশের মানুষ ঈদের আমেজে মেতে উঠবে। সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন পোশাক পরিধান করা ঈদে সুন্নাহ হলেও রাজধানী ঢাকাসহ দেশে রয়েছে কয়েক লাখ পথশিশু। তাদের অনেকের বাবা নেই, মা নেই, কেউ কেউ বাবা-মা ছাড়াই বেড়ে উঠছে। রাস্তার পাশেই দিন কাটে, রাত কাটে, হাতে যা আসে তাই দিয়ে বেঁচে থাকে। তাদের কাছে ঈদের আনন্দ অন্যদের ঈদ উৎসব দেখার মধ্যেই সীমিত। কেউ রাস্তার পাশ দিয়ে নতুন পোশাক ক্রয় করে নিয়ে গেলে পথশিশুরা তাকিয়ে বসে থাকে। অপেক্ষা করে হয়তো কেউ তাদের জন্য নতুন জামা আনবে- কিন্তু সেই আশা প্রায় শেষ হয় না।

আলী দোহা, এক বেসরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের সমাজে প্রচুর ধনী ব্যক্তি আছেন। তারা নিজেরা অনেক খরচ করেন, ঈদে নিজের সন্তানদের কেনাকাটায় প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। যদি আমরা কিছুটা খরচ বাঁচিয়ে পথশিশুরা মাঝে বিলিয়ে দিই, তবে তাদেরও ঈদের আনন্দে মেতে ওঠার সুযোগ হয়। বেশি অর্থের প্রয়োজন নেই। শুধু প্রয়োজন সহানুভূতিশীল মনোভাব। পথশিশুরা আমাদের সমাজের সন্তান, তারা আমাদের ভালোবাসার দাবিদার। তাদের মা-বাবাসহ পরিবার চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আমাদের দায়িত্ব, বিত্তবানদের সাহায্যের হাত বাড়ানো এবং পথশিশুদের প্রতি আর্থিক ও সার্বিক সহায়তা নিশ্চিত করা।’

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, এনজিও, সমাজসেবী ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ঈদ উপলক্ষে পথশিশুদের জন্য বিশেষ আয়োজন করে। নতুন পোশাক, উপহার, গল্প বলা, মেহেদি, ছবি আঁকা এবং নিজ হাতে কার্ড তৈরি- এ ধরনের কার্যক্রম পথশিশুদের জীবনে সাময়িক হলেও আনন্দ ও আশা নিয়ে আসে। তারা একত্রিত হয়ে উৎসবে অংশ নিলে কেবল নতুন পোশাক বা উপহারই পায় না, বরং মানবিক বন্ধনের স্পর্শও অনুভব করে।

সরকারি ও বেসরকারি তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের ৭৫ ভাগ পথশিশু রাজধানীতে অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে ৫৩ ভাগ ছেলে, ৪৭ ভাগ মেয়ে। নোংরা পরিবেশ ও অপুষ্টিতে বেড়ে ওঠা এসব শিশুর ৮৫ ভাগই রোগাক্রান্ত। ৫১ ভাগ পথশিশু ‘অশ্লীল কথার শিকার’, শারীরিক নির্যাতনের শিকার ২০ শতাংশ, যৌন হয়রানির শিকার মেয়েশিশু ১৪.৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যানুযায়ী, দেশে পথশিশুর সংখ্যা ৩৪ লাখ। অর্ধেকই রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে ৩৭.৮ শতাংশ দারিদ্র্য, ১৫.৪ শতাংশ মা-বাবার শহরে আসার কারণে, ১২.১ শতাংশ কাজের সন্ধানে বাড়ি ছেড়েছে। রাজধানীতে ৮৫ শতাংশ পথশিশু মাদকাসক্ত।

দুঃখের বিষয়, রাস্তার পাশে জুতারগাম বা আঠা দিয়ে নেশা শুরু করা শিশুরা পরে অপরাধ ও কিশোর গ্যাংয়ের দিকে ঠেলে দেয়া হয়। যে বয়সে তাদের হাতে থাকা উচিত বই-খাতা, পরিবারের স্নেহ, সেই বয়সে কেউ কেউ অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে।

মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, সরকার সচেতন হলে এবং নীতি, বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে নিয়মিত সুবিধা ও উৎসবের আয়োজন করলে পথশিশুরা সমাজে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। কিছু জেলা ও নগরীতে ইতোমধ্যে এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসন যৌথ উদ্যোগে কাজ করছে। সফলতা দেখিয়ে অন্য এলাকায়ও এই সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা সম্ভব।

পথশিশুদের ঈদ যেন কেবল স্বপ্ন নয়, বাস্তব আনন্দের দিন হয়। তাদের মুখে হাসি ফুটানো আমাদের সমাজের দায়িত্ব।