আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার

Printed Edition

মির্জা মুহাম্মদ নূরুন্নবী নূর

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নাম। জীবন চলার পথে যা প্রয়োজন তার সব কিছুরই দিক নির্দেশনা দিয়েছে ইসলাম। অনেক বিষয়ের মধ্যে আমর বিল মারুফ এবং নাহি আনিল মুনকার একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় বিষয়। মানব সমাজে এর কার্যকর অবস্থান অত্যন্ত জরুরি।

আমর বিল মারুফ এবং নাহি আনিল মুনকারের পরিচয় : আমর শব্দের অর্থ নির্দেশ করা, হুকুম করা বা কমান্ড করা এবং মারুফ শব্দের অর্থ ভালো কাজ, গ্রহণযোগ্য কাজ, পছন্দনীয় কাজ ইত্যাদি। অর্থাৎ- আমর বিল মারুফ শব্দের অর্থ ভালো কাজের নির্দেশ করা। নাহি শব্দের অর্থ নিষেধ করা, প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা বা বাধা দেয়া ইত্যাদি। মুনকার অর্থ খারাপ কাজ, অপছন্দনীয় কাজ বা মন্দ কাজ। অতএব নাহি আনিল মুনকার শব্দের অর্থ হচ্ছে মন্দ কাজে বাধা দেয়া বা মন্দ কাজ করতে নিষেধ করা। পরিভাষায় আমরা বলতে পারি, যাবতীয় ভালো কাজের আদেশ করা এবং মন্দ কাজে বাধা দিয়ে সমাজ বা দেশ থেকে সব প্রকারের খারাপ কার্যক্রম দূরীভূত করে ভালো কার্যাবলি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজে বা দেশে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা।

মারুফ ও মুনকারের গুরুত্ব : সমাজ বা রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে মারুফ ও মুনকার কাজের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত এ কাজ রাষ্ট্রের, যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘আমি যাদের হাতে ক্ষমতা প্রদান করি, তাদের চারটি কাজ সম্পাদন করা জরুরি। তারা সালাত কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে, ভালো কাজের নির্দেশ দেবে এবং খারাপ কাজে বাধা দেবে।’ (সূরা হজ-৪১)

সম্মিলিত প্রচেষ্টা : এ কাজ শুধু রাষ্ট্রের একার নয়। প্রতিটি দেশের জনগণেরও এ ক্ষেত্রে অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা মানুষকে কল্যাণের পথে ডাকবে, ন্যায়ের আদেশ দেবে এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখবে, তারাই হচ্ছে সফলকাম।’ (সূরা আলে ইমরান-১০৪)

উম্মতে মুহাম্মদির কাজ : এই কাজে সব নাগরিকের সহযোগিতা করা নৈতিক দায়িত্ব। বিশেষ করে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য একটি ঈমানি দায়িত্ব। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তোমাদেরকে সর্বোত্তম জাতি হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে এই জন্য যে, তোমরা মানুষের কল্যাণে ভালো কাজের নির্দেশ দেবে এবং খারাপ কাজে বাধা দেবে আর আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে।’ (সূরা আলে ইমরান-১১০)

খারাপ কাজে বাধা না দেয়া অন্যায় : দেশ, জাতি ও মানবসভ্যতার কল্যাণের জন্য ভালো কাজে সহযোগিতা করা এবং অন্যায় কাজে বাধা দেয়া প্রতিটি নাগরিকের জন্য জরুরি। বিশেষ করে মুসলমানদের জন্য আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন-‘তারা যেসব মন্দ কাজ করত, তা থেকে পরস্পরকে নিষেধ করত না, তাদের এই কাজটি ছিল অত্যন্ত গর্হিত।’ (সূরা মায়িদা-৭৯ )

মন্দ কাজে সহযোগিতা মুনাফিকি : প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব দেশ ও জাতির জন্য ভালো কিছু করা। দেশপ্রেম ঈমানের দাবি। তাই যারা দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য কাজ না করে ক্ষতি করতে চেষ্টা করে আর যাই হোক, তারা সত্যিকারের মুমিন হতে পারে না। ভালো নাগরিকও না। এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘মুনাফিক পুরুষ ও নারী পরস্পর সমান। তারা অসৎ কাজের নির্দেশ দেয় এবং সৎ কাজে নিষেধ করে।’ (সূরা তাওবা-৬৭) অতএব মুনাফিকি থেকে বাঁচতে হলে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। নতুবা আমরা মুনাফিকের কাতারে শামিল হয়ে যাব।

মুমিনের কাজ : একজন মুমিনের অনেক দায়িত্ব এবং নৈতিক কিছু কর্তব্য রয়েছে। আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকারের কাজে সময় দান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঈমানি কাজ। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘মুমিন পুরুষ ও নারী পরস্পরের বন্ধু। তারা সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজে নিষেধ করে।’ (সূরা তাওবা-৭১) অতএব ঈমানের পূর্ণতায় এই মহান দায়িত্ব পালনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

অন্যায়ে বাধাদানের স্তর : একটি অন্যায় কাজ আমরা কিভাবে দূরীভূত করতে পারি ইসলাম তার সুন্দর দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সা: এ বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হাদিস বর্ণনা করেছেন। আমরা হাদিসের দিকে তাকালে দেখতে পাই, সরাসরি কাউকে বাধা প্রদান না করে তিন স্তরে মন্দ কাজে বাধা দিতে হবে। যেমন- রাসূল সা: বলেন, ‘তোমাদের যে কেউ মন্দ কিছু করতে দেখবে, সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিরোধ করে, না পারলে জবান দিয়ে প্রতিবাদ করবে, এতেও না পারলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করবে। আর এটি হচ্ছে দুর্বলতম ঈমানের পরিচয়।’ (মুসলিম) আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যা বুঝতে অনেকেই ভুল করেন। যেমন- হাদিসে হাত দিয়ে অন্যায়কে প্রতিরোধ করতে বলা হয়েছে। আসলে এটি কার দায়িত্ব। সাধারণ জনগণের নাকি অন্য কারো। মূলত হাত দিয়ে বাধা দেয়া মানে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বাধা দেয়া যা সাধারণ কোনো জনগণের কাজ নয়। এটি হচ্ছে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রাষ্ট্র তথা সরকার তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবে।

মুনকার কাজে বাধা না দেয়ার শাস্তি : সমাজে প্রচলিত মুনকার কাজে যদি বাধা দেয়া না হয়, তাহলে সে জাতির ওপর আল্লাহর আজাব আরোপিত হবে। যেমন- রাসূল সা: বলেন, ‘যার হাতে আমার জীবন নিহিত, তাঁর কসম করে বলছি- অবশ্যই তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে। নইলে সত্বর আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর শাস্তি বর্ষণ করবে। এরপর তোমরা দোয়া করবে কিন্তু তা আর কবুল হবে না।’ যার বাস্তব নিদর্শন আমরা আজ দেখতে পাচ্ছি। তাই আমাদের আরো সতর্ক হওয়া উচিত।

মন্দকে ভালো কাজের দ্বারা প্রতিরোধ করা : মন্দ কাজকে মন্দ কাজ দ্বারা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তাই মন্দকে ভালো আচরণের মাধ্যমে মোকাবেলা করতে হবে। যেমন- আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘ভালো ও মন্দ সমান নয়। তুমি ভালো দ্বারা মন্দকে প্রতিরোধ কর। ফলে তোমার ও যার মধ্যে শত্রুতা রয়েছে সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যাবে।’ (সূরা হামিম সিজদা-৩৪/৩৫) এ গুণের অধিকারী কেবল তারাই হতে পারেন, যারা ধৈর্য ধারণ করা ঈমানের দাবিতে সক্রিয় থাকতে পারেন। তাই আমাদের আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে : আমর বিল মারুফের কাজ সুন্দর উপদেশ ও প্রজ্ঞাবান আচরণের মাধ্যমে সম্ভব। সুন্দর আচরণ এবং নৈতিকতা দিয়ে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। যেমন- আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রভুর পথে আহ্বান কর প্রজ্ঞাবান আচরণের দ্বারা এবং সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে।’ (সূরা নাহল-১২৫)

সর্বোপরি আমরা বলতে পারি, আমর বিল মারুফ এবং নাহি আনিল মুনকারের দায়িত্ব পালন করা ঈমানি আমলগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই এই মহান ঈমানি দায়িত্ব পালনে আমাদেরকে আরো বেশি যতœবান এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিত।

লেখক : খতিব, ঝাড়াবর্ষা কাজীপাড়া জামে মসজিদ, সাঘাটা, গাইবান্ধা